kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জানুয়ারি ২০২০। ১৪ মাঘ ১৪২৬। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

পিয়ন ইয়াছিনের বিরুদ্ধে পৌনে ছয় কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

বিশ্বজিৎ পাল বাবু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া   

৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ২১:৫৩ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



পিয়ন ইয়াছিনের বিরুদ্ধে পৌনে ছয় কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কর্মরত পিয়ন (অফিস সহায়ক) মো. ইয়াছিনের বিরুদ্ধে পৌনে ছয় কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্ত করে এ বিষয়ে তার বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। অভিযোগটি দুদকে পাঠানো হবে বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে চাপের মুখে ও কৌশলে পড়ে থানায় আত্মসমর্পণ করেছেন ইয়াছিন। শুক্রবার ভোর রাতে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানায় আত্মসমর্পণ করেন। ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে শুক্রবার দুপুরে পুলিশ তাকে আদালতে পাঠিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার বিকেলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বিভাগীয় পরিদর্শক নৃপেন্দ্র নাথ শিকদার সদর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। বিভিন্ন মাধ্যমে পাওয়া টাকা ব্যাঙ্কে জমা না করে ভুয়া সিল, স্বাক্ষর দিয়ে ইয়াছিন প্রায় পাঁচ কোটি ৭৭ লাখ টাকা টাকা আত্মসাত করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

আরেকটি সূত্র জানায়, ইতিমধ্যেই তিনি কিছু টাকা ফিরিয়ে দেয়ার ব্যাপারেও আশ্বস্ত করেছেন। তবে সংশ্লিষ্ট কেউ বিষয়টি নিয়ে এখনই মুখ খুলতে চাইছেন না। কোন নিয়মে তার কাছ থেকে টাকা ফেরত নেয়া যায় সে বিষয়ে ভেবে দেখছেন তাঁরা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলা সাব রেজিস্ট্রার মো. মোস্তাফিজুর রহমান শুক্রবার বিকেলে জানান, পুলিশ শুক্রবার ভোরে ইয়াছিনকে আটক করেছে বলে জানতে পেরেছেন। এ বিষয়ে এখন পুলিশই যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নিবেন বলে তিনি জানান।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. সেলিম উদ্দিন জানান, অভিযোগের প্রেক্ষিতে আপাতত ইয়াছিনকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। ইয়াছিন নিজেই পুলিশের কাছে এসে ধরা দেন বলে তিনি স্বীকার করেছেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আলমগীর হোসেন জানান, ইয়াছিনের বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ আত্মসাতের একটি অভিযোগ থানায় জমা দেয়া হয়েছে। তবে এ ধরনের অভিযোগ খতিয়ে দেখা দুর্নীতি দমন কমিশনের এখতিয়ার। বিষয়টি তাঁরাই তদন্ত করবে।

পিয়ন মো. ইয়াছিন মিয়ার পোস্টিং ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে। তবে দিনের পর দিন ডেপুটেশনে কর্মরত আছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে। ইয়াছিন মিয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার মরিচাকান্দি ইউপির আতুয়াকান্দি গ্রামের মোহন মিয়ার ছেলে। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে বসবাস করছেন।

ইয়াছিন মিয়া এখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। অনিয়ম-দুর্নীতি ধরা পড়ার পর থেকে এক সপ্তাহ ধরে তিনি লাপাত্তা ছিলেন। এ ঘটনায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানায় সাধারন ডায়রি (জিডি) হয়েছে। তাকে খোঁজছে পুলিশ। কি পরিমাণ টাকার দুর্নীতি করেছে সে বিষয়টির খোঁজ নিতে শুরু করেন সংশ্লিষ্টরা।

পিয়ন ইয়াছিনের বর্তমান বেতন ২৮ হাজার ৭৭৫ টাকা। এই টাকা বেতনে তিনি কিভাবে কয়েক কোটি টাকার এসব সম্পদের মালিক হলেন সেটি নিয়ে এখন আলোচনা হচ্ছে মানুষের মুখে মুখে। একাধিক বিয়ে নিয়েও আছে মুখরোচক আলোচনা।

সরেজমিনে ঘুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার পাইকপাড়ায় দুইটি ও ভাদুঘরে একটি বাড়ির সন্ধান পাওয়া গেছে। এছাড়া ফুলবাড়িয়ায় তৃষা লজ নামে এপার্টমেন্টে তার রয়েছে একটি ফ্ল্যাট। পাইকপাড়ার বাড়ি ও ফুলবাড়িয়া ফ্ল্যাটে তিনি যথাক্রমে দ্বিতীয় স্ত্রী আকলিমা বেগম ও তৃতীয় স্ত্রী মুকসুরা বেগমকে নিয়ে থাকতেন। ভাদুঘরে থাকতেন প্রথম স্ত্রী সাজেদা বেগমকে নিয়ে। মুকসুরাকে নিয়ে ইয়াছিন পালিয়ে যান বলে আলোচনা আছে। বাড়িতে গেলে আকলিমা নেই বলে জানিয়ে দেয়া হয়। তবে এসব নিয়ে কথা বলেছেন সাজেদা বেগম।

সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের (নিরীক্ষন) অডিট চলার সময় কোটি টাকার ঘাপলা রেবিয়ে আসার পর আলোচনায় আসে পিয়ন (অফিস সহায়ক) ইয়াছিন মিয়ার নাম। চালান জমা দেয়ার নামে অন্তত কোটি টাকার ঘাপলার অভিযোগ পাওয়া যায় ওই অফিসে। গত ২৭ নভেম্বর সরকারি বিভিন্ন ফি’র চালান ঠিক আছে কি-না সেটি যাচাই শুরু হয়। এক পর্যায়ে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য সাব রেজিস্ট্রারকে ব্যাঙ্কে গিয়ে খোঁজ নিতে বলেন অডিট কর্মকর্তা মিথেন্দ্র নাথ শিকদার। পরদিন ইয়াছিনকে সঙ্গে নিয়ে সাব রেজিস্ট্রার মোস্তাফিজুর রহমান সোনালী ব্যাঙ্কে শাখায় যান। সেখানে গিয়ে কয়েকটি চালান মিলিয়ে দেখেন এগুলোর টাকা জমা হয় নি। ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দেন সিল, স্বাক্ষর জাল করে এসব টাকা জমা দেখানো হয়েছে। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে অডিট অফিসারকে জানানো হয়। এরই মধ্যে ইয়াছিন পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় ২৯ নভেম্বর সদর থানায় জিডি করা হয়। এরপর থেকেই তাঁর পিছু নেয় পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তা। তাঁর পরিবারের লোকজনকে চাপে রেখে ইয়াছিনকে বাগে আনার চেষ্টা করা হয়। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের কৌশলের কারণেই ইয়াছিন আত্মসমর্পণে রাজি হয়। শুক্রবার ভোরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাসহ কয়েকজন ইয়াছিনকে থানায় নিয়ে যায়।

বুধবার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পশ্চিম পাইকপাড়ার লজেন্স ফ্যাক্টরি এলাকায় পাশাপাশি দুইটি ছয়তলা ভবনের মালিক মো. ইয়াছিন মিয়া। এর একটি তার ভায়রা মো. সুমন মিয়ার সঙ্গে যৌথ মালিকানায় করেছেন। নিজের মালিকানার বাড়িতে দ্বিতীয় তলার পুরোটাতে দ্বিতীয় স্ত্রী আকলিমাকে নিয়ে থাকতে তিনি। ফুলবাড়িয়া এলাকায় তৃষা লজ এর ছয়তলার দক্ষিণ-পশ্চিমের ফ্ল্যাটটি সম্প্রতি কিনেছেন ইয়াছিন। এখানে তিনি তৃতীয় স্ত্রী মুকসুরাকে নিয়ে থাকতেন। পাইকপাড়ার বাড়িতে লোকজন থাকলেও কেউ কথা বলতে চায় নি। তৃষা লজের অন্যান্য বাসিন্দারা জানিয়েছেন নিজ অফিসের কেলেংকারিতে জড়িয়ে পড়ার খবর জানাজানি হওয়ার পর তৃতীয় স্ত্রীকে তিনি এখানে থাকেন না।

পারিবারিক সূত্র ও এলাকার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় ২৫ বছর আগে ইয়াছিন মিয়া প্রথম বিয়ে করেন সাজেদা বেগমকে। পৌর এলাকার ভাদুঘরে চার শতাংশ জায়গার ওপর তিনতলা বাড়ি করে সেখানেই তিনি বসবাস শুরু করেন। প্রায় বছর দশেক পর আকলিমা নামে এক বিধবাকে বিয়ে করেন ইয়াছিন। এর বছর পাঁচেক পর তিনি ভাদুঘর এলাকার প্রবাসী কামাল মিয়ার স্ত্রী মুকসুরার সঙ্গে তিনি পরকীয়ায় জড়ান। এক পর্যায়ে তাকেও বিয়ে করেন।

কথা হয় ফুলবাড়িয়ার তৃষা লজের বাসিন্দা মো. মহিউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে। সরাইল উপজেলার শাহবাজপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক এ শিক্ষক জানান, নিজ অফিসের বিষয়গুলো জানাজানি হওয়ার পর থেকেই ইয়াছিন এখানে থাকেন না। তার ফ্ল্যাটটিতে এখন তালা ঝুলছে।

ভাদুঘরের বাসিন্দা বৃদ্ধ মো. নুরুল ইসলাম বলেন, ‘সে খুবই খারাপ প্রকৃতির লোক ছিলো। আমাদের এলাকার প্রবাসীর স্ত্রীকে ফুঁসলিয়ে বিয়ে করেছে। ওই নারীর স্বামীর পাঠানো টাকাও সে নিয়ে গেছে। তার কারণে আমাদের এলাকারও বদনাম হয়েছে।’

আব্দুল কাদির নামে এক ব্যক্তি জানান, ইয়াছিন সবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতো। মানুষের সঙ্গে খুব মিশতো। কিন্তু তার এ ধরণের অপকর্মের কথা শুনে সবাই এখন হতবাক। নাজিম মোল্লা জানান, তার বিরুদ্ধে অবৈধভাবে টাকা কামানোর বিষয়টি শুনেছেন।

মোবাইল ফোনে কথা হলে ইয়াছিনের ভায়রা মো. সুমন বলেন, ‘পাইকপাড়ায় আমি কিংবা ইয়াছিন ভাইয়ের কোনো বাড়ি নেই। আমার জেঠস মোছেনা আপার বাসায় আমরা ভাড়া থাকি। পাশের বাড়িটিও আরেক জেঠসের। এ সংক্রান্ত কাগজপত্র আমাদের কাছে আছে।’

ভাদুঘরের বাড়ি থেকে বেরুনোর সময় কথা হয় ইয়াছিনের প্রথম স্ত্রী সাজেদা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার বাবার বাড়ি থেকে আনা ও স্বামীর টাকা দিয়ে ভাদুঘরের বাড়িটি করেছি। আমার স্বামী আরো একাধিক বাড়ি করেছে বলে শুনেছি। তার একাধিক বিয়ের বিষয়টি নিয়ে কথা বললে আমাকে অত্যাচার করা হতো। বেশ কিছুদিন যাবত আমার সঙ্গে যোগাযোগও রক্ষা করে না।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা