kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ জানুয়ারি ২০২০। ৭ মাঘ ১৪২৬। ২৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

সোনামসজিদে চীরনিদ্রায় শায়িত মুক্তিযুদ্ধে শহীদ মেজর নাজমুল হক

৭নং সেক্টরের প্রথম কমান্ডারকে দেয়া হয়নি স্বীকৃতি

আহসান হাবিব, আঞ্চলিক প্রতিনিধি, চাঁপাইনবাবগঞ্জ   

৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০৯:২৩ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



৭নং সেক্টরের প্রথম কমান্ডারকে দেয়া হয়নি স্বীকৃতি

প্রতিরোধ সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও রাষ্ট্রীয় কোনো পদক দেওয়া হয়নি মুক্তিযুদ্ধকালীন ৭নং সেক্টরের প্রথম সেক্টর কমান্ডার চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ চত্বরে বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের মাজারের পাশেই চীরনিদ্রায় শায়ীত শহীদ মেজর নাজমুল হককে। তাঁর মৃত্যু দিবসে নেয়া হয়না কর্মসূচি, সমাধিতে পড়ে না পুষ্পস্তবক। সহযোদ্ধাদের দাবি, তাঁকে দেয়া হোক স্বীকৃতি ও মর্যাদা, ইতিহাসে উঠে আসুক তার অবদানের কথা।

স্বাধীনতার ৪৭ বছর পার হলেও রাষ্ট্রীয় কোনো সহযোগিতা পায়নি তাঁর পরিবার। কেউই খবর রাখেনা পরিবারের। ১৯৩৮ সনের ১ আগস্ট চট্টগ্রামের লোহাগড়ার আমিরাবাদ গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন নাজমুল হক টুলু।

তৎকালিন জেলা লোয়ার ম্যাজিস্ট্রেট বাবা হাফেজ আহমেদ ও মা জয়নব বেগমের সন্তান নাজমুল হক কুমিল্লার ইশ্বর স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করে ঢাকা জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হন। ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যায়নের সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। তৎকালিন পশ্চিম পাকিস্তানের কাকুল একাডেমি থেকে ১৯৬২ সনের ১৪ অক্টোবর কৃতিত্বের সাথে কমিশন লাভ করে এবং ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধে অংশ নেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সামরিক কর্মকর্তা নাজমুল হককে অবাঙ্গালি কর্মকর্তারা সহ্য করতে না পারার অংশ হিসেবে তাকে সেনাবাহিনী থেকে রাইফেলস্ বাহিনীতে (সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনী) বদলি করে পূর্ব পাকিস্তানের নওগাঁ উইং ৭-এ অধিনায়ক করে পাঠানো হয়। তিনি নওগাঁ গিয়ে অধিনায়কের দায়িত্ব বুঝে নিতে চাইলে অবাঙ্গালি অধিনায়ক মেজর আকরাম বেগ তাকে দায়িত্ব দিতে অস্বীকার করেন।

মেজর নাজমুল হক নওগাঁর স্বাধীনতাকামী সংগঠকদের ব্যাপারটি অবগত করলে পরিস্থিতি পাল্টে যেতে থাকে। নওগাঁ উইং-এর বাঙালি কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেন তিনি। ২৫ মার্চ গণহত্যা তাকে বিদ্রোহী করে তুলে। তিনি উইং এর বাঙ্গালী সহ-অধিনায়ক ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিন আহম্মেদ চৌধূরী ও বাঙ্গালী জোয়ানদের সঙ্গে নিয়ে বিদ্রোহ করে নওগাঁ ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস উইং-এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উড়ান স্বাধীন বাংলার পতাকা।

মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ আলী হোসেন মিলন জানান,মেজর নাজমুল হক রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, বগুড়া, পাবনা ও আসপাশের অঞ্চলের সাথে যোগাযোগ রেখে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পরিকল্পনা নেন। বগুড়ায় পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে আক্রমণে নেতৃত্ব দেন তিনি।

পরিকল্পনা অনুযায়ী সহকর্মী ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিন আহম্মেদ চৌধূরীকে রাজশাহীতে অ্যাডভান্স করিয়ে তিনি বগুড়ায় অ্যাডভান্স করেন। বগুড়ায় স্বাধীনতাকামী প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সাথে যোগাযোগ করে ফিরে রাজশাহীর দিকে এ্যাডভান্সের পরিকল্পনা নেন তিনি। এরপর রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর,পাবনা ও আশপাশের অঞ্চল স্বাধীনতাকামী প্রতিরোধ যোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে আনেন।

রাজশাহী ক্যান্টনমেন্টে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে পাকিস্তানি সেনারা। এই ক্যান্টনমেন্ট পতনের মুহূর্তে ঢাকা থেকে আসা পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণে সমগ্র উত্তারাঞ্চল ধ্বংসলীলায় পরিণত হয়। মেজর নাজমুল হক প্রতিরোধ যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। অস্ত্র সংকটের সুযোগে আক্রমণকারী পাকিস্তানি সেনারা উওরাঞ্চল দখল করে নিলে তিনি সীমান্ত অঞ্চলে গড়ে তোলেন প্রতিরোধ।

সঙ্গীদের নিয়ে সীমান্ত পার হন। মুক্তিবাহিনী গঠন প্রক্রিয়ায় গুর“ত্বর্পূণ ভূমিকা রাখেন। রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও দিনাজপুরের কিছু আংশ নিয়ে গঠন করা হয় ৭ নং সেক্টর। তাকে এই সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার করা হয় বলে জানা যায়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ,রহনপুর,ভোলাহাট অঞ্চলে অপারেশনে নেতৃত্ব দেন তিনি। ২৭ সেপ্টেম্বর মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত যৌথবাহিনীর একটি বৈঠক শেষে ভারতের তৎকালীন পশ্চিম দিনাজপুরের শিলিগুড়ি বাগডোগরা ক্যান্টনমেন্ট থেকে প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে গাড়িতে ফেরার সময় ইসলামপুরে গাছের সাথে গাড়ি ধাক্কা লেগে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন এই বীর যোদ্ধা। তাঁর মরদেহ নিয়ে আসা হয় শিবগঞ্জের ঐতিহাসিক সোনামসজিদ চত্বরে। এখানেই তাকে দাফন করা হয়।

সাহসী, রণকৌশলী, সদালাপি মেজর নাজমুল হক সাদাসিদে জীবন যাপন করতেন। প্রতিনিয়ত খোঁজ-খবর নিতেন মুক্তিযোদ্ধাদের। দিতেন উৎসাহ অনুপ্রেরণা।

মেজর নাজমুল হকের মৃত্যুর পর ৭ নং সেক্টরের দায়িত্ব নেন সুবেদার মেজর এম.এ রব। পরে লেফটেনেন্ট কর্নেল কাজী নুরুজ্জামান। মেজর নাজমুল হক মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও তাঁকে দেওয়া হয়নি রাষ্ট্রীয় কোনো সম্মাননা পদক। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক ইতিহাস লেখা হলেও সেখানে তাঁর অবদানের কথা নাই বললেই চলে। তাঁর মৃত্যু দিবসেও নেয়া হয়না কোন কর্মসূচি। সমাধিতে কেউ আসেনা পুস্পস্তবক অর্পণ করতে। মুক্তিযোদ্ধাদের দাবি, মেজর নাজমুল হককে দেয়া হোক যথাযোগ্য স্বীকৃতি ও মর্যাদা। ইতিহাসে তুলে ধরা হোক তার অবদানের কথা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা