kalerkantho

রবিবার । ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১০ রবিউস সানি ১৪৪১     

মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেলেন রাণীনগরের ১০ বীরাঙ্গনা

শাহরুখ হোসেন আহাদ, রাণীনগর (নওগাঁ)   

৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ ১৯:২৯ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেলেন রাণীনগরের ১০ বীরাঙ্গনা

মহান স্বাধীনতার ৪৮ বছর পর নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার মিরাট ইউনিয়নের আতাইকুলা পালপাড়া গ্রামের ১০ বীরাঙ্গনা মহিলা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও আর্থিক সুযোগ-সুবিধার গেজেট প্রকাশ হওয়ায় জীবনের শেষ মূহুর্তে তাদের মুখে এখন হাসির ঝিলিক।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে নিজেদের স্বজন, পাড়া প্রতিবেশিদের জীবন, সম্ভ্রম ও সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে এ দেশীয় রাজাকার আলবদরদের সহযোগিতায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দিনভর পৈশাচিক নির্যাতন, খুন, লুটপাট, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগসহ নানা রকমের নির্যাতন চালিয়ে ৫২ জন মুক্তিকামী ব্যক্তিকে প্রকাশ্য দিবালোকে একঘরের বারান্দায় সারিবদ্ধ করে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করে।

১৯৭১ সালে দেশ ও মার্তৃকার টানে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আতাইকুলা পালপাড়া গ্রামের নারীরা বীরত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও নানান কারণে রাষ্ট্রীয় সম্মান মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি তাদের ভাগ্যে জোটেনি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার ক্ষমতায় আসার পর নানা চরাই-উতরায় পার হয়ে অবশেষে গত ২৯ জুলাই আতাইকুলা পালপাড়া গ্রামের প্রয়াত বাণী রানী পাল, ক্ষান্ত রাণী, রেনু বালা, সুসমা বালা মারা গেলেও এখনও বেঁচে আছেন মায়া সূত্রধর, রাশমনি পাল, কালিদাসী পাল, সন্ধ্যা রাণী পাল, গীতা রাণী পাল, ও সুষমা পাল। এই ১০ বীরাঙ্গনা মহিলা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেলেন।

একাত্তরের সেই দুর্বিসহ যন্ত্রণা, সামাজিক বঞ্চনার পাশাপাশি অনেকটা দুঃখ-দুর্দশার অভাব অনাটন, আর অসুস্থতার মধ্যেই চলছে তাদের জীবন সংগ্রাম। মহিলা মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি পেয়ে তাদের মুখে এখন হাসির ঝিলিক। সারা দেশে বেশ কিছু বীরাঙ্গনা নারীকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিলে সেই তালিকায় উত্তর জনপদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক প্রয়াত আব্দুল জলিলের জন্মভূমি জেলা নওগাঁর রাণীনগরে ১০ বীরাঙ্গনার নাম তালিকাভূক্ত হওয়ায় পরিবার ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা খুশি।

রাণীনগর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে নওগাঁর ছোট যমুনা নদীর তীরে সবুজ গাছপালার ছায়া ঘেরা শান্ত আতাইকুলা পালপাড়া গ্রাম। ১৯৭১ সালের ২৫ এপ্রিল পাক হানদার বাহিনীর স্থানীয় দোসর রাজাকার আলবদরদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় প্রকাশ্যে দিবালোকে ওই দিন সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত অপকর্ম চালায়। এ সময় গণহত্যা, নারী নির্যাতন, অগ্নীসংযোগ, লুটপাটসহ জঘন্যতম ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে সংখ্যালঘু পরিবারের কিশোর, যুবক, মাঝ বয়সী ও বিভিন্ন বয়সী নারীদেরকে ধরে আতাইকুলা গ্রামের যোগেন্দ্রনাথ পালের বাড়ির বারান্দায় জড়ো করে 'জয়বাংলা বলতে হ্যায় নৌকামে ভোট দিতে হ্যায়' এভাবে পাক সেনারা ব্রাশ ফায়ার করে গোবিন্দ চরণ পাল, সুরেশ্বর পাল, বিক্ষয় সূত্রধর, নিবারণ পালসহ ৫২ জন মুক্তিকামীকে নির্বিচারে হত্যা করে।

এ সময় পাক হানদার বাহিনী গণহত্যা, লুটপাট ও নারী নির্যাতন বিশেষ করে নারীরা স্বামী-সন্তানদের প্রাণে বাঁচাতে শেষ আকুতি করেও পাক-জান্তাদের মন গলাতে পারেননি। উল্টো তারা সুযোগ বুঝে নারীদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালিয়ে নওগাঁ জেলা সদরে পাকিস্তানি সেনাদের স্থাপিত ক্যাম্পের উদ্দেশে চলে যায়। নির্যাতিতা নারী ও স্বজনদের হৃদয়বিদারক আর্তনাদ ও কান্নায় আকাশ ভারী হয়ে ওঠে। সেই সময়ের ১০ বীরাঙ্গনা আজ মহিলা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেলেন। দ্রুত তাদের পাওনা আর্থিক সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হবে বলে জানা গেছে।

শহীদ পরিবারের সদস্য গৌতম পাল জানান, আমাদের আতাইকুলা পালপাড়া গ্রামের ১০ বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতিসহ বধ্যভূমি সংরক্ষণ, স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ, শহীদ-হিসাবে নিহতদের নাম গেজেটে অন্তর্ভূক্তিসহ পরিবারের সদস্যদের আর্থিক সাহায্য প্রদান, শহীদ পরিবার হিসাবে স্বীকৃতি দান। এমন খবর পেয়ে আমরা শহীদ পরিবারের সদস্যরা অনেক খুশি।

উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সাবেক কমান্ডার ইসমাইল হোসেন জানান, ১০ বীরাঙ্গনাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি ও বধ্যভূমি সংরক্ষণের অনুমোদন গত ২৯ জুলাই হয়েছে। তাদের রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা প্রদানের ও নির্দেশনা আমরা পেয়েছি। অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের এই আর্থিক সুযোগ-সুবিধা হাতে তুলে দেওয়া হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা