kalerkantho

বুধবার । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১৩ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

জনবলের চরম সংকট

লাকসাম-নোয়াখালী রেলপথে ১২টি স্টেশন, ৬টিই বন্ধ!

মুজিবুর রহমান দুলাল, লাকসাম (কুমিল্লা)   

২৬ নভেম্বর, ২০১৯ ২১:১১ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



লাকসাম-নোয়াখালী রেলপথে ১২টি স্টেশন, ৬টিই বন্ধ!

লাকসাম-নোয়াখালী রেলপথে ১২টি স্টেশনের মধ্যে ৬টি স্টেশন বন্ধ রয়েছে। স্টেশনগুলো হচ্ছে দৌলতগঞ্জ, খিলা, বিপুলাসার, বজরা, মাইজদি ও হরিনারায়ণপুর।

রেলওয়ে কতৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, জনবলের চরম সংকটের কারণে ওইসব স্টেশনগুলোর কার্যক্রম দীর্ঘ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। এদিকে স্টেশনগুলো বন্ধ থাকায় রাতের বেলায় সেখানে মাদকসেবীদের জমজমাট আড্ডা বসে।

বিজ্ঞাপন

চলে অসামাজিক কার্যক্রম। স্থানীয় বাসিন্দাদের এমন অভিযোগও রয়েছে।

লাকসাম উপজেলার অত্যন্ত প্রাচীনতম দৌলতগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনের কার্যক্রম লোকবল সংকটের কারণে দীর্ঘ দুই বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। ফলে ট্রেনের টিকেট বিক্রি এবং মালামাল পরিবহণে বুকিং কার্যক্রম বন্ধ থাকায় এই স্টেশন থেকে যাত্রীরা বিনা টিকেটে ভ্রমণ এবং বুকিং ছাড়াই মালামাল পরিবহন করছে। এতে একদিকে যাত্রীরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন, অন্যদিকে প্রচুর পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছেন রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

দৌলতগঞ্জ স্টেশনে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, স্টেশন মাস্টারের কক্ষে একটি তালা ঝুলছে। আশপাশে কোনো কর্মচারী নেই। এই স্টেশনের অনেক পুরনো কর্মচারী (পোর্টার) মো. সেলিম মিয়া। স্টেশনের প্লাটফরমে একটি বেঞ্চে বসে আছেন। কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশী সময় ধরে তিনি এই স্টেশনে চাকরি করেছেন। ২০১৭ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। বাড়িতে বসে থাকতে ভাল্লাগে না। তাই প্রতিদিন স্টেশনে এসে বসে থাকেন। পুরনো লোকজনের দেখা পেলে নানা গল্প করে সময় কাটান।

সেলিম মিয়া জানান, ২০০৮ সালের ৫ জুলাই এখানের স্টেশন মাস্টার অন্যত্র বদলি হয়। ফলে এই স্টেশনে টিকেট বিক্রিসহ মালামাল বুকিং কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ২০১৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর এই রুটে ডেমু ট্রেন চালু হওয়ায় কেবলমাত্র ওই ট্রেনেরই টিকেট বিক্রি করা হতো। এখন তাও হয় না। এ ছাড়া অন্যান্য ট্রেনের টিকেট বিক্রি এবং মালামাল পরিবহনে বুকিং কার্যক্রম ওই সময় থেকে বন্ধ রয়েছে। ফলে এ স্টেশন থেকে যাত্রীরা বিনা টিকেটে ভ্রমণ এবং বুকিং ছাড়াই মালামাল পরিবহন করছে। এতে একদিকে যাত্রীরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন, অন্যদিকে প্রচুর পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

লাকসাম রেলওয়ে জংশনের স্টেশন মাস্টার (এসএম) মো. কামরুল হাসান তালুকদার জানান, লাকসাম থেকে নোয়াখালীর দূরত্ব ৫২ কিলোমিটার। ওই রেলপথে মোট ১২টি স্টেশন রয়েছে। তারমধ্যে দীর্ঘ বছর ধরে ৬টি স্টেশনের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। প্রতিদিন ওই রুটে দুটি আন্তঃনগর, দুটি এক্সপ্রেস, দুটি লোকাল ও চারটি ডেমুসহ ১০টি ট্রেন চলাচল করে।  

রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, ১৮৯১ সালে চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত রেলপথ স্থাপিত হয়। ১৮৯৫ সালে উদ্বোধন করা হয় লাকসাম রেলওয়ে জংশন (তৎকালীন বড়তুপা)। অতপর পর্যায়ক্রমে লাকসাম থেকে নোয়াখালী ও চাঁদপুরে দুটি রেল লাইন সম্প্রসারিত হয়।

সূত্র আরো জানায়, লাকসাম-নোয়াখালী রেলপথ প্রতিষ্ঠার সময় দৌলতগঞ্জ স্টেশনটি স্থাপন করা হয়। এ স্টেশনটি ডাকাতিয়া নদীর তীরে অবস্থিত হওয়ায় নদী পথে আসা মালামাল ট্রেনে আনা-নেওয়ার জন্য এটিকে ব্যবহার করা হতো। ওই সময় তিনজন স্টেশন মাস্টার (এসএম), তিনজন সহকারী স্টেশন মাস্টার (এএসএম), গুডস ক্লার্ক, বুকিং ক্লার্ক, টালি ক্লার্ক পদে একজন করে এবং নিরাপত্তা বাহিনী পদে তিনজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু ওই সব গুরুত্বপূর্ণ সবগুলো পদ এখন শূন্য। পোর্টার পদে দু’জনের মধ্যে একজনও নেই। এ ছাড়া পয়েন্টসম্যান পদে পাঁচজন কর্মচারী। সবগুলো পদই শূন্য। ফলে লোকবলের সংকটে স্টেশনটি বন্ধ হয়ে যায়। অন্য ৫টি স্টেশনেরও একই অবস্থা।

লাকসাম ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. তাবারক উল্লাহ কায়েস জানান, দৌলতগঞ্জ অত্যন্ত প্রাচীন এবং একটি বিশাল বাণিজ্যিক শহর। এখানে বিভিন্ন কল-কারখানাসহ ছোট বড় প্রায় তিন হাজার ৮০০ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ব্যবসায়ীক কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে এখানের ব্যবসায়ীদের যোগাযোগ খুব বেশী। কিন্তু দৌলতগঞ্জ স্টেশনের কার্যক্রম বন্ধের কারণে মালামাল পরিবহনের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন।

এই ব্যাপারে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা (ডিটিও) মো. নাসির উদ্দিন বলেন, স্টেশন মাস্টার, বুকিং সহকারী এবং পয়েন্টসম্যানের অত্যন্ত সংকট রয়েছে। এ ব্যাপারে বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তার (ডিসিও) সঙ্গে কথা বলুন। তিনি ভালো বলতে পারবেন।  

রেলওয়ের চট্টগ্রাম বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা (ডিসিও) মো. আনসার আলী মুঠোফোনে এই প্রতিনিধিকে বলেন, স্টেশনগুলো বন্ধ রয়েছে এটি আমার জানা নেই। আপনার ফোনের মাধ্যমেই এখন জানতে পারলাম। স্টেশনগুলো বন্ধ তো আমি কী করবো। এ ভাবেই একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা তার দায় এড়ালেন।

এই ব্যাপারে চট্টগ্রাম বিভাগীয় রেলওয়ের ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) মো. বোরহান উদ্দিন বলেন, আইনি জটিলতার কারণে অনেকগুলো নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় স্টেশনগুলোর কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তবে লোকবল সংকটসহ অন্যান্য সমস্যা নিরসনে শিগগিরই ঊর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনাক্রমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



সাতদিনের সেরা