kalerkantho

সোমবার । ২৩ চৈত্র ১৪২৬। ৬ এপ্রিল ২০২০। ১১ শাবান ১৪৪১

পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার বলরামপুর ইউনিয়ন

এক ভোটে ১৭ বছর ধরে চেয়ারম্যান!

পঞ্চগড় প্রতিনিধি   

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ১৭:৪২ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



এক ভোটে ১৭ বছর ধরে চেয়ারম্যান!

মাত্র একবার নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয়ী হয়ে ১৭ বছর ধরে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন আটোয়ারী উপজেলার বলরামপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান। শুধু তিনি নন ইউপি সদস্যসহ পুরো পরিষদ রয়েছে ১৭ বছর ধরে। পাঁচ বছর মেয়াদী নির্বাচন হলেও তারা বিনা নির্বাচনে রয়েছেন বছরের পর বছর। অনেক ইউপি সদস্য নির্বাচনের তারিখটিও ভুলে গেছেন।

বোদা পৌরসভায় ওই ইউনিয়নের দুটি ওয়ার্ডের অন্তর্ভূক্তি নিয়ে মামলা পাল্টা মামলার জটে পড়ে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে ইউপি নির্বাচন থেকে বঞ্চিত রয়েছেন ওই ইউনিয়নের ভোটারসহ প্রায় ২৪ হাজার মানুষ। চেয়ারম্যানসহ ১৩ জন জনপ্রতিনিধির মধ্যে ৩ জন মারা গেছেন। মামলা নিরসন হয়েছে ২০১৭ সালে। পৌরসভার ওই ইউনিয়নের দুটি ওয়ার্ডের অন্তর্ভূক্তির পর নতুন ওয়ার্ডগুলো গেজেটভুক্ত না হওয়ায় এখনো ঝুলে আছে ইউনিয়নটি নির্বাচন। এ নিয়ে হতাশা ও ক্ষোভের শেষ নেই ইউনিয়নবাসীর।

জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০০৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি আটোয়ারী উপজেলার বলরামপুর ইউনিয়নের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ নেতা সাইদুর রহমান জয়ী হন। এ ছাড়া ইউপি সদস্য পদে ১ নাম্বার ওয়ার্ডে হকিকুল ইসলাম, ২ নাম্বার ওয়ার্ডে হাবিবুল্লাহ, ৩ নাম্বার ওয়ার্ডে আজিজার রহমান, ৪ নাম্বার ওয়ার্ডে পলিন চন্দ্র রায়, ৫ নাম্বার ওয়ার্ডে মোহাম্মদ সৈয়দ আলী, ৬ নাম্বার ওয়ার্ডে আব্দুল করিম, ৭ নাম্বার ওয়ার্ডে মোকছেদুল হোসেন বাবুল, ৮ নাম্বার ওয়ার্ডে মজির উদ্দিন, ৯ নাম্বার ওয়ার্ডে জাহিরুল ইসলাম নির্বাচিত হন। সংরক্ষিত মহিলা সদস্য পদে ১, ২ ও ৩ নাম্বর ওয়ার্ডে কুলসুম বেগম, ৪, ৫ ও ৬ নাম্বার ওয়ার্ডে কুন্তি রানী রায় এবং ৭, ৮ ও ৯ নাম্বার ওয়ার্ডে আজিজা বেগম নির্বাচিত হন।

দায়িত্ব গ্রহণের পাঁচ বছর শেষ হলেও এখনো তারা স্বপদেই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। বোদা পৌরসভার মধ্যে ওই ইউনিয়নের দুটি ওয়ার্ডের অন্তর্ভূক্তি নিয়ে মামলা পাল্টা মামলার জটে পড়ে দীর্ঘ ১৭ বছরে আর কোনো নির্বাচন হয়নি ইউনিয়নটিতে। এই দীর্ঘ সময়ে ৩ জন ইউপি সদস্য মারা গেছেন। ৩ নাম্বার ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আজিজার রহমান, ৬ নাম্বার ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুল করিম ও ৭, ৮ ও ৯ নাম্বার ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য আজিজা বেগম মারা গেছেন। ৭ নাম্বার ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মোকছেদুল হোসেন বাবুলের শিক্ষকতার চাকুরি জাতীয়করণ হওয়ায় তিনি পদত্যাগ করেন।

২০১৭ সালে মামলার নিষ্পত্তি হলে বলরামপুর ইউনিয়নের ৫ নাম্বার ওয়ার্ড সম্পূর্ণ এবং ৬ নাম্বার ওয়ার্ড আংশিক এলাকা বোদা পৌরসভার অন্তর্ভূক্ত করে ২০১৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর পৌরসভার নির্বাচন দেয়া হয়। কিন্তু এখনো ঝুলে আছে বলরামপুর ইউনিয়নের নির্বাচন। নির্বাচন না হওয়ায় যেমন স্থবির হয়ে পড়েছে ওই ইউনিয়ন কেন্দ্রিক রাজনীতি তেমনি জনসেবাও মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। 

ওই ইউনিয়নের বাসিন্দা আবু তৌহিদ মো. মোশাহারুল ইসলাম বলেন, ১৭ বছর আগে এই ইউনিয়নের নির্বাচন হয়েছিল, তারপর আর হয়নি। বোদা পৌরসভার মধ্যে দুটি ওয়ার্ড অন্তর্ভূক্তি নিয়ে জটিলতা ছিল। সীমানা নির্ধারণ করে বোদা পৌরসভার নির্বাচন হয়ে গেছে দু’বছর হলো কিন্তু আমাদের ইউনিয়নের নির্বাচন এখনো হচ্ছে না। এতে এই ইউনিয়নের মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন একই জনপ্রতিনিধিরা থাকায় উন্নয়নে ধীর গতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আমাদের দাবি দ্রুত যেন এই ইউনিয়নে নির্বাচন দেওয়া হয়।

বলরামপুর এলাকার বাসিন্দা মাসুদ রানা বলেন, এর আগে যখন নির্বাচন হয়েছিল তখন যাদের বয়স এক দুই বছর ছিল তারা এখন ভোটার হয়ে গেছে। ভাবুন কতদিন ধরে নির্বাচন হয় না আমাদের ইউনিয়নে। কয়েকজন জনপ্রতিনিধি মারাও গেছেন। আমি ভোটার হওয়ার পর জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে পারলেও একবারও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাইনি। আমার মতো অনেকেই ভোটার হওয়ার পর ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি। ২০০৩ সালের পর আমরা ভোটের দেখা না পেলেও জনপ্রতিনিধিরা একবার ভোটেই ১৭ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। নির্বাচন কমিশনকে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা দরকার। 

ওই ইউনিয়নের রামেশ্বরী গ্রামের আজিজার রহমান বলেন, আমাদের ৩ নাম্বার ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মারা গেছেন দুই বছর হলো। এখন আমাদের আর কেউ খোঁজ নেয় না। দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন না হওয়ায় চেয়ারম্যান মেম্বাররা যে যার মতো করে চলছে। তারাতো নির্বাচন চায় না। বিনা ভোটে নিশ্চিতে তারা স্বপদে আছে। এতে আমাদের সাধারণ মানুষ নাগরিক সেবা পেতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই নির্বাচন দেয়া জরুরি।

২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য হাবিবুল্লাহ বলেন, আমরা ২০০৩ সালের ১১ মার্চ শপথ গ্রহণ করি। আসলে নির্বাচন ছাড়া এভাবে দীর্ঘ থাকাটা আমাদেরও খারাপ লাগে। এ ছাড়া কয়েকজন ইউপি সদস্য মারা যাওয়ায় সেই এলাকাগুলোতে কাজ কিছু বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নির্বাচনের মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করার মর্যাদা ও মজাটাই আলাদা। আমরাও চাই নির্বাচন হোক।

১, ২ ও ৩ নাম্বার ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য কুলসুম বেগম বলেন, দায়িত্ব পালনে আমাদের কোনো সমস্যা হচ্ছে না। ৩ নাম্বার ওয়ার্ডের সদস্য মারা যাওয়ায় আমি তার দায়িত্বও পালন করছি। নির্বাচন হলেও আমাদের সমস্যা নেই। না হলেও সমস্যা নেই। তবে কবে নির্বাচন হয়েছিল এমন প্রশ্নে জবাবে তিনি বলেন, অনেক দিন আগের কথা তারিখ লিখে রেখেছি খেয়াল নেই। 

বলরামপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও আটোয়ারী উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সাইদুর রহমান বলেন, ভোট হচ্ছে না কেন এটা সরকার জানে। আমাদের কোনো সমস্যা নেই। স্বাভাবিকভাবে অন্যান্য এলাকায় যেভাবে উন্নয়ন হচ্ছে আমাদের এখানেও তেমনি উন্নয়ন হচ্ছে। মানুষের মনে ক্ষোভ থাকলে তারা ভোটের দাবিতে মিছিল মিটিং করতো। তারা ভালো জনপ্রতিনিধি পেয়েছে তাই ভোট না হলেও তাদের কোনো আপত্তি নেই। 

জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আলমগীর বলেন, বলরামপুর ইউনিয়নের ওয়ার্ড বিন্যাস করে তা গেজেটভুক্ত করার জন্য ২০১৮ সালে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রেরণ করা হয়েছে। নতুন ওয়ার্ডগুলো গেজেটভুক্ত হলেই নির্বাচন অনুষ্ঠানে আর কোনো বাধা থাকবে না।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা