kalerkantho

রবিবার । ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১০ রবিউস সানি ১৪৪১     

ভিক্ষা নয়, গান গেয়েই সংসার চলে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী অছিমের

মাহাবুর রহমান, বিরামপুর (দিনাজপুর)   

২ ডিসেম্বর, ২০১৯ ২১:৫৬ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ভিক্ষা নয়, গান গেয়েই সংসার চলে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী অছিমের

দৃষ্টি প্রতিবন্ধী আছিম। সামনে যা পান তাই বাদ্যযন্ত্র হিসেবে বাজাতে চান। মানুষের দয়া নয়, কারো কাছে হাত পেতে নয়, আছিমের সংসার চলে গান গেয়ে। আছিম দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হলেও বাজাতে পারেন প্রায় ১০ প্রকারের বাদ্যযন্ত্র। দোতারার টুংটাং শব্দে গাইতে পারেন লালনগীতি, আধুনিক, কাওয়ালী, রবীন্দ্র সংগীতসহ বেশ কয়েক প্রকারের গান। এরই মধ্যে নিজের সাধনাকে কাজে লাগিয়ে রাজশাহী মান্দা থানা 'আমরা ক‘জন শিল্প গোষ্ঠী' নামের একটি সঙ্গীত স্কুল করেছেন। বাদ্যযন্ত্রের টুং টাং শব্দ আর গানকে সঙ্গী করে তার জীবনের পথ চলা।

অছিম। পুরো নাম অছিম উদ্দিন। পিতা নজিম উদ্দিম মায়ের নাম সখিনা বেগম। ১৯৬৮ সালে দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী জোতবানী গ্রামে জন্ম তার। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ২য়। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হবার কারণে পিতার অভাব-অনটনের সংসারে অনেকটা অনাদরেই বেড়ে ওঠেন তিনি। স্কুলে ভর্তি হওয়া তো দূরের কথা, স্কুলের বারান্দায় পা রাখার সামান্য মতো সুযোগ হয়নি তার।

দেশ যখন পশ্চিম পাকিস্থানের নিকট পরাধীন, দেশের একদল প্রতিবাদী মানুষ সাধারণ মানুষের মুখে দুবেলা মোটা চালের ভাত তুলে দিয়ে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার অধিকার আদায়ে স্বোচ্ছার ঠিক সেই সময়ে এক সহায়-সম্বলহীন পিতা-মাতার পরিবারে জন্ম তার। পিতা নজিম উদ্দীন ও মা সখিনা বেগমের সংসার আলোকিত করে আসা অছিম উদ্দিন সেই আলো বেশিদিন ধরে জ্বালাতে পারেনি। দেড় বছরের মাথায় পরিবারের সবাই জানতে পারেন আদরের সন্তান অছিমের দুই চোখে কোনো আলো নেই!

জীবন শুরু আছিমের

অছিমের বয়স তখন বারো ছুঁইছুঁই। অনাহার ও অনাদর যখন তাঁর নিত্যসঙ্গী ঠিক তখন রংপুরের কাউনিয়ার তিস্তা নদীর ভাঙনে ঘরহারা বাউল শিল্পী আব্দুল হান্নান জীবিকার তাগিতে চলে আসেন অছিমের গ্রামের পাশের করমজি গ্রামে। অছিমের জীবনে তিনি আসেন ঠিক দেবদূতের মতো। কিশোর অছিমকে ভালোবেসে তার হাতে তুলে দেন দোতারা আর বলেন, ‘অছিম, দোতারার চিকন তারে গান তুলতে পারলে তোমার জীবনে কখনোই ভাতের অভাব হবে না’। তখন থেকেই গানের প্রতি আগ্রহ বেড়ে যায়। শুরু হয় দোতারার চিকন তারে টুংটাং শব্দের খেলা ও গানের তালিম। বিরামপুরের উদয়ন সংগীত ক্লাবে সংগীত গুরু গোপাল চন্দ্র রায়ের নিকট বিনা বেতনে চার বছর ধরে গান শেখেন। তারপর থেকেই শুরু গুনগুন করে গান গাওয়া।

১৬ বছর বয়সে গ্রামের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার মাধ্যমে গানের শিল্পী হিসেবে পরিচিতি বেড়ে যায়। নিজের গ্রাম ছাড়িয়ে পাশের গ্রাম ও পরে বিভিন্ন শহরের অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার সুযোগ হয়। তার গানের মিষ্টি কণ্ঠে মুগ্ধ গ্রাম-গঞ্জের শ্রোতারা। গান শুনে বাহবা আর করতালির মাধ্যমে অছিমকে উৎসাহ দিতে কেউই কৃপণতা করেন না। পড়ন্ত বিকেলে ফসলের মাঠে বা আড্ডা দেয়ার মতো কোনো যায়গায় যখন তার সাথে এলাকার মানুষগুলোর দেখা হয় তখনই সবার অনুরোধে খালি গলায় গান গেয়ে তাদের বিনোদন দেন। শুধু তাই নয়, ছোটবেলায় অছিমের হাতে দোতারা দেখে যারা তাকে নিয়ে সমালোচনা করতেন আজ তারাই এখন তাকে নিয়ে তার গানের প্রশসংসা করেন।

শিক্ষক আছিম

২০১০ সালে স্থানীয় কাটলাবাজারে একটি সঙ্গীত স্কুল খুললেও পরে সেটি শিক্ষার্থী ও অর্থাভাবে বন্ধ হয়ে যায়। তবে হাল ছাড়েননি অছিম। রাজশাহীর তানোর উপজেলার চৌবাড়িয়া বাজারে তার এক শীষ্য কাবিল হোসেনের অনুরোধে সেখানে গড়ে তোলেন একটি সঙ্গীত স্কুল। নাম দিয়েছেন ‘আমরা ক‘জন শিল্প গোষ্ঠী’। এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সংগীতপ্রিয় মানুষগুলোই ওই স্কুলের শিক্ষার্থী। অছিম তার গ্রামের বাড়ি জোতবানী থেকে লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে প্রতিমাসে তানোরে গিয়ে দুইদিন ক্লাস নিয়ে আবার বাড়িতে ফিরে আসেন। আর নিজ গ্রামে জোতবানী যুব উন্নয়ন সমিতিতে বিকেল বা সন্ধায় সঙ্গীত চর্চার আসরে এলাকার সঙ্গীত অনুরাগীদের গানের তালিম দেন।

অছিমের শীষ্য বেনুপর গ্রামের তায়েব উদ্দিন বলেন, ‘আমি আমার গুরু অছিম ভাইয়ের নিকট গান শিখেছি। তার নিকট দোতারা বাজানো শিখেছি। এখন হারমোনিয়াম বাজানো শিখছি। দেশের বড় বড় মঞ্চে গান গাওয়ার সব ধরণের যোগ্যতা অছিম ভাইয়ের মধ্যে আছে।’

কষ্টের মাঝে কষ্ট

প্রতি সপ্তাহে কোথাও না কোথাও তার গান গাওয়া ডাক থাকেই। আর এভাবে গান গেয়েই যা আয় হয় তা দিয়েই চলে অছিমের সংসার। তার সংসারে স্ত্রী ও দুই মেয়ে। গান থেকে আয়ের টাকায় দুই মেয়ের বিয়ে হলেও বড় মেয়ের ডিভোর্স হওয়ায় অছিমের সংসারেই থাকছেন তিনি। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী অছিমের কুঁড়ে ঘরের ভাঙা হাঁড়ির খবর জেনেশুনেই সংসারে বউ হিসেবে আসা অছিমের স্ত্রী অছিমকে গান গাইতে উৎসাহ দেন। শুধু তাই নয়, গান গাইতে কোথাও গেলে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে দিনে কয়েকবার করে খোঁজ নেন।

আয়োজকদের অনুরোধে দেশের বিভিন্ন জায়গায় গান গাইয়ে গিয়ে সখের বসে বাজাতে বাজাতে হারমোনিয়াম, বড় কি-বোর্ড, দো-তারা, তবলা, বাঁশের বাঁশি, মন্দিরা, খোল, কাঠি ঢোল, বেঞ্জু ও বেহালা বাজানো শিখে ফেলেছেন।

আছিমের ইচ্ছে

অছিম জানান, ‘দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে তিনি লিখতে ও পড়তে না পারলেও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, রেডিও ও টেলিভিশনে শুনেশুনেই তিনশ‘র বেশি গান মুখস্ত করেছেন। লোকসংগীত গাইতে বেশি পছন্দ অছিমের। দেশের প্রায় ৪০টি জেলাতে তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে লালন সাঁই, লাল মিয়া বয়াতী, মাখম দেওয়ান, মুজিব পরদেশী ও রশিদ সরকারের গানগুলো গেয়ে শ্রোতাদের তৃপ্ত করেছেন। 

শিল্পী অছিম প্রসঙ্গে আলাপকালে জোতবানী গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি ও মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল গাফফার (বাবলু) বলেন, ‘অভাবের সংসারে বেড়ে ওঠা আমাদের অছিম একজন গানের শিল্পী হিসেবে আমাদের এলাকার মানুষের মন জয় করেছে। আমাদেরও আশা, একদিন আমাদের এই অছিম বড় পর্দায় গান গেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিবে।’

অজোপাড়া গাঁয়ে গান শেখা, বাদ্যযন্ত্র বাজানো ও গান গাওয়ার স্বপ্ন পূরণ হলেও তার হৃদয়ে একটি স্বপ্ন সবসময়ই খেলা করে। আর তাহলো দেশের টিভি চ্যানেলে গান গাওয়ার একটি সুবর্ণ সুযোগ।

এ ব্যাপারে দেশের অনেক শিল্পী, সুরকার ও গীতিকাদের সাথে কথা বলেছেন। অনেকেই সেই সুযোগ করে দেওয়ার আশ্বাস দিলেও আজও তা পূরণ হয়নি। একদিন তিনি টিভিতে গলা ছেড়ে গান গাইবেন- এমন আশায় বুক বেধে আছেন অছিম।

আছিমের আবেদন

অজোপাড়া গায়ে অভাব-অনটনকে চ্যালেঞ্জ করে এগিয়ে চলা অছিম বড় পর্দায় গান গাওয়ার সুযোগ পাক বা না পাক অছিমরা যেন কারো অবহেলা বা নিরুৎসাহে হারিয়ে না যায়। অছিম বেঁচে থাকুক গানের মাঝে, গানকে ভালেবাসে এমন গানপ্রিয় মানুষগুলোর হৃদয়ের একেবারে গভীরে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা