kalerkantho

বুধবার । ২৯ জানুয়ারি ২০২০। ১৫ মাঘ ১৪২৬। ৩ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

পরিচয়পত্র জালিয়াত মুক্তিযোদ্ধা!

বিশ্বজিৎ পাল বাবু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও গৌরাঙ্গ দেবনাথ অপু, নবীনগর   

৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ২০:১৬ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পরিচয়পত্র জালিয়াত মুক্তিযোদ্ধা!

ছবি প্রতীকী

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলা জাতীয় পার্টির সদস্য সচিব মো. মোসলেম উদ্দিন মৃধার মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ভাতা তোলা নিয়ে সমালোচনা ছিল দীর্ঘদিন ধরেই। তাঁর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়েরের পর বিষয়টি এখন নবীনগরের টক অব দ্যা টাউনে পরিণত হয়েছে।

কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে দুই নামে তাঁর বানানো দুটি জাতীয় পরিচয়পত্রের (ন্যাশনাল আইডি কার্ড) বিষয়। এর একটিতে, যেটি আগে বানানো সেটিতে নাম লেখা তাজুল ইসলাম মৃধা। অন্যটিতে মোছলেম উদ্দিন মৃধা। ওই দুটিতেই বাবা-মায়ের নাম একই। তবে বয়স ভিন্ন। এস.এস.সি’র সার্টিফিকেটে বয়স উল্লেখ আছে ভিন্ন। মোছলেম উদ্দিন নামে আইডি কার্ডে অষ্টম শ্রেণি পাস ও তাজুল ইসলাম নামে আইডি কার্ডে এইচ.এস.সি পাস লেখা।

মূলত বয়স বাড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার জন্যই তিনি এমন কাজ করেছেন বলে ধারণা করছেন মুক্তিযোদ্ধাসহ সংশ্লিষ্টরা। একটি পরিচয়পত্র অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধের সময় ওই ব্যক্তির বয়স ছিল সাত বছর; আরেকটি অনুযায়ী ১৩ বছর। এ বিষয়ে তদন্ত করতে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা উত্তোলন সংশ্লিষ্ট সমাজ সেবা কার্যালয় আগামীকাল রবিবার মোছলেম উদ্দিনকে ডেকে পাঠাবেন বলে জানা গেছে।

প্রতিকার চেয়ে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান পৌর এলাকার নারায়ণপুরের বাসিন্দা মুকসুদ আলী খান বৃহস্পতিবার উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তার কাছে দায়ের করা অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, আট বছর ধরে মুক্তিযোদ্ধার ভাতা উত্তোলনকারী মোছলেম উদ্দিন নিজের নাম, ঠিকানা, বয়স জালিয়াতি করেছেন। তাঁর প্রকৃত নাম তাজুল ইসলাম মৃধা। অভিযোগের সঙ্গে কিছু কাগজপত্রও জুড়িয়ে দেয়া হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় ও একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে নবীনগরের সর্বত্র পরিচিত মোসলেম উদ্দিন মৃধা। ছবিযুক্ত একটি আইডিতে তাঁর নাম লেখা আছে তাজুল ইসলাম মৃধা। উচ্চ মাধ্যমিক পাস। এনআইডি নম্বর ১৯৬৩১২২৮৫০৭৮০৬৮৮২। জন্ম তারিখ ২৮ অক্টোবর ১৯৬৩। সেই অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর বয়স ছিল আট বছর।

তাঁরই ছবিযুক্ত অন্য একটি জাতীয় পরিচয়পত্রে (নম্বর ৬৮৭৯৩৭৬২৯৮) নাম লেখা রয়েছে মোসলেম উদ্দিন মৃধা। অষ্টম শ্রেণি পাস। জন্ম তারিখ ২৫ মার্চ, ১৯৫৮। তবে দুটি জাতীয় পরিচয়পত্রেই তাঁর বাবার নাম তঞ্জুবালী মৃধা ও মায়ের নাম রাবেয়া খাতুন লেখা রয়েছে।

এদিকে তাজুল ইসলাম মৃধা নামে এস.এস.সি’র সার্টিফিকেটেও জাতীয় পরিচয়পত্র থেকে বয়স ভিন্ন দেখা গেছে। সেখানে জন্ম তারিখ দেয়া আছে ১৯৬৫ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। তবে এইচ.এস.সি’র সার্টিফিকেটটি সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বেসামরিক গেজেটে তাঁর মুক্তিযোদ্ধা সনদ নম্বর ১১৬০০৮ ও মুক্তিযোদ্ধা গেজেট নম্বর ৩৯৯১ লেখা রয়েছে। মোছলেম উদ্দিন মৃধা নামে জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে যেখানে জন্মসন ১৯৫৮ লেখা আছে সেটি দিয়েই তিনি মূলত মুক্তিযোদ্ধা হয়েছেন।

উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার শামসুল আলম সরকার এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘সর্বশেষ নীতিমালা অনুযায়ী ১২ বছরের নীচে কেউ মুক্তিযোদ্ধা হতে পারবেন না। কিন্তু মোসলেম উদ্দিন মৃধা সাত বছর বয়সে কিভাবে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেয়ে নিয়মিত মুক্তিযোদ্ধা ভাতা নিচ্ছেন, সেটি বুঝতে পারছিনা। অবশ্যই এর সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া দরকার।’

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা আজহারুল ইসলাম লালু বলেন, ‘আমার জানামতে, এমন বহু অমুক্তিযোদ্ধা নিজেদেরকে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত মুক্তিযোদ্ধা ভাতা নিচ্ছেন। মূলত সমাজ কল্যাণ অফিসে চাকরি করা একজন ব্যক্তি নিয়মিত মুক্তিযোদ্ধা অফিসে বসে নানান অনিয়ম দুর্নীতির মাধ্যমে এসব অপকর্ম করে যাচ্ছেন। আমার জানামতে অভিযুক্ত ব্যক্তির বয়স মুক্তিযোদ্ধের সময় অনেক কম ছিল।’

নবীনগর থেকে সম্প্রতি বদলি হওয়া উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম একই ব্যক্তির ছবিযুক্ত দুটি জাতীয় পরিচয়পত্র থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘একই ব্যক্তি দুই নাম ব্যবহার করে দুইবার ভোটার হয়েছেন, যা আইনবিরোধী।

উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা মো. পারভেজ আহমেদ বলেন, ‘এ সংক্রান্ত অভিযোগটি হাতে পেয়েছি। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। তদন্তের জন্য ওই ব্যক্তিকে রবিবার অফিসে ডেকে আনা হবে।’

নবীনগর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের আহবায়ক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ মাসুম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গেই সমাজ সেবা কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছি। তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

মোসলেম উদ্দিন মৃধা তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে সম্পূর্ণ ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘আমার নাম মোসলেম উদ্দিন মৃধা, তাজুল ইসলাম মৃধা নয়। একটি জাতীয় পরিচয়পত্রে আমার নাম তাজুল ইসলাম মৃধা হওয়ায় এফিডেভিটের মাধ্যমে সংশোধন করেছি। আমার জন্ম তারিখ ২৫ মার্চ ১৯৫৮। তবে আমি এসএসসি পাস করিনি। যিনি আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন, তার সাথে আমার জমিজমা নিয়ে মামলা আছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা