kalerkantho

শনিবার । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৯ রবিউস সানি ১৪৪১     

চৌগাছার জগন্নাথপুর হানাদার মুক্ত দিবস কাল

চৌগাছা (যশোর) প্রতিনিধি   

২১ নভেম্বর, ২০১৯ ২১:৫৫ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



চৌগাছার জগন্নাথপুর হানাদার মুক্ত দিবস কাল

১৯৭১ এর রনাঙ্গন বলে পরিচিত যশোরের চৌগাছার জগন্নাথপুর হানাদার মুক্ত দিবস কাল। ১৯৭১ সালের এই দিনে মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর সাথে পাকসেনাদের তুমুল যুদ্ধ হয়। সশস্ত্র যুদ্ধের একপর্যায় উভয়ের গোলাবারুদ শেষ হলে যুদ্ধটি মল্লযুদ্ধে রূপান্তরিত হয়। মল্লযুদ্ধের যুদ্ধের ধরণ ও প্রকৃতি নিয়ে দেশের সামরিক একাডেমিতে পাঠ করানো হয় বলে স্থানীয়রা জানান। ঐতিহাসিকভাবে জগন্নাথপুর সমৃদ্ধ। পরবর্তীতে গ্রামের নাম রাখা হয় মুক্তিনগর।

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা মোশারফ হোসেন স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, জগন্নাথপুর যুদ্ধটি ছিল সবচেয়ে বড় যুদ্ধ। ১৯৭১ সালের ২০ নভেম্বর বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত পাকসেনারা সিংহঝুলী, মশিউরনগর মাঠ ও জগন্নাথপুরে সাজোয়া ট্রাংকসহ সশস্ত্র অবস্থায় অবস্থান করতে থাকে। মিত্র বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধারা অবস্থান নেয় জগন্নাথপুর ও গরীবপুর মাঠ সংলগ্ন চাড়ালের বাঁশ বাগানে ও তেঁতুল তলা এলাকায়। 

তিনি বলেন, ২১ নভেম্বর ঈদের দিন থেকেই এখানে যুদ্ধের সূচনা হয়। নামাজের দিন হলেও সকলের মধ্যে আতংক বিরাজ করছিল। পাক হানাদার বাহিনী প্রথমে অতর্কিত হামলা চালায়। প্রচণ্ড গুলির শব্দে চারদিক প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য পাক সেনাদের বিরুদ্ধে ভারতীয় মিত্র বাহিনী সাথে মুক্তি বাহিনী যুক্ত হয়ে যুদ্ধ শুরু করে।

তিনি বলেন, মিত্রবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমনে কোণঠাসা হয়ে পড়লে পাকসেনারা আকাশযুদ্ধ শুরু করে। পাক জঙ্গি বিমান জগন্নাথপুর মাঠসহ চৌগাছার আকাশ প্রকম্পিত করে তোলে। মুর্হুমুহু গুলিতে বিধস্ত করার চেষ্টা করা হলেও ভারতীয় বিমানের কাছে পরাস্থ হয় পাক বিমান। বারবার বাঁধার মুখে পাক বিমান চৌগাছার আকাশে বেশিক্ষণ উড্ডয়ন করতে পারেনি। মিত্র বাহিনী দুটি বিমানকে ভূপাতিত করে দুজন পাইলটকে আটক করে।

স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি আরো বলেন, যুদ্ধ চলাকালীন উভয়ের গোলাবারুদ শেষ হলে এক পর্যায়ে জগন্নাথপুর আম্রকাননে শুরু হয় মল্লযুদ্ধ। অনেকে হাতাহাতি বা বেয়নেট যুদ্ধও বলে। তিনি বলেন, উভয় পক্ষ অস্ত্রের বাট, বেয়নেট, কিল, ঘুষি, লাথি এমনকি কুস্তাকুস্তির মাধ্যমে পরস্পরের সাথে যুদ্ধ করে। মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে গ্রামবাসী দা, শাবল, কাস্তে, লাঠি নিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। 

দ্বিতীয় দফায় ২২ নভেম্বর কামান যুদ্ধ শুরু হলে বহু পাকসেনা নিহত হয়। এ দিন মিত্র বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের চতুর্দিক আক্রমণ ও রণকৌশলে পাক সেনারা দিশেহারা হয়ে বিদ্ধস্ত ৮টি ট্যাংক, বাকসো ভরা মার্কিন চাইনিজ অস্ত্রশস্ত্র ফেলে রেখে যশোর সেনানিবাস অভিমুখে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। মুক্ত হয় জগন্নাথপুর গ্রাম। ফলে জয়বাংলা স্লোগানে মুক্তিযোদ্ধাসহ এলাকার মানুষ আনন্দ করে। 

স্থানীয় শিক্ষক ইজারুল ইসলাম বসির জানান, এই যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাসহ ৫৭ জন সাধারণ জনগণ মৃত্যুবরণ করেন। তাদের মধ্যে ১৯ জন নিহতের নাম পাওয়া গেছে। 

মল্লযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য সাবেক জেলা প্রশাসক, পরিকল্পনামন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য ড. মহিউদ্দীন খান আলমগীর জগন্নাথপুর গ্রামের নাম পরিবর্তন করে নাম রাখেন মুক্তিনগর। পরবর্তীতে তিনি মল্লযুদ্ধের স্থানে মুক্তিনগর শহীদ স্মরণী শিক্ষা নিকেতন নামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। জগন্নাথপুর গ্রামের আম্রকাননে ১৯৯৭ সালের আগস্ট মাসে ভারতীয় সেনাপ্রধান শংকর রায় চৌধুরী পরিদর্শনে আসেন। এ এলাকায় তিনি ১৯৭১ সালে যুদ্ধের নেতৃত্বে দেন। বিখ্যাত সেই আম্রকানন এখন আর সেখানে নেই।

যুদ্ধের বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহাজান আলীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই অঞ্চলের ভয়াবহ যুদ্ধ হয় এখানে। এই যুদ্ধ নজিরবিহীন। মুক্তিযোদ্ধাসহ মিত্রবাহিনী ও পাকবাহিনীর মধ্যকার চলমান যুদ্ধে গোলাবারুদ শেষ হলে উভয়ে মল্লযুদ্ধে লিপ্ত হয়।

সাবেক শিক্ষক লিয়াকত আলী জানান, এই যুদ্ধটি ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। আমার জানা মতে ১৯৭১ সালের যুদ্ধের ইতিহাসে মল্লযুদ্ধ কোথাও হয়নি। বাংলাদেশের সামরিক একাডেমিতে মল্লযুদ্ধের বিষয়টি পড়ানোর পাশাপাশি যুদ্ধের ধরণ ও প্রকৃতি সম্পর্কে সেনা সদস্যদের জানানো হয়।

মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার ডা. নূর হোসেন বলেন, জগন্নাথপুর-গরীবপুর সংলগ্ন এলাকায় যুদ্ধটি স্মরণযোগ্য। যুদ্ধে পাক সেনাদের ৮টি ট্যাঙ্ক ধ্বংস হয়। মিত্রবাহিনী ও পাকবাহিনীর গোলাবারুদ ও যুদ্ধের রসদ শেষ হলে উভয় মল্লযুদ্ধে লিপ্ত হয়। বিশেষ করে মুক্তিনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গন ছিল বিশাল আম্রকানন। বিশাল বিশাল আম গাছে মাঠটি ভরা ছিল। এই আম্রকাননে কিল ঘুষি, লাথি এমনকি বেয়নেট দিয়ে তারা যুদ্ধ করে। পুরো আম্রকানন মাঠ রক্তাত্ব হয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা