kalerkantho

সোমবার। ২৭ জানুয়ারি ২০২০। ১৩ মাঘ ১৪২৬। ৩০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

নিয়মের ‘গ্যাঁড়াকলে’ তালিকাভুক্ত হতে পারেননি ১৭ মুক্তিযোদ্ধা!

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি   

৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ ২১:৪৬ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নিয়মের ‘গ্যাঁড়াকলে’ তালিকাভুক্ত হতে পারেননি ১৭ মুক্তিযোদ্ধা!

মৃত্যুর পর ‘গার্ড অব অনার’ পেয়েছেন। পেয়েছেন অন্যান্য মর্যাদা। যুদ্ধে অংশ নেওয়া, যুদ্ধ শেষে অস্ত্র জমা দেওয়ার যাবতীয় কাগজপত্র আছে। নাম তালিকাভুক্তির প্রথম যাচাই-বাচাইয়ে তিনি টিকে গিয়েছিলেন। তবে সর্বশেষ বাছাইয়ে বাদ পড়ছে মীর হারুণ অর রশিদের নাম।

ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় শরনার্থী ক্যাম্পে থেকে দীর্ঘ নয় মাস শিক্ষকতা করেছেন চানু চন্দ্র দেব। এ সংক্রান্ত কাগজও তাঁর কাছে রয়েছে। তিনিও মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম উঠাতে পারেননি। সর্বশেষ বাছাইয়ে তাঁর নামও টেকেনি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের এমন মোট ১৭ জন মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম উঠাতে পারেননি। তালিকাভুক্তির দাবিতে রবিবার সকালে তাঁরা শহীদ মিনার প্রাঙ্গনে অবস্থান ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন। কর্মসূচি থেকে অচিরেই তাঁদের তালিকাভুক্তির দাবি জানানো হয়েছে। 

মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের স্বজনরা এ নিয়ে ক্ষুব্দ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। এ সময় তাঁদের হাতে থাকা ফেস্টুনে লেখা ছিলো, ‘স্বাধীনতা অর্জনই লক্ষ ছিলো ডকুমেন্ট রক্ষা না’, ‘প্রতিহিংসা বর্জন করুন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা বাছাই করুন’ ইত্যাদি। কর্মসূচিতে আবদেন করা ওই ১৭ মুক্তিযোদ্ধা বাদেও আরো কয়েকজনের স্বজন অংশ নিয়ে একই দাবি তুলেছেন।

তবে বাছাই সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মুক্তিযোদ্ধা বাছাইয়ে সরকার যে নীতিমালা করেছে সেটি মানতে গিয়ে তাদেরকে তালিকাভুক্ত করতে সুপারিশ করতে সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে লাল বার্তায় নাম থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের দেয়া সাক্ষ্য ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র অনুসারে তাঁদেরকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রমাণ করা যায়নি।

এদিকে যাচাই-বাছাই কমিটির সর্বশেষ সভায় মো. ফখরুল ইসলাম নামে একজনকে ভাতা প্রাপ্তির জন্য সুপারিশ করা হয়। ফখরুল ইসলাম হলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসনের সংসদ সদস্য বি এম ফরহাদ হোসেন সংগ্রামের বাবা। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তিনি আগে থেকেই তালিকাভুক্ত হলেও এখন ভাতা পাওয়ার যোগ্য হলেন।

ফখরুল ইসলাম ভাতা পাওয়ার মধ্য দিয়ে নাসিরনগরে ৮০ জনের কোটা পূরণ হলো। এখন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নতুন করে কেউ তালিকাভুক্ত হলে ভাতার জন্য কোটা অনুমোদন করিয়ে আনতে হবে। এর আগে কেউ তালিকাভুক্ত হলেও ভাতা পাবেন না।

বঞ্চিত মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের স্বজনরা জানান, মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেতে ২০১৩ সালে অনলাইনে আবেদন করেন ১৭ মুক্তিযোদ্ধা। এর মধ্যে আটজনকে সুপারিশ করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু যাচাই-বাছাই কমিটির তৎকালীন সভাপতি অ্যাডভোকেট ছায়েদুল হক এমপি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় (বর্তমানে প্রয়াত) তাঁর সঙ্গে আলোচনা করে স্বাক্ষর নিতে না পারায় বিষয়টি এগোয়নি। গত ৪ ডিসেম্বর নতুন কমিটি যাচাই বাছাইয়ের জন্য ওই ১৭ জন মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের স্বজনদেরকে ডাকেন। ওই সভাতে নানা বিষয় নিয়ে হট্টগোল হয়।

মানববন্ধনে অংশ নেওয়া হারুণ অর রশীদের ছেলে জিয়াউল হাসান বলেন, ‘আমাদের আদি নিবাস হলো নাসিরনগর। আমার বাবা চট্টগ্রাম এলাকা থেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। যুদ্ধে অংশ নেয়াসহ অস্ত্র জমাদানের সকল কাগজপত্র আছে। মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় সম্মাননাও জানানো হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা কোটায় আমি ও আমার ভাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করি। তালিকাভুক্তির সনদ দেখাতে পারছি না বলে এখন আমাদের পড়াশুনাই অনিশ্চয়তার মধ্যে।’

নাসিরনগরের বর্তমান ও আগের যাচাই-বাছাই কমিটির সদস্য মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুল বাকী এ প্রসঙ্গে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারের নিয়ম অনুসারে ভাতা চালু থাকা সংখ্যার শতকরা ১০ ভাগ মুক্তিযোদ্ধাকে তালিকাভুক্ত করা সম্ভব। যে অনুসারে নাসিরনগরে আটজন মুক্তিযোদ্ধাকে অন্তর্ভূক্ত করা যাবে। আগের সভাতে আমি কয়েকজনের ব্যাপারে সায় দিয়েছিলাম। নতুন নিয়ম অনুসারে তালিকাভুক্ত করতে গিয়ে যেসব ডকুমেন্ট দরকার তাঁরা সেগুলো দিতে পারেননি।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার ব্যাপারে এত কড়াকড়ির বিষয়ে কোনো জবাব আমার পক্ষে দেওয়া সম্ভব না। হয়তো সারা দেশের পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার একটা নিয়মের মধ্যে এনেছেন। আমিতো চাই সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধা হলে তিনি যেন তালিকাভুক্ত হন। কিন্তু কিছু দায়বদ্ধতার কারণে নিজ থেকে ঝুঁকি নিতে পারি না। কেননা, কোনো কারণে কেউ এ বিষয়ে ডিফল্ট হলে আমার উপর দায় বর্তাবে। আমার ভাতা বন্ধ হয়ে যাবে।’ তিনি জানান, কেউ নিজ এলাকার বাইরে যুদ্ধে অংশ নিয়ে থাকলে ওই এলাকা থেকে এ বিষয়ে সার্টিফিকেট আনতে হবে। 

মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটির সভাপতি মিছবাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘যুদ্ধ সংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে না পারায় কাউকেই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সুপারিশ করা যায়নি। এ বিষয়ে আমরা একটি শূন্য প্রতিবেদন পাঠিয়েছি।’

উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা মো. আবুল খায়ের বলেন, ‘আমি মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটির সদস্য নই। তবে কাজের সুবিধার্থে আমাকে রাখা হয়েছিলো। ওই সভায় প্রয়োজনীয় কাগজ দেখাতে না পারায় কাউকেই তালিকাভুক্তির সুপারিশ করা যায়নি। তবে একজনকে ভাতাপ্রাপ্তির জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। ওই একজন ভাতাপ্রাপ্তির মধ্য দিয়ে নাসিরনগরের ৮০ জনের কোটা পূরণ হবে।’

যাচাই-বাছাই কমিটির সদস্য সচিব ও নাসিরনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজমা আশরাফী বলেন, ‘তালিকাভুক্তির জন্য যারা আবেদন করেছেন তাঁরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন বলে অনেকে বলেছেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় ক্রাইটেরিয়া তাঁরা রক্ষা করতে পারেননি। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ থেকে আমাদেরকে যে সময়সীমা দেওয়া হয়েছে এর মধ্যে প্রতিবেদন পাঠিয়ে দিয়েছি। এখন নতুন কোনো নির্দেশনা এলে সে অনুযায়ী কাজ করা যাবে।’    

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা