kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৪ রবিউস সানি     

শিবগঞ্জে মাছ মেলায় ১২ কেজির বোয়াল, ২০ কেজির ব্লাক কাপ

নিজস্ব প্রতিবেদক, বগুড়া   

১৮ নভেম্বর, ২০১৯ ১৬:০৩ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শিবগঞ্জে মাছ মেলায় ১২ কেজির বোয়াল, ২০ কেজির ব্লাক কাপ

বগুড়ার মোকামতলা-জয়পুরহাট আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশেই ইট বিছানো একটি পথ। মোড়ে দাঁড়াতেই বেশ দূর থেকে মাইকের শব্দ কানে ভেসে আসে। শুনতে পাওয়া যায় মাছ বিক্রির ডাক, বড় বড় মাছ নেই। রুই, কাতলা, চিতল নেন।

বগুড়ার শিবগঞ্জের উথলীতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নবান্ন উৎসব উপলক্ষে আজ সোমবার বসেছিল মাছ মেলা। মেলায় মাছ কেনাবেচা হয়েছে ঢের। দেড় কেজি থেকে শুরু করে ২০ কেজি ওজনের বাঘ আইড়, বোয়াল, রুই, কাতলা, চিতল, সিলভার কার্প, ব্লাক কাপ, ব্রিগেডসহ হরেক রকমের মাছ বিক্রি হয় মেলায়। তবে দাম ছিল বেশি। অনেক ক্রেতায় দামের কারণে পছন্দের মাছ কিনতে পারেননি।

বিশাল আকৃতির বাঘ আইড়, বোয়াল, রুই, কাতলা ও চিতল মাছগুলো এক হাজার থেকে ১৬০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়। তবে মাঝারি আকারের মাছ ৩০০ টাকা থেকে ৬৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। এ ছাড়া ২০০ থেকে ৪৫০ টাকা দরে ব্রিগেড ও সিলভার কার্প মাছ বেচাকেনা হয়।

স্থানীয়রা জানান, ২০০ বছরের প্রাচীন উথলী মাছ মেলাকে কেন্দ্র করে আশপাশের ২০ গ্রামে স্বজনদের মিলন মেলায় পরিণত হয়। গ্রামের লোকজন তাদের আত্মীয় স্বজনকে দূর-দূরান্ত থেকে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে আসে।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পঞ্জিকানুসারে সোমবার পহেলা অগ্রহায়ণ হওয়ায় এদিন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নবান্ন উৎসব পালন করে। এ উৎসবকে কেন্দ্র করেই প্রতিবছর মাছ মেলা বসে উথলীতে। 
তবে এটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উৎসব হলেও উথলী, রথবাড়ী, ছোট ও বড় নারায়ণপুর, ধোন্দাকোলা, সাদুল্যাপুর, বেড়াবালা, আকনপাড়া, গরীবপুর, দেবীপুর, গুজিয়া, মেদেনীপাড়া, বাকশন, গণেশপুর, রহবল শিবগঞ্জসহ আশেপাশের ২০ গ্রামের মানুষের ঘরে ঘরে চলে উৎসবের আয়োজন। প্রতিটি বাড়িতেই মেয়ে জামাইসহ আত্মীয় স্বজনকে আগে থেকেই নিমন্ত্রণ করা হয়। পরিবারের সবাইকে নিয়ে তারা নতুন ধানের নবান্ন উৎসবে মেতে ওঠে। খাওয়ানো হয় বড় বড় মাছ। আর জামাইকে দেয়া হয় মাছের মাথা।

নবান্ন উপলক্ষে মাছ মেলা শুধু নয়, জমি থেকে নতুন তোলা অন্যান্য শাক সবজির পসরাও সাজানো হয় মেলা চত্বরে। মেলায় নতুন আলু বিক্রি হয়েছে ২০০ টাকা কেজি দরে। এ ছাড়া মিষ্টি আলু ও কেশর (ফল) প্রতি কেজি দেড় শ টাকা বিক্রি হয়েছে।

গাইবান্ধার বালাসী ঘাটে যমুনা নদীতে ধরা পড়া পাঁচটি বিশাল আকৃতির বাঘাইড় মাছ বিক্রি করতে মেলায় এসেছিলেন ব্যবসায়ী আব্দুল মতিন মিয়া। তার কাছে থাকা প্রতিটি বাঘ আইড় মাছের ওজন ১২ থেকে ১৫ কেজি। প্রতি কেজি মাছের দাম হাঁকছেন ৯০০ থেকে ১০০০ টাকা। কিন্তু ক্রেতার উৎসাহ কম। বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত মাত্র চারটি মাছ বিক্রি করতে পেরেছেন। ১৫ কেজি ওজনের একেকটি মাছ বিক্রি করেন ১২ হাজার টাকায়।

যমুনা নদী থেকে ধরা জ্যান্ত বোয়াল মাছ এনেছিলেন ব্যবসায়ী রঞ্জন বোস। সাড়ে ১৫ কেজির বিশাল আকৃতির বোয়াল মাছ দাম হাঁকেন ১৫০০ টাকা কেজি। এরমধ্যে একটি বোয়াল বিক্রি হয় ১৩০০ টাকা হিসেবে। তিনি জানান, গত বছরের তুলনায় এবার দাম কিছুটা বেশি। তাই বেচাকেনাও আশানুরূপ হয়নি।

অপর মাছ বিক্রেতা কালাই উপজেলার পুনট গ্রামের লাল মিয়া জানান, মেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে দেড় শতাধিক মাছের দোকান বসেছে। প্রত্যেক বিক্রেতা অন্তত ছয় থেকে ১০ মণ করে মাছ বিক্রি করেছে। মেলায় মাছ সরবরাহের জন্য ২০টি আড়ত খোলা হয়। সেসব আড়ত থেকে স্থানীয় বিক্রেতারা পাইকারি দরে মাছ কিনে মেলায় খুচরা বিক্রি করে। একই সাথে মেলায় জ্যান্ত মাছ দেখানো এবং রাখার জন্য ভ্রাম্যমাণ চৌবাচ্চার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানে জ্যান্ত মাছগুলো রাখা হচ্ছে। মেলায় ১২ কেজি ওজনের একটি জ্যান্ত কাতল মাছের দাম চাওয়া হয় ৯০০ টাকা হিসাবে দশ হাজার আটশত টাকা।

স্থানীয় উথলী গ্রামের বাসিন্দা মনিরুল ইসলাম জানান, ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী মেলাটি যেমন মাছের জন্য বিখ্যাত, তেমনি মেলার দিন নতুন শাকসবজিতেও ভরপুর থাকে। এ কারণে আশপাশের লোকজন মেলায় ছুটে আসে। তিনি বলেন, মেলা উপলক্ষে সেখানে নাগরদোলা, শিশু-কিশোরদের খেলনার দোকান বসেছে। সেই সঙ্গে মিষ্টান্ন ও দইয়ের একটি বড় বাজারও বসেছে মেলা চত্বরে।

শিবগঞ্জ উপজেলার ধোন্দাকোলা গ্রামের আমিন মিয়া বলেন, আমরা ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি এই মেলা। আশপাশের এলাকা হিন্দু অধ্যুষিত হওয়ায় নবান্নের মেলাটি জমজমাট হয়। মেলায় নবান্নের সব উপকরণওই পাওয়া যায়।

মেলায় মাছ কিনতে এসে বেড়াবালা গ্রামের আজাহার মোল্লা ও গণেশপুর গ্রামের জীতেন বড়ুয়া জানান, উথলীর নবান্ন মেলায় বিক্রির জন্য আশপাশের এলাকার পুকুরগুলোতে সৌখিন চাষিরা মাছ মজুদ করে রাখে। কে কত বড় মাছ মেলায় তুলতে পারে যেন তারই প্রতিযোগিতা চলে চাষিদের মধ্যে। এ ছাড়া আড়তদাররা তো আছেই। এলাকার লোকজনও প্রায় প্রতিযোগিতা করে তুলনামূলক বড় মাছ কিনে বাড়িতে নিয়ে যায়। হিন্দুদের নবান্ন হলেও আশপাশের গ্রামের সব সম্প্রদায়ের মানুষই কেনাকাটা করে। বিশেষ করে বাড়ির আত্মীয় স্বজনদের জন্য বড় মাছ কেনা একটা রেওয়াজে পরিণত হয়েছে।

উথলী বহুমুখী মৎস্য আড়তের সত্ত্বাধিকারী ফজলুল বারী জানান, আগে মেলাটি ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও এখন ব্যাপকতা লাভ করেছে। শুধু আশপাশেরই নয়, পুরো শিবগঞ্জ উপজেলার মানুষ এখানে নবান্নের বাজার করতে আসে। মাছ মেলার খবর পেয়ে শহর থেকেও অনেকে সেখানে ছুটে যায় মাছ কিনতে। তবে তুলনামূলকভাবে এবার মাছের আমদানি অনেকটা কম।

দেখা গেছে ভোর থেকেই ব্যাপক উৎসাহের মাছ কিনছেন ক্রেতারা। মজার বিষয় হচ্ছে, যত দাম দিয়েই বেচাকেনা হোক না কেন, সবার মুখেই যেন বিজয়ের হাসি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা