kalerkantho

সোমবার । ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ১ পোষ ১৪২৬। ১৮ রবিউস সানি                         

সংকটের গুজবে লবণ চাষিদের মাঝে হাস্যরস

মাঠে এবং গুদামে মজুদ সাড়ে ৬ লাখ টন লবণ

বিশেষ প্রতিনিধি, কক্সবাজার ও চকরিয়া প্রতিনিধি    

২০ নভেম্বর, ২০১৯ ০২:২২ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মাঠে এবং গুদামে মজুদ সাড়ে ৬ লাখ টন লবণ

দেশের একমাত্র লবণ উত্পাদনকেন্দ্র কক্সবাজারের উপকূলীয় মাঠে চাষিরা যে মুহূর্তে নতুন মৌসুমের উত্পাদন কাজে নেমেছেন, তখনই বাজারে গুজব ছড়ানো হচ্ছে এই বলে যে—এবার লবণ সংকট দেখা দিয়েছে। বাস্তবে দেশে লবণের কোনো সংকট নেই জানিয়ে কক্সবাজারের লবণ চাষি, ব্যবসায়ী ও মিল মালিকরা গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জানিয়েছেন, এখনো পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ছয় লাখ মেট্রিক টন লবণ মাঠে ও গুদামে মজুদ রয়েছে। যা দিয়ে আগামী তিন মাস দেশের মানুষের চাহিদা মিটবে অবাধে। লবণের সংকটের গুজবে কক্সবাজারের চাষিদের মাঝে সৃষ্টি হয়েছে হাস্যরসের।

গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের সম্মেলনকক্ষে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত মতবিনিময়সভায় লবণ চাষি, ব্যবসায়ী ও মিল মালিকরা এসব জানান। তাঁরা অভিযোগের সুরে বলেন, পেঁয়াজের পর একটি চক্র উদ্দেশ্যমূলকভাবে লবণের নতুন মৌসুম শুরুর প্রাক্কালে এমন গুজব ছড়িয়ে লবণশিল্পকে ধ্বংস করার চক্রান্তে নেমে পড়েছে। মোবাইলে যারা লবণ সংকটের গুজব ছড়িয়ে দিচ্ছে তাদের চিহ্নিত করার দাবিও জানানো হয়েছে।

কক্সবাজারের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশরাফুল আফসারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মতবিনিময়সভায় স্থানীয় লবণ মিল মালিক সমিতির সভাপতি শামশুল আলম লবণ পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়ে জানান, ‘আমাদের মাঠ ও গুদামে যে পরিমাণ লবণ মজুদ রয়েছে তা বিক্রি করতে পারছি না। লবণের খুচরা মূল্য নেমে এসেছে কেজিতে চার-পাঁচ টাকা। ন্যায্য মূল্য না পেয়ে হতাশ চাষিরা নতুন উত্পাদনেই মাঠে নামতে পর্যন্ত রাজি হচ্ছেন না। সেখানে লবণের ‘সংকট গুজব’ ছড়ালে কি আমাদের বিশ্বাস করতে হবে?’

শামশুল আলম আরো বলেন, গেল মৌসুম যখন শুরু হয় তখনও মাঠে মজুদ ছিল তিন লাখ ২৭ হাজার মেট্রিক টন লবণ। গেল মৌসুমে উত্পাদন হয় ১৮ লাখ ২৪ হাজার মেট্রিক টন লবণ অর্থাত্ সাকল্যে ২১ লাখ ৫১ হাজার মেট্রিক টন মজুদে এসে দাঁড়ায়। অথচ দেশে লবণের বার্ষিক চাহিদা রয়েছে ১৬ লাখ ২১ হাজার মেট্রিক টন। সেই হিসাবে দেশে কেবল গেল মৌসুমের উত্পাদিত লবণেই আরো উদ্বৃত্ত রয়েছে পাঁচ লাখ ৩০ হাজার মেট্রিক টন। তবু কেন দেশে লবণ সংকটের গুজব ছড়ানো হয় তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

অপরদিকে বাংলাদেশ লবণ মিল মালিক সমিতির সভাপতি নুরুল কবির সভায় নিশ্চয়তা দিয়ে বলেন, ‘দেশে লবণের বাজার স্বাভাবিক রয়েছে, কোনো ধরনের ঘাটতি নেই। একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী লবণের সংকট দেখিয়ে দাম বৃদ্ধির অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। তারা মূলত এ শিল্পকে ধ্বংস করতে চাচ্ছে। অপপ্রচারকারীদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।’ লবণ ব্যবসায়ীরা জানান, আয়োডিন মিশ্রিত প্যাকেটজাত লবণ কেজিপ্রতি ১১ টাকা করে বিক্রি হলেও মাঠপর্যায়ে পাইকারি মূল্য রয়েছে কেজিপ্রতি চার-পাঁচ টাকা মাত্র।

জেলা প্রশাসনের সভায় কক্সবাজারের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশরাফুল আফসার বলেন, লবণের সংকট নিয়ে কেউ গুজব রটানোর প্রমাণ পেলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কক্সবাজার জেলার উপকূলীয় মাঠে এখনো প্রচুর পরিমাণে লবণ মজুদ রয়েছে বলেও তিনি জানান।

মূলত কক্সবাজারের সাত উপজেলা তথা চকরিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, কক্সবাজার সদর, উখিয়া ও টেকনাফে লবণ উত্পাদন হয়। মাঠপর্যায়ের চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বড় বড় লবণ মিল মালিকরা সিন্ডিকেট করে অনেক সময় উত্পাদিত উদ্বৃত্ত লবণের যথাযথ দাম দেন না। এ কারণে চাষিরা মাঠেই ভবিষ্যতের জন্য লবণ মজুদ করে রাখেন। কিন্তু বর্তমানে লবণের সংকটের গুজবে কক্সবাজারের চাষিদের মাঝে হাস্যরসের সৃষ্টি হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ লবণ চাষি সমিতির নেতা ও ব্যবসায়ী হারুনুর রশিদ গতকাল সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কক্সবাজারের লবণ মাঠের কাছে বড় বড় গর্তে এবং গোডাউনে কম করে হলেও সাত লাখ মেট্রিক টন লবণ মজুদ রয়েছে। বিভিন্ন মাধ্যমে লবণ সংকটের যেসব খবর প্রচারিত হচ্ছে তা ডাহা মিথ্যা।’

বাংলাদেশ লবণ চাষি সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট এ এইচ এম শহীদুল্লাহ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশে কোনো লবণের সংকট নেই।’ শহীদুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে, কোনো একটি চক্র সিন্ডিকেট করে কৃত্রিম সংকটের গুজব ছড়িয়ে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। যাতে মানুষ এ নিয়ে ট্রল শুরু করে এবং সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে পারে।’

চকরিয়ার বৃহত্ লবণ চাষি পশ্চিম বড় ভেওলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মাতামুহুরী সাংগঠনিক উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বাবলা বলেন, ‘লবণ তো মজুদ আছেই, পাশাপাশি শীত মৌসুম শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মাঠপর্যায়ে লবণ উত্পাদনে মাঠে নেমে পড়েছেন প্রান্তিক চাষিরা। অতএব লবণ সংকট পড়েছে কথাটি একেবারেই পরিকল্পিত গুজব বলে মনে করি।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা