kalerkantho

শনিবার । ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৬ রবিউস সানি               

মানবপাচারকে পেশায় পরিণত করেছে বাঁশখালীর সঙ্গবদ্ধ চক্র

বাঁশখালী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি   

১৬ নভেম্বর, ২০১৯ ২১:০৯ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মানবপাচারকে পেশায় পরিণত করেছে বাঁশখালীর সঙ্গবদ্ধ চক্র

চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে সঙ্গবদ্ধ মানব পাচারকারী দল সক্রিয়। হতদরিদ্র মানুষকে নানা প্রলোভন দিয়ে মালয়েশিয়ায় বড় অংকের বেতনে চাকরি দেওয়ার নাম করে সাগর পথে গত ৩ বছরে পাচার করেছে প্রায় দুই সহস্রাধিক মানুষ। পাচারকারীরা প্রত্যেক ব্যক্তির কাছ থেকে সাড়ে ৩ লাখ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা করে হাতিয়ে নিয়েছে। অনেকে ৭/৮ বছর ধরেও স্বজনদের মালয়েশিয়া পাঠিয়ে খবর পাচ্ছেন না।

পাচার হওয়া ওই হতদরিদ্র মানুষ দেশে ফিরে না আসায় এবং খোঁজখবর না পাওয়ায় অনেকে মালয়েশিয়ার জঙ্গলে কিংবা সাগরে মারা গেছে বলে সন্দেহ করছেন। জীবিত স্বজনদের খবর পেয়ে অনেকে বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে আবেদন করে দেশে ফেরাতে চেষ্টা করছেন।

গত ৩ বছরে মালয়েশিয়ার বিভিন্নস্থানে আটকে থাকা বাঁশখালীর ২ হাজার মানুষকে দেশে ফেরাতে ইউএনও’র মাধ্যমে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। মালয়েশিয়া যাবার নামে প্রতারণার শিকার হওয়া ব্যক্তিরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, থানা ও আদালতে অভিযোগ কিংবা মামলা করেও হাতিয়ে নেওয়া টাকা উদ্ধার করতে পারছেন না এবং মৃত স্বজনদের লাশের হদিসও পাচ্ছেন না।

প্রতারণার শিকার ব্যক্তিদের জনপ্রতিনিধি, থানা ও আদালতে দেওয়া কয়েকটি অভিযোগ ও মামলা সূত্রে জানা গেছে, ১৩/১৪ জনের সঙ্গবদ্ধ মানব পাচারকারীরা পুরো বাঁশখালী জুড়ে মানব পাচারের তাণ্ডব চালাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ছনুয়া, শেখেরখীল, পুঁইছড়ি, চাম্বল, শীলকূপ ও বাঁশখালী পৌর এলাকার হত দরিদ্র বাসিন্দারা। শেষ সহায় সম্বল বিক্রয় করে কিংবা ধারকর্জ নিয়ে টাকা পয়সা দিয়েও কেউ কেউ বিদেশে যেতে পারছে না। আবার অনেকে বিদেশে গিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।

মানব পাচারকারীদের মধ্যে রয়েছে, শেখেরখীলের আহমদ ছফার পুত্র গোলাম নুর কবির চৌধুরী, তার চাচা মালয়েশিয়া প্রবাসী আব্দুল আজিজ, ছনুয়ার খুদুকখালী গ্রামের ছালেহ আহমদের পুত্র জামাল উদ্দিন,  মো. শফি, গফুর ডাকাত, শেখেরখীলের মৃত বুজরুচ মিয়ার পুত্র মনির মাঝিসহ আরো অনেকে।

ছনুয়ার খুদুকখালী গ্রামের নেজাম উদ্দিনের স্ত্রী সাবিনা আক্তার বলেন, আমার স্বামী নেজাম উদ্দিন ৬ বছর পূর্বে মালয়েশিয়া যান। ওখানে ভালোভাবে টাকা কামিয়ে দেশে পাঠাতো। ওইখানকার প্রবাসী আব্দুল আজিজ ও এখানকার তার ভাতিজা গোলাম নুর কবির চৌধুরীর মাধ্যমে আমার দুই ভাই নাছির ও ইসমাইলের জন্য ৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা দিয়ে ৩০০ টাকা স্ট্যাম্পের মাধ্যমে চুক্তি মোতাবেক ২টি ভিসার আবেদন করি। ভিসা না দিয়ে বিভিন্ন তালবাহানা করলে আমরা স্থানীয় চেয়ারম্যানকে বিচার দিই। এই খবর পেয়ে আমার প্রবাসী স্বামী নেজাম উদ্দিনকে মালয়েশিয়ায় হত্যা করে লাশ গুম করবে বলে হুমকি দেন। এর পর থেকে মালয়েশিয়া থেকে আমার স্বামীর কোনো খবর পাচ্ছি না। আমি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানায় প্রতারকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছি।

ছনুয়ার কালা মিয়ার পুত্র জসিম উদ্দিন বলেন, আমাকে মালয়েশিয়া নিয়ে যাবে বলে গোলাম নুর কবির চৌধুরী ও প্রবাসী আব্দুল আজিজ আমার কাছ থেকে বিভিন্নভাবে ৪ লাখ টাকা নিয়েছে। ভুয়া ভিসা দিয়ে কয়েকদফা বিমানবন্দরে নিয়ে যায়। ওখান থেকে আমাকে বাড়িতে ফিরে আসতে হয়। আমি ওই ব্যাপারে গত ১৩ নভেম্বর বাঁশখালীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করেছি। আদালত বাঁশখালী থানার ওসিকে মামলাটির তদন্তভার দিয়েছেন।

সরেজমিন তদন্ত করে দেখা গেছে, এসব সঙ্গবদ্ধ পাচারকারীরা উত্তর জলদীর আব্দুল মোনাফের পুত্র মো. হাসান থেকে ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা, নাপোড়ার বদি আলমের পুত্র নুরুল আলমের কাছ থেকে ৪ লাখ টাকা, সরলের আব্বাসের কাছ থেকে ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা, গন্ডামারার মো. কালু মিয়ার পুত্র মোস্তফা আলীর কাছ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা, শেখেরখীলের আহমদ ছফার পুত্র মো. সেলিমের কাছ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকাসহ ৫ শতাধিক মানুষের কাছ থেকে এভাবে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

শেখেরখীল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ইয়াসিন বলেন, গোলাম নুর কবির চৌধুরী ও আব্দুল আজিজের বিরুদ্ধে গত কয়েকদিন আগে ৪/৫ জন মানুষ পৃথক পৃথক অভিযোগ দিয়েছিল। আমি বিষয়টি আইনের আশ্রয় নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছি।

ছনুয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. হারুন বলেন, ছনুয়ার শতাধিক মানুষ এখন মালয়েশিয়ায় আটকে আছে। আমি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে সচিবের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করে প্রতিবেদন পাঠিয়েছি। পাচারকারীদের শায়েস্তা করা খুবই দরকার। গরিব মানুষ নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

চাম্বল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. মুজিবুল হক চৌধুরী বলেন, পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে আমার ইউনিয়নের মানুষ নানাভাবে প্রতারণার শিকার হচ্ছে। সঙ্গবদ্ধ পাচারকারীদের গ্রেপ্তার করা না হলে আরো মানুষ এদের ফাঁদে পড়বে।

বাঁশখালী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মুহাম্মদ রেজাউল করিম মজুমদার বলেন, অভিযোগ ও আদালতের মামলা পেয়েছি। ওইসব বিষয় গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযোগ যদি সত্যি হয়, পাচারকারীদের কেউ রক্ষা পাবে না।

বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোমেনা আক্তার বলেন, সাগর পথে কিংবা ভিন্ন পথে মালয়েশিয়া গিয়ে আটকে থাকা ব্যক্তিদের দেশে ফেরাতে প্রায় দিনই ১/২টা আবেদন আমার কাছে করে। ওইসব অভিযোগ কর্মকর্তাদের দিয়ে তদন্ত করিয়ে জেলা প্রশাসক বরাবর প্রতিবেদন পাঠিয়ে দিই। ওইখান থেকে জেলা প্রশাসক মহোদয় মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেন। এভাবে আমি যোগদানের পর থেকে ৫ শতাধিক ব্যক্তির প্রতিবেদন দিয়েছি। এর আগেও অসংখ্য ছিল। কারা এসব ব্যক্তিদের মালয়েশিয়া নিয়ে যান এবং কিভাবে মালয়েশিয়া পৌঁছেন তা শিগগিরই তদন্ত করা হবে। পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা