kalerkantho

শুক্রবার । ২০ চৈত্র ১৪২৬। ৩ এপ্রিল ২০২০। ৮ শাবান ১৪৪১

‘দে দে দে ভাত দে’

ফরিদুল করিম, নওগাঁ   

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০৮:৪৮ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



‘দে দে দে ভাত দে’

সরকারি ভাতা না পাওয়া নওগাঁর মাহমুদা বেওয়া (ময়না)

দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ ঘোষণা করা হলেও এখনো অনেক মানুষ না খেয়ে কিংবা আধপেটা খেয়ে কোনোরকম বেঁচে আছে। তেমনই একজন মাহমুদা বেওয়া (ময়না)। নওগাঁ সদর উপজেলার মসরপুর দক্ষিণপাড়া গ্রামের মৃত মিরি ফকিরের স্ত্রী তিনি। বয়স ৭০ ছুঁইছুঁই। রাস্তার পাশে একটি ঝুপড়িঘরে বসবাস করেন। আলোর অভাবে ঘর থাকে অন্ধকারময়। মশা, মাছি ও পোকামাকড়ের সঙ্গে তাঁর বসবাস। তাঁর ডান হাত ও ডান পা প্রায় অচল। এ জন্য অসহায় ও শীতার্ত ময়নার প্রাকৃতিক কাজকর্ম বিছানাতেই সারতে হয়। ঘরে কোনো খাবার না থাকায় সবসময় তিনি ক্ষুধার তাড়নায় ভোগেন। রাস্তায় পথচারীদের শব্দ পেলেই ‘দে, দে, দে, দে...হামাক অ্যানা ভাত দে’ বলে চিৎকার করে বেড়ার ফাঁক দিয়ে সচল বাঁ হাতটি বাড়িয়ে দেন। সরকারি ও বেসরকারি সব প্রকার সহায়তা থেকে বঞ্চিত প্রতিবন্ধী ময়না। এত বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর দিকে কোনো জনপ্রতিনিধি কিংবা সরকারি কর্মকর্তার দৃষ্টি পড়েনি।

এলাকাবাসী জানায়, মিরি ফকির ভিক্ষা করতে গিয়ে বংশ পরিচয়হীন কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন এক কিশোরীকে ঘরে নিয়ে আসেন। এরপর তাঁকে বিয়ে করে নাম রাখেন মাহমুদা বেওয়া (ময়না)। প্রতিবেশী নজরুল ইসলামের এক খণ্ড জমিতে তালপাতার তৈরি ছোট্ট ঘরে বসবাস করতেন তাঁরা। ভিক্ষা করে খেয়ে না খেয়ে কোনোমতে চলছিল ময়না-মিরি ফকিরের সংসার। প্রায় ২৫ বছর আগে ভিক্ষুক স্বামী মিরি মারা গেছেন। এরপর থেকে একাই কখনো নওগাঁর বালুডাঙ্গা আবার কখনো নওহাটা বাসস্ট্যান্ডে ভিক্ষা করে জীবন চালাচ্ছিলেন। তাঁর এই কষ্টের কথা ভেবে প্রতিবেশীরা সবাই মিলে পুনরায় তাঁকে তাঁর স্বামীর ঠিকানায় নিয়ে আসে। তাঁর জন্য সরকারি কোনো সাহায্য জোটেনি।

প্রতিবেশী নজরুল ইসলাম বলেন, ‘এই বৃদ্ধার বিষয়টি ভাবতেও কষ্ট লাগে। এই ঠাণ্ডার মধ্যে আলো-বাতি ছাড়া অচল হাত-পা নিয়ে একটি মানুষ আর কত দিন বাঁচতে পারে! সরকারি কোনো জায়গায় অথবা বৃদ্ধাশ্রমে নিয়ে গেলে সে হয়তো বাঁচত। তার এই অবর্ণনীয় কষ্ট দেখে আমাদের খুব খারাপ লাগে।’

অসহায় ময়নাকে দেখাশোনার কাজে স্বেচ্ছায় নিয়োজিত প্রতিবেশী সাহারা বানু বলেন, ‘হামি মানসের বাড়িত কাম করে খাই। আশপাশের লোকেরা প্রতিদিন তাকে খাবার দেয়।’

প্রতিবেশী ডা. মোহাব্বত আলী বলেন, ‘বছর দুয়েক আগে ময়না স্ট্রোক করেছিল। আমি আমার ক্লিনিকে নিয়ে তাকে চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। তার বিষয়টি নিয়ে উপজেলা সমাজসেবা অফিস, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যের কাছে গত দুই বছর ঘুরেছি। কিন্তু একটা কম্বল দেওয়া ছাড়া কিছুই করতে পারেনি তারা।’

হাপানিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আফসার আলী বলেন, ‘আমি ওই বৃদ্ধাকে চিনি। ২০-২৫ বছর আগে তার ভিক্ষুক স্বামী মারা গেছে। একসময় তারা দুজনেই ভিক্ষা করে চলত। এখনতো সে পঙ্গু, বিছানা থেকেই উঠতে পারে না। কিছুদিন আগে তাকে একটা কম্বল দিয়েছি। তবে তার কোনো অভিভাবক নেই। থাকলে তারা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করলে হয়তো তার নামে একটা কার্ড করে দিতাম।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা