kalerkantho

বুধবার । ১৩ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ১ রজব জমাদিউস সানি ১৪৪১

মহাসিং নদী বেরিবাঁধ

অক্ষত বাঁধেও সমান বরাদ্দ!

শামস শামীম, সুনামগঞ্জ   

২০ জানুয়ারি, ২০২০ ২০:০১ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অক্ষত বাঁধেও সমান বরাদ্দ!

দক্ষিণ সুনামগঞ্জের মহাসিং নদী তীরের ফসলরক্ষা বাঁধ তিনটি হাওরের ফসলরক্ষায় ভূমিকা রাখে। ২০১৭-২০১৮ ও ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে এই এলাকার মন্ত্রী এবং দেশব্যাপী সজ্জন রাজনীতিক খ্যাত এম এ মান্নানের কঠোর নজরদারির কারণে হাওররক্ষা বাঁধে যথাযতভাবে কাজ হয়েছিল। যার ফলে ঠেকসই বাঁধগুলো এবার অনেকটা অক্ষত রয়ে গেছে। সেই অক্ষত বাঁধগুলোতে আংশিক বরাদ্দ দিয়ে এবার হাওররক্ষা বাঁধের কাজ করার সুযোগ থাকলেও পাউবো-প্রশাসনের দুর্নীতিবাজ একটি চক্র সবগুলো বাঁধেই সমান বরাদ্দ দিয়ে সরকারি বিপুল অর্থ লোপাটের ক্ষেত্র তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এদিকে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান সম্প্রতি একটি সভায় হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ যথাযতভাবে সম্পন্নের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন দুর্নীতি হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। অন্যদিকে বাঁধ নির্মাণ ও তদারকিতে নিয়োজিত সংশ্লিষ্টরা সমান বরাদ্দ দেওয়ার কথা স্বীকার করে বলেছেন আগামীতে যাতে এখানে বাঁধ নির্মাণ না করতে হয় সেজন্য এবার সব বাধগুলোতেও আরো ঠেকসইয়ের জন্য সমান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, জয়কলস, পূর্বপাগলা ও পশ্চিম পাগলা, দুর্গাপাশা, পূর্ববীরগাও ও পশ্চিম বীরগাঁও ইউনিয়নের দেখার হাওর, খাই হাওর ও জামখলা হাওরের ফসলরক্ষা করে মহাসিং নদীর বেরিবাঁধ। ওই এলাকায় মহাসিং নদীর ২৯ কি.মি. দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট তীর রয়েছে। এই তীরের মধ্যে অন্তত ২৫ কি.মি হাওরের ফসলরক্ষার কাজ করা হয়। প্রতি বছরই ওই নির্ধারিত এলাকায় ফসলরক্ষায় বেরিবাঁধ দেওয়া হয়। গত দুই বছর কঠোর নজরদারির কারণে কাজের মান ভালো হওয়ায় বেশিরভাগ বাঁধই অক্ষত রয়ে গেছে। তাই এ বছর ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধে যতসামান্য বরাদ্দ দিলেই কাজ সম্পন্ন করা যেতো বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। কিন্তু প্রাক্কলণের নামে হাওর চিনেনা এমন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে পানি উন্নয়ন রোর্ড ও উপজেলা প্রশাসন হাওররক্ষা বাঁধের প্রাক্কলণ করে ইতোমধ্যে বরাদ্দ ছাড় করে নিয়েছে। সবগুলো বাঁধে সমান বরাদ্দ দেওয়ায় সরকারের বিপুল অংকের টাকা অপচয় হবে বলে জানিয়েছেন কৃষক নেতারা।

পাউবো জানায়, খাই হাওরের ১২.১৮৩ কি.মি বাধ নির্মাণ ও মেরামতে ১৪টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২ কোটি ৫৩ লক্ষ ৪৬ হাজার টাকা। জামখলা হাওরের ৪.০০৫ কি.মি. বেরিবাঁধ নির্মাণে ৫টি প্রকল্পে ৯৫ লক্ষ ৭৮ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দেখার হাওরের ৯.৪৬৬ কি.মি. বাধ নির্মাণ ও মেরামতে ১৪টি প্রকল্পে ২ কোটি ৭৩ লক্ষ ২৬ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

কৃষকরা জানিয়েছেন, পূর্ব পাগলা ও পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের ১৯, ২০, ১১, ১২, ১৩, ১৮ এবং পূর্ববীরগাও ইউনিয়নের ৩১, ৩২, ৩৩ নং প্রকল্পগুলো অনেকটা অক্ষত রয়ে গেছে। এগুলো সামান্য সংস্কার করলেই চলবে। কিন্তু এসব প্রকল্পগুলোতেও সমান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারের বিরাট অংকের টাকা অপচয়ের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অত্যধিক বরাদ্দের এসব প্রকল্পে লুকোচুরিরও আশ্রয় নিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ঘুরে ফিরে গেলবারের পিআইসির লোকদেরই পার্শবর্তী বাঁধের দায়িত্ব দিয়ে অদলবদল করেছেন। এবার ১১ নং প্রকল্পের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে এবছর ১২ নং পিআইসিতে আনা হয়েছে। ১২ নং পিআইসির সংশ্লিষ্টদের নেওয়া হয়েছে ১১ নং পিআইসিতে। অন্যান্য পিআইসি গুলোতেও এভাবে প্রয়োজনাতিরিক্ত বরাদ্দ দিয়ে অদল বদল করা হয়েছে। এবার মহাসিং নদী তীরেই প্রায় ৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অর্ধেকই প্রয়োজনাতিরক্ত বরাদ্দ বলে জানিয়েছেন হাওর আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ।

হাওরের কৃষি ও কৃষক রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি প্রফেসর চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, সরকার কৃষকের ফসলরক্ষায় আন্তরিক। এ কারণে গত কয়েক বছর ধরে বরাদ্দ বাড়িয়ে যেকোনো মূল্যেই কৃষকের ফসল গোলায় তোলতে চায়। সরকারের বিপুল এই অর্থকে হাতিয়ে নিতে নানা ফন্দিফিকিরও বের করেছে দুর্নীতিবাজরা। এবারও আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধেও সমান বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। সব স্থানেই এসব হচ্ছে।

হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু বলেন, আমাদের কর্মীরা বিভিন্ন হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ পরিদর্শন করে দেখেছেন অক্ষত বাঁধেও ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধের মতো সমান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারের বিরাট অংকের টাকা লোপাটের ক্ষেত্র তৈরি হয়। তাছাড়া বিভিন্ন স্থানে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ করেও সরকারি টাকা অপচয় করা হচ্ছে। আমরা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছি। 

দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও হাওরের ফসলরক্ষা কমিটির সভাপতি জেবুন্নাহার শাম্মী বলেন, প্রাক্কলণের ভিত্তিতেই প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আগামীতে যাতে এসব বাঁধে কাজ করা না লাগে এজন্য সমান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

গত শুক্রবার পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান জামালগঞ্জের একটি সভায় এ বিষয়ে বলেন, এবার হাওরাঞ্চলে ফসলরক্ষায় সরকার ১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। বরাদ্দ যাতে যথাযতভাবে ব্যয় হয় সেজন্য আমরা সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছি। বাঁধে অনিয়ম ও দুর্নীতি এবং সরকারের অর্থ অপচয় হলে জড়িতদের ছাড় নেই।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা