kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জানুয়ারি ২০২০। ১৪ মাঘ ১৪২৬। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

বিজয়ের ৪৮ বছরেও সংরক্ষণ হয়নি চান্দিনার কাশিমপুর গণকবর

চান্দিনা (কুমিল্লা) প্রতিনিধি   

১৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ ২৩:০৫ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বিজয়ের ৪৮ বছরেও সংরক্ষণ হয়নি চান্দিনার কাশিমপুর গণকবর

ছবি : কালের কণ্ঠ

মহান বিজয়ের ৪৮ বছরেও সংরক্ষণ করা হয়নি কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার কাশিমপুর গ্রামের গণকবরটি। স্থানটিতে নেই কোনো স্মৃতি চিহ্ন। খাস ভূমিতে থাকা ওই গণকবরটি এখন স্থানীয়দের গৃহস্থলির কাজে ব্যবহার হচ্ছে।

গণকবরটি চান্দিনা উপজেলার মাধাইয়া ইউনিয়নের কাশিমপুর পেইরাপাড় এলাকায় পুকুরের পাড়ে মাধাইয়া-কাশিমপুর সড়কের পাশে সরকারি খাস ভূমিতে পরে আছে। গণকবরটির দুই পাশে রয়েছে স্থানীয়দের বসতি।

সরেজমিনে কাশিমপুর গণকবরের খোঁজে ওই এলাকায় গেলে কথা হয় সেই দিন পাকবাহিনীর হাতে নির্মমভাবে হত্যার শিকার হওয়ায় শহীদ পরিবারের সদস্য ও এলাকাবাসীর সঙ্গে।

বিজয়ের ৪৮ বছরেও ৮ শহীদের গণকবরটি সরকার সংরক্ষণ না করায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে এলাকাবাসী বলেন, আমরা টাকা-পয়সা চাই না। মুক্তিযুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনী এ গ্রামে যে বর্বরতা চালিয়েছে, নৃশংসভাবে এলাকার ৮ জন নিরীহ মানুষকে যেভাবে হত্যা করেছিল এবং তাদেরকে যে স্থানটিতে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল সেই স্থানটি সংরক্ষণ করা হউক সেই টুকু চাই। যাতে এ গ্রামের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গণকবরের স্মৃতি চিহ্নটি দেখে ৮ শহীদের কথা স্মরণ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধরে শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে।

সেই দিনের কথা স্মৃতিচারণ করে শহীদ অমূল্য দাসের ছেলে স্বপন দাস (৬২) জানান, স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় কাশিমপুর গ্রামটি ছিল হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা। সেই দিন ছিল আষাঢ় মাসের শনিবার গভীর রাত। আমরা সবাই ঘুমিয়ে ছিলাম। আমাদের বাড়ি ঘেরাও করে আমার বাবা অমূল্য দাস ও আমাকে ধরে নিয়ে যায় পাশের বাড়িতে। আমি ছোট বিধায় আমাকে রাখা হয়েছিল নারীদের সঙ্গে এক ঘরে আর আমার বাবাকে বেধে রাখা হয়েছিল বাহিরে। পরবর্তীতে একে একে করে গুলি করে হত্যা করে ৮ জনকে। 

আর যাদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল তারা হলেন- জগবন্ধু মাষ্টার (৬০) ও তার ছেলে সুধীর সরকার (৪০), চিত্ত রঞ্জন সরকার (৪৫), অমূল্য চন্দ্র দাস (৫০), চেতন চন্দ্র সরকার (৩৫), যুগেন্দ্র চন্দ্র সরকার (৪০), শিশু চন্দ্র সরকার (৩৮) ও শান্তি রঞ্জন শীল (৩৫)।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী রমিজ উদ্দিন (৬৫) ভয়াল সেই দিনের স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘সেই রাতে আমাদের মেহমান থাকায় ঘরে জায়গা ছিল না। নৌকায় দুই বস্তা চাউল ছিল। আমি আর আমার বড় ভাই বাচ্চু মিয়া আমরা নৌকায় ঘুমিয়েছিলা। শনিবার গভীর রাতে চিল্লা-চিল্লির (আর্তনাদ) আওয়াজ শুনে আমরা নৌকা থেকে দৌঁড়ে আসি।

এসে দেখি জোরপুকুরিয়া গ্রামের রাজাকার আব্দুর রহমান পাকিস্তানি মেলিটারী নিয়ে হিন্দু বাড়ির সকলকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। তখন আমারে দেখেও ধরে ফেলে। হিন্দু পাড়ার ৯ জন আর মুসলিম ৬ জনকে ধরে দাস বাড়িতে নিয়ে  সকলকে বেঁধে বুট জুতা দিয়ে পাড়ায়। অনুমান এক ঘণ্টা সকলকে মারধর করে কলমা জিজ্ঞাসা করে ও পরনের কাপড় খুলে দেখে। নয়জন হিন্দুর মধ্যে ৮ জনকে গুলি করে মারে আর বলাই দত্ত নামে একজনকে মুসলিম ভেবে আর মারেনি।

গণকবর সম্পর্কে তিনি আরো বলেন, ‘রবিবার সারা দিন লাশগুলো বিচ্ছিন্নভাবে পড়ে ছিল। কেউ ধরার সাহসও পায়নি। বিকেলে গ্রামের দুধ মিয়া, চাঁন মিয়া, মোহাম্মদ আলীসহ আমরা ৫/৬ জন মিলে পুকুর পাড়ে ২টি গর্ত করে মাটি চাপা দেই। তারা হিন্দু আর আমরা মুসলিম। সেদিন যদি আমাকেও মেরে ফেলত তাহলে আমার লাশটিও তো তাদের সঙ্গে এই জায়গায় থাকত।

বিজয়ের ৪৮ বছরেও গণকবরটি সংরক্ষণ না হওয়ায় রমিজ উদ্দিন তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘হের পরে দেশ স্বাধীন হইল, মানু বাড়ল এক এক কইরা ৪৮ বছর কাইটা গেল কেউ আর তারার খবর লইল না। আফনেরারে (সাংবাদকর্মীরা) দেখতাছি কয়েক বছর ধইরা আইতাছেন। কই, কিছুই করতেন পারছেন না। আফনারার কাছে আমরা ট্যাহাও চাইনা, পইসাও চাই না, মানুষটির স্মৃতিডা যাতে থাহে হেইডা শুধু চাই’।

এদিকে বিজয়ের মাস আসলেই গণকবরটি সংরক্ষণে স্থানীয় সংবাদকর্মীরা গত এক যুগেরও বেশি সময় যাবৎ স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করলেও শুধু আশার বানী দিয়ে যাচ্ছেন প্রশাসন। একইভাবে গত ১২ ডিসেম্বর চান্দিনা মুক্ত দিবসে কড়া নাড়া হয় উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে। সংবাদকর্মীদের মুখে বিষয়টি জানার পর চান্দিনা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) স্নেহাশীষ দাশ শনিবার (১৪ ডিসেম্বর) সকালে সরেজমিনে গণকবর স্থানটি পরিদর্শন করেন।

তাৎক্ষণিকভাবে তিনি মাধাইয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানকে ১৬ ডিসেম্বরের আগেই স্থানটি সংরক্ষণ করে শহীদদের নামের তালিকা সম্বলিত একটি ফলক স্থাপনের নির্দেশ দেন।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা তপন বক্সী, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আব্দুল মালেক, মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জব্বার, মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি বিষয়ক গবেষক তাহমিদুর রহমান দিদার প্রমুখ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা