kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

পিরোজপুর

ঝড় উড়িয়ে নেয়, চাম্বল পিষে দেয়

দেবদাস মজুমদার, পিরোজপুর    

২২ নভেম্বর, ২০১৯ ১২:৩৯ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



ঝড় উড়িয়ে নেয়, চাম্বল পিষে দেয়

পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার আমড়াগাছিয়া গ্রামে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলে চাম্বলগাছ উপড়ে পড়ে বিধ্বস্ত হয় কৃষক নির্মল চন্দ্রের বসতঘর। ফাইল ছবি

পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার আমড়াগাছিয়া গ্রামের ষাটোর্ধ্ব কৃষক নির্মল চন্দ্র রাঢ়ী ২০ বছর আগে টিনের একটি ঘর তোলেন। নিকটাত্মীয়র দেওয়া একটি চাম্বলগাছ পূর্ব দিকে রোপণ করেন। এত দিনে সেই গাছ প্রায় ৭০ ফুট লম্বা হয়েছে। সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের তাণ্ডবে সেটি গোড়াসহ উপড়ে বসতঘরের ওপর পড়ে। ঘরটি বিধ্বস্ত হয়।

সকালে ঝড়ের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের সদস্যরা প্রাণভয়ে প্রতিবেশীর এক বাড়িতে আশ্রয় নেয়। ফলে প্রাণে বাঁচলেও কৃষক পরিবারটি গৃহহীন হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, ‘বুঝতে পারি নাই চাম্বলগাছ এত নড়বড়ে।’

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বুলবুলের তাণ্ডবে শুধু চাম্বলগাছ উপড়ে এবার বিধ্বস্ত হয়েছে ৬০০ পরিবারের ঘর। এ ছাড়া বিদ্যুতের তার ছিঁড়েছে। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। অন্যদিকে ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডরে মঠবাড়িয়ায় ২০টি বসতি বিধ্বস্ত হয়। সেই সঙ্গে ১৭১ জনের প্রাণহানি ঘটে শুধু এই চাম্বলগাছ উপড়ে পড়ে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চাম্বল মূলত একটি গুচ্ছমূলের গাছ। এর শিকড় মাটির উপরিভাগে গুচ্ছ আকারে থাকে। শিকড় মাটির গভীরে যায় না। ফলে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে এটি খুব সহজে মাটিশুদ্ধ উপড়ে পড়ে। চাম্বল প্রচুর রস শুষে নিয়ে মাটিকে অনুর্বর করে তোলে। এ গাছ খুব লম্বা হয় ও দ্রুত বাড়ে। ফলে মানুষ লাভের আশায় চাম্বলগাছ লাগায়। তবে এই গাছ উপকূলের মাটি উপযোগী নয়।

স্থানীয় তরুণ পরিবেশকর্মী নূরুল আমীন রাসেল বলেন, ‘আমাদের উপকূলের আবহাওয়া ও মাটি চাম্বল উপযোগী নয়। এ গাছ জীবন, মাটি ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। ২০-২৫ বছর আগে উপকূলে এ গাছের সম্প্রসারণ ঘটে। প্রথমে নার্সারিতে মাটির টালিতে চাম্বল চারা উৎপাদন শুরু হয়। এরপর এ গাছ লাগানোর হিড়িক পড়ে। গাঁয়ের কাঁচা সড়ক, পাকা সড়কের দুই পাশে আর বসতবাড়িতে চাম্বলগাছের সম্প্রসারণ ঘটে। এ গাছ এখন প্রাণ ও বসতির জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠেছে। উপকূলে এখন ঝড়ের সঙ্গে আরেক দুর্যোগ ডেকে আনছে।’

গোলবুনীয় গ্রামের কৃষক আব্দুল বারেক বলেন, ‘সরকার গাছ লাগাইতে কইছে লাগাইছি। চাম্বলগাছ দেহি এহন ক্ষতিকর গাছ। ঝড়ে তিনডা চাম্বল ঘরের ওপর পড়ছে।’

স্থানীয়রা জানায়, পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হলেও সামাজিক বনায়নের নামে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ও গাঁয়ের মানুষ স্বপ্রণোদিত হয়ে এ গাছ উপকূলে সম্প্রসারণ করে। চাম্বল ঝড় সহনশীল নয়। উপকূলে ইকো সিস্টেমের জন্য যে ধরনের বনজ, ফলদ, ভেষজ ও ঔষধি গাছের সম্প্রসারণ ঘটানোর কথা, তা এখন বিলুপ্তির দিকে। মানুষ এ বিষয়ে তেমন সচেতনও নয়।

মঠবাড়িয়া উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুমন কুমার কর্মকার বলেন, চাম্বল উপকূলে ঝড়সহিষ্ণু না। গুচ্ছমূলের এ গাছ মাটির প্রচুর প্রাণরস শুষে নেয়। এতে মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা নষ্ট হয়। দুর্যোগপ্রবণ উপকূলে উচিত হবে পরিবেশবান্ধব গাছ লাগাতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা।’

এ বিষয়ে মঠবাড়িয়া উপজেলা বন সংরক্ষণ কর্মকর্তা মো. ফকর উদ্দিন বলেন, ‘উপকূল বাঁচাতে আমাদের বনায়ন টিকিয়ে রাখতে হবে। তবে দুর্যোগপ্রবণ উপকূলে পরিবেশবান্ধব গাছ লাগাতে বন বিভাগ কাজ করছে। চাম্বলগাছ দ্রুত বর্ধনশীল, তবে এটি উপকূলে ঝড়সহিষ্ণু নয়। এবার ঝড়ে মনে হচ্ছে বসতবাড়ি ও সড়কের পাশে চাম্বলগাছ লাগানো নিরাপদ নয়। আমাদের উচিত হবে পরিবেশবান্ধব ঝড়সহিষ্ণু পত্রবৃহৎ ও পাতাবহুল বৃক্ষ লাগানো। এতে উপকূলে তাপমাত্রা সহনীয় থাকবে। পরিবেশবান্ধব গাছ লাগাতে বন বিভাগ জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করে আসছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা