kalerkantho

বুধবার । ২৯ জানুয়ারি ২০২০। ১৫ মাঘ ১৪২৬। ৩ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

শেখ রাসেলের বিরল ভক্ত মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া

কবরের পাশে বঙ্গবন্ধু ও শেখ রাসেলের ছবি বাঁধিয়ে রাখার অসিয়ত!

শামস শামীম, সুনামগঞ্জ   

৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ১৯:০৭ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কবরের পাশে বঙ্গবন্ধু ও শেখ রাসেলের ছবি বাঁধিয়ে রাখার অসিয়ত!

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার সন্তান শেখ রাসেলের ছবি কবরের পাশে বাঁধাই করে রাখার জন্য নিজ সন্তানদের অসিয়ত করেছেন এক অসহায় দরিদ্র মুক্তিযোদ্ধা। আব্দুস শহিদ মিয়া নামের ওই দরিদ্র মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে সব সময় শেখ রাসেলের বাধাই করা ছবি থাকে। একটা প্লাস্টিকের ব্যাগে সেই লেমিনেট করা ছবি বুকের মধ্যে লেপ্টে রাখেন তিনি।

শুক্রবার বিকেলে শহিদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরিতে সুনামগঞ্জ মুক্ত দিবস উপলক্ষে ৪ নং সেক্টরের এই যোদ্ধার যুদ্ধদিনের অম্লান স্মৃতি রোমন্থন ও সম্মাননা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সুনামগঞ্জ প্রেসক্লাব। সেই অনুষ্ঠানে হঠাৎ শেখ রাসেলের বাঁধাই করা ছবি বুকে জড়িয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন তিনি। তার চোখ বেয়ে গলগল করে জল ঝরছিল। উপস্থিত সাংবাদিকরা সেই দৃশ্য দেখে নিজেরাও আবেগাপ্লুত হয়ে ওঠেন।

তিনি জানান, তার মৃত্যুর পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ রাসেলের ছবি যাতে কবরের পাশে বাধিয়ে রাখা হয় সেজন্য ছেলেদের নির্দেশ দিয়ে গেছেন তিনি। আজ সাংবাদিকদের সামনে সেই কথা আবার শুনালেন তিনি। যাতে ছেলেরা সেই দায়িত্ব পালন করেন।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার উত্তর সুরমার কোণাগাও গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস শহিদ মিয়া ৬ষষ্ঠ ব্যাচের মুক্তিযোদ্ধা। লোহারবন ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নিয়ে মেজর সিআর দত্তের অধীন ৪ নং সেক্টরের অধীনে জুড়ি এলাকায় যুদ্ধ করেন। একাধিক সম্মুখযুদ্ধে দুঃসাহসী অভিযান পরিচালনা করেন তিনি। জুড়িতে একটি যুদ্ধে ৪৫ জন শহিদ হন। অল্পের জন্য রক্ষা পান শহিদ মিয়া। তবে তিনি কিছুটা আহত হন। শহিদদের লাশ বস্তায় ভরে নিয়ে যেতেন তিনি। নিয়ে দাফন করতেন। এভাবে একাধিক সম্মুখযুদ্ধে লড়াই করেন তিনি।

সুনামগঞ্জ মুক্ত দিবসে প্রেসক্লাব আয়োজিত স্মৃতি রোমন্থন ও সম্মাননা অনুষ্ঠানে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস শহিদ মিয়া জানান, পারিবারিকভাবে তিনি আওয়ামী পরিবারের সন্তান। ছোট বেলা থেকেই বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগের তৃণমূল কর্মী তিনি। সত্তরের নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে উত্তর সুরমায় প্রচারণা চালিয়েছেন। ৭ মার্চের ভাষণ শুনে যার যা আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকার বঙ্গবন্ধুর ঘোষণার পরই তিনি সুনামগঞ্জ শহরে এসে দেওয়ান ওবায়দুর রেজা চৌধুরী ও হোসেন বখতের কাছে পরামর্শ চান। তারা তাকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেন। একসময় বাড়ি ছেড়ে তিনি সীমান্ত পাড়ি দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ৬ নম্বর ব্যাচের সঙ্গে ট্রেনিং ক্যাম্পে যান। লোহারবন্দ ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নেন। সেখান থেকে ৪ নং সেক্টরের মৌলভীবাজারের জুড়িতে তাকে পাঠানো হয়। প্যারেড ভালো জানায় তিনি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ট্রেনিংও করান। কম্পানী কমান্ডার হুমায়ূন কবির এ কারণে তাকে অনেক স্নেহ করতেন। আব্দুস শহিদ মিয়া বলেন, বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর টাউনে আইছি। দেওয়ান সাব-হোসেন বখত সাবের কাছে গেছি। তারা বলেন, ‘তরা শরণার্থী সেন্টারে যাগিয়া’।

মুক্তিযুদ্ধ শেষে জুড়ি থেকে তিনি সুনামগঞ্জে চলে আসেন। পরে বাড়িতে গিয়ে দেখেন পাকিস্তানীদের বোমা হামলায় তার ভাই মারা গেছেন। ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। খুপড়ি ঘর করে কোনোমতে মা বাবাকে নিয়ে থাকতেন। পরে বিয়ে করেন। দোকান কর্মচারী ও দিনমজুরি করে সংসার চালান। মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পান ২০০৫ সালে। এর আগে ১৩ বছর রিক্সা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেছেন।

যুদ্ধপরবর্তী বাড়ি ফেরার প্রসঙ্গে বলেন, ‘বাড়িত গিয়া শুনি ভাই বোমায় মারা গেছে। ঘরদরোজা কুনুস্তা নাই।’

যুদ্ধদিনের স্মৃতি রোমন্থনের সময় হঠাৎ তিনি একটি প্লাস্টিকের ব্যগ থেকে কতগুলো লেমিনেটেড ছবি বের করেন। শেখ রাসেলের ছবি বুকে নিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন। বলেন, ‘এই নিষ্পাপ ছেলের ছবি আমি বুহো রাহি, বুহো...। আমি আমার বাচ্চাদের কইছি বঙ্গবন্ধু আর রাসেলের ফটোখান আমার কবরের পাশে বাধাই কইরা দিতে। আমি আর গভরমেন্টের কাছে কুনুস্তা চাইনা। আমার ধনসম্পদ চাইনা।’

তিনি জানান, তার বাড়িতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিভিন্ন ছবি, শেখ হাসিনার ছবি এবং শেখ রাসেলের ছবি বাধাই করা আছে। এর মধ্যে শেখ রাসেলের ছবিটা বুকে নিয়ে ঘুরেন তিনি। আব্দুশ শহিদ মিয়া বলেন, আমি এই দেশে জঙ্গিবাদ চাইনা। ঝগড়া ফ্যাসাদ চাইনা।

আব্দুস শহিদ মিয়ার চার ছেলে ও ৩ মেয়ে। কষ্ট করে ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া করিয়েছেন। তারা এখন ছোট চাকুরি করছে। স্ত্রী সন্তান নিয়ে বাড়িতেই থাকেন।

মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস শহিদ মিয়ার যুদ্ধদিনের স্মৃতিরোমন্থণ অনুষ্ঠান তাঁর চোখের জলে বিষাদময় হয়ে ওঠে। পরে সুনামগঞ্জ প্রেসক্লাব নেতৃবৃন্দ তাকে উত্তরীয় ও সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করেন। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য অসহায় ও দরিদ্র হিসেবে তাকে খুঁজে সম্মাননা জানানোর জন্য তিনি সুনামগঞ্জ প্রেসক্লাব নেতৃবৃন্দের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।

স্মৃতি রোমন্থণ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সুনামগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান এমদাদ রেজা চৌধুরী, সাবেক সভাপতি লতিফুর রহমান রাজু, বর্তমান সভাপতি পঙ্কজ দে, সহ সভাপতি শামস শামীম, সাধারণ সম্পাদক একেএম মহিম, কার্যনির্বাহী সদস্য এমরানুল হক চৌধুরী প্রমুখ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা