kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জানুয়ারি ২০২০। ১৪ মাঘ ১৪২৬। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

দুপুরে হঠাৎ বৃষ্টির মতো গুলি ছুঁড়তে থাকে পাঞ্জাবিরা

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, হাটহাজারী   

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ২১:২৬ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



দুপুরে হঠাৎ বৃষ্টির মতো গুলি ছুঁড়তে থাকে পাঞ্জাবিরা

১১ এপ্রিল ১৯৭১, দুপুর ১২টা। চট্টগ্রাম হাটহাজারী সড়কের নন্দীরহাটে দিঘীর পাড়ে আমরা ১৮০ জন মুক্তিযোদ্ধা দুপুরের খাবার খেতে বসি। তখন দিকে চৌধুরীহাটের দক্ষিণ এলাকা থেকে হঠাৎ ট্যাংক এবং আর্টিলারি কামান থেকে গুলি ছুঁড়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। আমরা তখন পাল্টা গুলি ছুঁড়ি রাইফেল, আর আর কামান, এল এম জি, এস এম জি (স্মল মেশিনগান) দিয়ে। দুপুর হতে সন্ধ্যা পর্যন্ত  টানা যুদ্ধ চলে। দিনভর প্রথম এ সম্মুখযুদ্ধে আমাদের সঙ্গী বেঙ্গল রেজিমেন্টের ৩ জন মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক শহীদ হন।

এর আগে ৩ এপ্রিল আমরা প্রায় ৮০ জন মুক্তিযোদ্ধা তিন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে দক্ষিণ পাহাড়তলীর সাধুর পাহাড়, ইটখোলা ও বড়দিঘিরপাড় এলাকা থেকে তিনদিক থেকে একযোগে সেনানিবাসের সাপ্লাই এলাকার এসএমজি, এসএসবি ও এসএমসি এরিয়াতে গুলি ও বোমা  হামলা করি। জোহরের নামাজের পর থেকে আমরা গুলি বর্ষণ শুরু করি। আমাদের নিকট অস্ত্র বলতে একটি এলএমজি এবং কিছু রাইফেল ছিল। এ সময় প্রতিপক্ষের পাল্টা গুলিতে সাধুর পাহাড় এলাকায় যুদ্ধে আমাদের সহযোদ্ধা ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের এক সৈনিক শহীদ হন।

হাটহাজারীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব মাস্টার মো. ইউছুপ সাক্ষাতকালে উপরোক্ত স্মৃতি তুলে ধরেন।

৭১’এর রণাঙ্গনের বীর সেনানি মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব মো. ইউছুপ। বর্তমানে বয়স প্রায় ৭২। হাটহাজারী উপজেল গুমানমর্দন ইউনিয়নের নুর আহাম্মদ মাস্টারের বাড়ির বাসিন্দা মাস্টার ইউছুপ আজীবন মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। সর্বশেষ ফতেপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে অবসর নেন ২০১৩ সালে। দুই ছেলে ও ১ কন্যার জনক তিনি। তার এক ছেলে সিরামিক প্রকৌশলী অপর ছেলে ব্যাংকার। একমাত্র কন্যা পেশায় ডাক্তার।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে হাটহাজারী উপজেলার গুমানমর্দন ইউনিয়ন ও উপজেলায় সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর ডাকে গঠিত সংগ্রাম পরিষদের সদস্য ও গুমানমর্দন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধা ইউছুপ ছিলেন ২০ বছরের টগবগে তরুণ। তিনি তখন চট্টগ্রাম কলেজের মানবিক বিভাগের ডিগ্রির শিক্ষার্থী ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ৬ দফায় অনুপ্রাণিত হয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে উৎসাহী হন তরুণ ইউছুপ।

যুদ্ধে যাওয়ার পটভূমি বলতে গিয়ে ইউছুপ বলেন, উচ্চ মাধ্যমিক থেকে ডিগ্রি পর্যন্ত চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্র ছিলাম বিধায় ১৯৬৬ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত নগরীর প্যারেড গ্রাউন্ড, পলোগ্রাউন্ড, লালদিঘীর মাঠে যত জনসভা হয়েছে সব কটিতেই আমি সক্রিয় উপস্থিত ছিলাম। এ সময় নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা প্রচারে বিশেষ ভূমিকা রাখি। যুদ্ধ শুরুর দিকে হাটহাজারীর সাবেক গণপরিষদ সদস্য এম এ ওহাব এবং হাটহাজারী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ডা. আবুল হাশেমের নির্দেশে জিপে করে আমি, হাফেজ কামাল, শহীদ আলিম উল্লাহ, মাস্টার দেলোয়ার পাশাসহ আমরা মোট ৬ জন মুক্তিযোদ্ধা রামগড়ে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে যাই। সেখানে ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদের আমাদের গ্রেনেড ছুঁড়ে মারা, রাইফেল চালানোসহ যুদ্ধের বিভিন্ন আত্মরক্ষামূলক কৌশল প্রশিক্ষণ দেন। আমরা প্রায় ৫ দিন প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজ গ্রামে ফিরে আসি।

মুক্তিযুদ্ধের সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভিসি এ আর মল্লিক, সাবেক গণপরিষদ সদস্য এম এ ওহাবকে নিয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা ও নিদেশনা দিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধাদের। এ সময় ইপিআরের পাওয়াফুল বেতার কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছি চবি ১ নম্বর সড়কের উত্তর পাশে মদন শাহ মাজারের উত্তরে এলাকার হাসমত আলী মিস্ত্রির বাড়িতে। এ কেন্দ্র থেকে ভারতের সাথে এবং সীমান্তের ইপিআর ক্যাম্পে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ করা হত।

যুদ্ধের প্রথমাবস্থায় ২ ও ৩ এপ্রিল এমপি এম এ ওহাবের নেতৃত্বে ইপিআর এর সুবেদার আব্দুল আজিজ এবং সুবেদার আব্দুল গণির নেতৃত্বে আমরা চট্টগ্রাম সেনানিবাসে গুলি বর্ষণ করি। প্রায় ৮০ জন মুক্তিযোদ্ধা  তিন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে দক্ষিণ পাহাড়তলীর সাধুর পাহাড়, ইটখোলা ও বড়দিঘিরপাড় এলাকা থেকে সেনানিবাসের সাপ্লাই এলাকার এসএমজি, এ্সএসবি ও এসএমসি এরিয়াতে গুলি ও বোমা হামলা করি। ৩ মার্চ জোহরের নামাজের পর থেকে আমরা গুলি বর্ষণ শুরু করি। আমাদের নিকট অস্ত্র বলতে একটি এলএমজি এবং কিছু রাইফেল ছিল। হাফেজ কামালে হাতে ছিল একটি চাইনিজ রাইফেল। রাতে বিরতি দিয়ে ৪ এপ্রিল ভোরে আমরা পুনরায় গোলা বর্ষণ শুরু করি সেনানিবাসের নির্দিষ্ট এলাকায়। এ সময় প্রতিপক্ষের পাল্টা গুলিতে সাধুর পাহাড় এলাকায় যুদ্ধে আমাদের সহযোদ্ধা এক সৈনিক শহীদ হন। এ শহীদের লাশ আমরা আনতে পারিনি। সেদিন সেনানিবাসে আমাদের হামলার কারণে সেনানিবাসে আটকে পড়া বাঙালি পরিবারগুলো বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়। এক পর্যায়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী চট্টগ্রাম সেনানিবাস থেকে বেরিয়ে হাটহাজারীর দিকে আসতে থাকে।

নন্দীরহাটে প্রথম সম্মুখযুদ্ধ : পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সেনানিবাস থেকে হাটহাজারীর দিকে অগ্রসর হওয়ার সংবাদ পেয়ে ১১ এপ্রিল আমরা এমপি ওহাব এবং ক্যাপ্টেন এজাজের নেতৃত্বে অক্সিজেন হাটহাজারী সড়কের নন্দীরহাট দিঘিরপাড়ে অবস্থান করি। ক্যাপ্টেন এজাজ ও ক্যাপ্টেন মোছলেহ উদ্দিন অস্ত্র দিয়ে আমাদের সাহায্যে সহযোগিতা ও প্রশিক্ষণ দেন। এ সময় ছাত্র জনতা, ইপিআর, বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিক মিলে প্রায় ১৮০ জন যোদ্ধা ছিলাম। নন্দীর হাটের দিঘীর পূর্বপাড়ে একটি বিল্ডিংয়ে দুপুর ১২টার আমরা দুপুরের খাবার খেতে বসি। তখন দিকে চৌধুরীহাটের দক্ষিণ এলাকা থেকে ট্যাংক এবং আর্টিলারি কামান থেকে গুলি ছুঁড়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। আমরা তখন পাল্টা গুলি ছুঁড়ি রাইফেল, আর আর কামান, এল এম জি, এস এম জি (স্মল মেশিনগান) দিয়ে। দুপুর হতে সন্ধ্যা পর্যন্ত টানা যুদ্ধ চলে। এক সময় পাঞ্জাবিরা পিছু হটে সেনানিবাস চলে যায়। এ সম্মুখ যুদ্ধে বেঙ্গল রেজিমেন্টের ৩ জন মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক শহীদ হন। পরে আমরা চবি ক্যাম্পাসে অস্থায়ী ক্যাম্পে গিয়ে রাতের খাবার খাই।

১২ এপ্রিল ভোরে পাকিস্তানি বাহিনী পুনরায় আসার খবর পেয়ে আমরা আলাওলদীঘির দক্ষিণ পাড়ে গিয়ে সতর্ক অবস্থান নিই। বেলা ১০টার দিকে ট্যাংক ও ভারী অস্ত্র নিয়ে আক্রমন করে পাকিস্তানি বাহিনী। এ সময় পাঞ্জাবিরা আমাদের উপর ট্যাংক ও কামানের গোলা নিক্ষেপ করে। এক পর্যায়ে আত্মরক্ষার্থে আমরা পিছু হটে নাজিরহাটে গিয়ে অবস্থান নিই।

নভেম্বরের শেষের দিকে রাউজান এবং ফটিকছড়ির কিছু অংশ স্বাধীন ঘোষণা করে ফটিকছড়ির মির্জা মনসুর এমপি এবং বিএলএফের ল্যাফটেন্যান্ট শওকত আলীর নেতৃত্বে ফটিকছড়ির কালু মুন্সির হাটে (নানুপুর বাজার) স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয়। এতে মির্জা মনসুর এমপি ও ল্যাফটেন্যান্ট শওকত আলী সামরিক অভিবাদন গ্রহণ করেন। স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন সুবেদার ছাবেদ আলী। এ অনুষ্ঠানে কোরআল তেলওয়াত করেন হাটহাজারীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হাফেজ মো. কামাল। এ সময় আমরা সাধারণ মুক্তিযোদ্ধারা ছাড়াও সামরিক বাহিনী, পুলিশ, ইপিআরসহ এলাকার বিভিন্ন স্তরের শত শত মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

যুদ্ধে যাওয়া মাস্টার মো. ইউছুপ এখন অবসর জীবন যাপন করছেন। তিনি বলেন, আমার চাওয়া পাওয়ার কিছু নেই। যে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধে গিয়েছিলাম তা পেয়ে গেছি। বর্তমানে স্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার রাজনীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দক্ষতায় মুগ্ধ তিনি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা