kalerkantho

শুক্রবার । ১০ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৭ সফর ১৪৪২

বই কিনতে চাপ নইলে মন্ত্রণালয়ের শোকজের হুমকি

আলম ফরাজী, ময়মনসিংহ (আঞ্চলিক)   

২৭ জানুয়ারি, ২০২০ ২০:৫৬ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বই কিনতে চাপ নইলে মন্ত্রণালয়ের শোকজের হুমকি

ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার জেলা পরিষদ বাংলোতে গত আট দিন ধরে অবস্থান করছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক্সিকিউটিভ অফিসার পদের আমজাদ হোসেন ও আব্দুল সালাম নামে দুই ব্যক্তি। তারা প্রতিদিন সকালে এক গাদা বই নিয়ে বের হয়ে যান বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। সেখানে ২০১৮ সালের ২ নভেম্বর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) সেবা শাখার একটি চিঠি দেখিয়ে ৩৬টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৩৪টি মাদরাসা ও ৫টি কলেজে উচ্চমূল্যে একটি বই বিক্রি করছেন। কোনো প্রতিষ্ঠান নিতে না চাইলে বই রেখে একটি ভাউচার দিয়ে তার সাথে একটি বিকাশ নাম্বার দেওয়া হয়। চলে যাওয়ার সময় বলা হয় নির্দিষ্টি সময়ের মধ্যে টাকা পরিশোধ না করলে মন্ত্রণালয় থেকে শোকজ আসবে। ক্ষতি হবে প্রতিষ্ঠানের।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ওই বইটির নাম হচ্ছে ‘সংবাদপত্রে ভাষা আন্দোলন’ (১৯৪৭-১৯৫৬)। ১০৩৬ পৃষ্ঠার ওই বইটির দাম নেওয়া হচ্ছে ২৮০০ টাকা। চিঠি প্রদর্শনকারী ব্যক্তিরা নিজেদের মন্ত্রণালয়ের এক্সিকিউটিভ কর্মকর্তা পরিচয় গিয়ে বই ক্রয় বাধ্যতামূলক বলে প্রতিষ্ঠান প্রধানদের জানাচ্ছেন। বই না কিনলে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হতে পারে বলে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের বক্তব্য ও মন্ত্রণালয়ের চিঠি দেখে  প্রতিষ্ঠানগুলো বই কিনতে রাজী হচ্ছেন। তবে এ পদ্ধতিতে বই বিক্রি করার নীতি-নৈতিকতা নিয়ে বাইরে নানা প্রকারের আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। 

চণ্ডীপাশা ইউনিয়নের একটি মাদরাসার অধ্যক্ষ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মো. আমজাদ হোসেন নামে এক ব্যক্তি নিজেকে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে তাকে বই কিনতে বলেছেন। কিন্তু তিনি কিনবেন কিনা এখনো সিদ্ধান্ত নেননি। তবে মন্ত্রণালয়ের চিঠি দেখিয়ে যেভাবে বলা হচ্ছে তাতে বই না কিনে উপায় নেই।

সিংরইল ইউনিয়নের একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেন, মো. আমজাদ হোসেন নামে এক ব্যক্তি একটি বই দিয়ে নগদ ২৮০০ টাকা নিয়ে গেছেন।

চণ্ডীপাশা ইউনিয়নের একটি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেন, মন্ত্রণালয়ের চিঠি দেখানোর পর আমাদের কী করার থাকতে পারে।

উপজেলার বীর বেতাগৈর ইউনিয়নের একটি বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানান, তিনিও ২৮০০ টাকা দিয়ে একটি বই কিনেছেন। বই ক্রয়ের জন্য তার ই-মেইল ঠিকানায় চিঠি পাঠানো হয়েছিল।

গত দুদিন দশটির বেশি কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেখা যায় (৩৭.০০.০০০০.০৬২.৯৯.০০১.১৭.৩২৮.) নম্বর স্মারকের একটি চিঠি প্রতিষ্ঠান প্রধানদের দেওয়া হয়েছে। চিঠি স্বাক্ষর করেন শিক্ষামন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বিভাগের সেবা শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব মো. শামসুল আলম। স্বাক্ষরের তারিখ গত বছরের ৯ জুলাই। 

এ বিষয়ে আজ সোমবার বিকেলে মো. শামসুল আলমের সাথে টেলিফোনে যোগাযোগ করে নান্দাইলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তার চিঠি প্রদর্শন করে বই বাণিজ্য সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। উত্তরে তিনি বলেন, কাউকে এ ধরনের বাণিজ্য করার এখতিয়ার দেওয়া হয়নি। যারা আমার চিঠি দেখিয়ে বই বাণিজ্য করছেন চাইলে আপনারা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেন। মন্ত্রণালয় থেকে কাউকে বই চাপানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। এরা এক ধরনের প্রতারক হতে পারে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ময়মনসিংহ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (ডিইও) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, বই বিক্রির নির্দেশনা দিয়ে তিনি কোনো বিদ্যালয়ে চিঠি পাঠাননি। তার দপ্তরে মন্ত্রণালয়ের সেবা শাখা থেকে যে চিঠিটি পাঠানো হয়েছিল সেটি তিনি দাপ্তরিক নিয়মে গত ২৭ নভেম্বর অগ্রগামী করেছেন মাত্র। 

নান্দাইল উপজেলার ৭৫টি প্রতিষ্ঠানে গত এক সপ্তাহ ধরে বই বিক্রি করা হচ্ছে। যিনি বই বিক্রি করছেন তার নাম মো. আমজাদ হোসেন। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে আমজাদ হোসেন বলেন তিনি গাড়িতে আছেন। পরে কথা বলবেন। এর কিছুক্ষণ পর মো. সোহেল চৌধুরী নামে এক ব্যক্তি ফোন করেন। তিনি নিজেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের রাজস্ব কর্মকর্তা (রেভিনিউ অফিসার) বলে পরিচয় দেন।

তিনি আমজাদ হোসেনকে শিক্ষামন্ত্রণালয়ের গবেষণা বিভাগের কনিষ্ঠ নির্বাহী (এক্সিকিউটিভ) বলে পরিচয় দিয়ে বলেন, সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্ধ করা হয়েছে বই কিনার জন্য। একেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রায় ৪০ হাজার টাকার বই কিনতে পারবে। এমতাবস্থায় আমজাদ হোসেনের মতো প্রায় ২০০ কর্মকর্তা সারাদেশে বই বিক্রির কাজে নিয়েজিত আছেন। এটি সরকারের গবেষণা বিভাগের কর্মকাণ্ড। 

এ বিষয়ে সিনিয়র সহকারী সচিব মো. শামসুল আলম বলেন, শিক্ষামন্ত্রণালয়ে রেভিনিউ অফিসার ও  এক্সিকিউটিভ নামে কোনো পদ আছে কিনা তার জানা নেই।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা