kalerkantho

সোমবার। ২৭ জানুয়ারি ২০২০। ১৩ মাঘ ১৪২৬। ৩০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

পায়রাবন্দে রোকেয়া দিবসকে ঘিরে তিন দিনব্যাপী নানা আয়োজন

দেড় যুগেও পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্র

আঞ্চলিক প্রতিনিধি, রংপুর   

৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ ১৭:২২ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পায়রাবন্দে রোকেয়া দিবসকে ঘিরে তিন দিনব্যাপী নানা আয়োজন

কাল ভারতীয় উপমহাদেশের নারী জাগরণের পথিকৃত মহীয়সী বেগম রোকেয়ার জন্ম ও মৃত্যু দিবস। এ উপলক্ষে তাঁর জন্মভূমি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দে তিন দিনব্যাপী বেগম 'রোকেয়া দিবস' পালিত হবে। দিবসটি পালনে উপজেলা ও রংপুর জেলা প্রশাসন নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

কর্মসূচির প্রথম দিনে রয়েছে, রোকেয়ার স্মৃতি স্তম্ভে পুষ্পমাল্য অর্পণ, স্বেচ্ছায় রক্তদান, রোকেয়া বই মেলা উদ্বোধন, আলোচনাসভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন রংপুর-৫ (মিঠাপুকুর) আসনের এমপি এইচ এন আশিকুর রহমান, বাংলা একাডেমির সচিব মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হক, রংপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট ছাফিয়া খনম, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. নাজমুল আহসান কলিম উল্লাহ।

এ ছাড়াও উপস্থিত থাকবেন রংপুর বিভাগীয় কমিশনার কে. এম. তারিকুল ইসলাম, রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি দেবদাস ভট্রাচার্য্য, জেলা প্রশাসক আসিব আহসান, রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মমতাজ উদ্দিন আহমেদ, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রাজু, বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রের উপ-পরিচালক পরিচালক আব্দুল্লাহ আল ফারুক, মিঠাপুকুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জাকির হোসেন সরকার প্রমুখ। দিবসের দ্বিতীয় দিনে শিশুদের চিত্রাংকন, রচনা, কবিতা আবৃত্তি, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্রামান্য চিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে। শেষ দিনে পদক বিতরণ, নাটক- ‘শাস্তি’, আলোচনাসভা ও বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হবে। 

পায়রাবন্দ ঘুরে জানা যায়, ১৯৯৭ সালে রোকেয়ার জন্মভিটায় স্মৃতি কেন্দ্রটির ভিত্তিপ্রস্তুর স্থাপন করা হয়। স্মৃতি কেন্দ্রে রয়েছে একটি অফিস ভবন, সর্বাধুনিক গেস্ট হাউজ, মিলনায়তন, ডরমেটরি, গবেষণা কক্ষ, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, গ্রন্থাগার, আবাসিক সুবিধাসহ বিশাল অবকাঠামো উন্নয়ন করা হয়। স্মৃতি কেন্দ্রের ভেতর মনোরম পুকুরপাড়ে তৈরি করা হয় বেগম রোকেয়ার একটি ভাস্কর্য। ২০০১ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর উদ্বোধন করেন। কিন্তু যে লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিয়ে স্মৃতি কেন্দ্রটি স্থাপন করা হয় এর সঠিক তদারকি ও অর্থাভাবে বর্তমানে করুনদশায় পরিণত হয়েছে। গ্রন্থাগার থাকলেও সেখানে যুগোপযোগী বই ও সাময়িকী নেই। মিলনায়তনের অবস্থাও করুণ। মহিলাদের সেলাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে যন্ত্রপাতি থাকলেও কার্যক্রম না থাকায় ধুলো-ময়লা জমে তা নষ্ট হওয়ার পথে। নিময়তি তদারকির অভাবে প্রায় সময় স্মৃতি কেন্দ্রটি থাকে অন্ধকারে। এ অবস্থায় অনেক দূর-দূরান্ত থেকে বেগম রোকেয়ার জন্মভিটা দেখতে এসে দর্শনার্থীরা হতাশ হয়ে ফিরে যান।

এদিকে তাঁর পরিবারের সদস্যদের নানা আক্ষেপ ও কষ্টের কথাও শোনা গেছে। রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্রের অদূরে বেগম রোকেয়ার ছোট ভাই মছিহুজ্জামান সাবেরের মেয়ে রনজিনা সাবেরের (৬৫) বাড়ি। তিনি স্বামী এক ছেলে এক মেয়ে নিয়ে সেখানে বসবাস করছেন। আক্ষেপ নিয়ে রনজিনা সাবের জানান, ‘ডিসেম্বর এলেই রোকেয়াকে নিয়ে শুরু হয় নানা আয়োজন। কেউ খোঁজ নেয় রোকেয়ার পরিবারের। পরিবারের দাবি বেগম রোকেয়ার দেহাবশেষ কলকাতার সোদপুর থেকে তার জন্মস্থান রংপুরের পায়রাবন্দে এনে সমাহিত করতে। এখানে তাকে সমাহিত করা হলে বর্তমান প্রজন্মের কাছে তিনি যুগযুগ ধরে বেঁচে থাকবেন।’

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রংপুরের পায়রাবন্দের খোর্দমুরাদপুর গ্রামে মহিয়ষি নারী বেগম রোকেয়া ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম জহির উদ্দিন মোহাম্মদ আবু আলী হায়দার সাবের। মা রাহাতুন্নেসা সাবেরা চৌধুরানী। ১৮৯৮ সালে ১৬ বছর বয়সে ভাগলপুর নিবাসী ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট খান বাহাদুর সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে বিয়ে হয় তাঁর। ২৮ বছর বয়সে স্বামী হারান তিনি। ১৯১০ সালের শেষ দিকে তিনি কোলকাতায় যান। তাঁর লেখা অবরোধবাসিনী, সুলতানার স্বপ্ন, অর্ধাঙ্গী, মতিচুর ছাড়াও অসংখ্য বই লিখে তিনি সারা বিশ্বে সমাদৃত হন। নারী জাগরণের এই পথিকৃত ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর কলকাতায় মারা গেলে তাঁকে সোদপুরে সমাহিত করা হয়।

১৯৯৭ সালের ২৮ জুন তৎকালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘বেগম রোকেয়ার স্মৃতি কেন্দ্রের’ ভিত্তিপ্রস্তুর কাজের উদ্বোধন করে সেখানে একটি জলপাই গাছের চারা গাছ রোপন করেন। গাছটি ইতিমধ্যে ডাল-পালা ছাড়িয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে গাছটিতে জলপাই ধরতে শুরু করেছে।

এদিকে সরকারিভাবে না হলেও বর্তমানে পায়রাবন্দ ও বৈরাগীগঞ্জ এলাকায় বেসরকারিভাবে কর্মসংস্থানের জন্য গড়ে উঠেছে একাধিক ছোট ছোট কুঠির শিল্প, বিজ প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্রসহ নানা প্রতিষ্ঠান। তবে বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্রের পাশে ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘পায়রাবন্দ বেগম রোকেয়া স্মৃতি মহাবিদ্যালয়’টিকে সরকারিকরণ করা হয়েছে। এলাকার নানা পেশার মানুষের এখন একটাই দাবি অর্থনৈতিক মুক্তির পাশাপাশি সাংস্কৃতিক মুক্তির জন্য বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্রটি অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গরুপে চালু করা হোক।

বেগম রোকেয়া স্মৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক ও রোকেয়া গবেষক রফিকুল ইসলাম দুলাল জানান, ‘যে স্বপ্ন নিয়ে এই স্মৃতিকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছিল এতোদিনেও তার পূর্ণাঙ্গরুপ পায়নি। প্রতিষ্ঠানটি তৈরির পর থেকে নানা জটিলতা সৃষ্টি হয়। তার ওপর আছে কর্মচারীদের চাকরি স্থায়ী না হওয়া।

বেহালদশার কথা স্বীকার করে বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্রের উপ-পরিচালক আব্দুল্লাহ আল ফারুক বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে অনেক যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়েছে এটা ঠিক। এজন্য সার্বিক সংস্কার করতে অর্থ বরাদ্দ চেয়ে ইতিমধ্যে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তবে অন্যান্যবারের মতো এবারেও তিনদিনের কর্মসূচি পালন করা হবে। ইতিমধ্যে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা