kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

কসবায় ট্রেন দুর্ঘটনা

'আধা মরা মাইয়াডা কইল, মা, আমারে বাঁচাও'

জহিরুল ইসলাম   

১৪ নভেম্বর, ২০১৯ ১০:৫১ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



'আধা মরা মাইয়াডা কইল, মা, আমারে বাঁচাও'

কসবায় গত সোমবার রাতে রেল দুর্ঘটনায় মা নাজমা আক্তারের কোল থেকে ছিটকে পড়ে মারা যায় মেয়ে আদিবা। গতকাল পঙ্গু হাসপাতালের বেডে শুয়ে ছেলেকে নিয়ে মায়ের আহাজারি। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘ক্যামনে কী হইল কিছুই বুঝলাম না। সবাই মিলা একসঙ্গে গেলাম, আর এখন মাইয়াডা নাই হইয়া গেল। আর অন্য সবাই হাসপাতালে কাতরাইতেছে। ১২টার দিকে সবাই ট্রেনে (উদয়ন) উঠলাম। এরপর সবাই গল্প করতে করতে অনেকে ঘুমাইয়া পড়ে। আমরা চুপচাপ বইসা রইছি। রাইত ৩টার দিকে ট্রেনে একটা ধাক্কা লাগল। এরপর সব অন্ধকার। খালি চিল্লাচিল্লির আওয়াজ। রক্ত আর রক্ত। আমি খালি পোলা-মাইয়া গুলারে খুঁজতেছিলাম। পরে পাইলাম; কিন্তু মাইয়াডা আধা মরা! কইল, মা, আমারে বাঁচাও। এরপর আর কিচ্ছু মনে নাই।’

গতকাল বুধবার বিকেলে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালের (পঙ্গু হাসপাতাল) বেডে শুয়ে বিলাপ করতে করতে কথাগুলো বলছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহত ফারজানা আক্তারের (১৬) মা রোজিনা বেগম (৪৫)।

ঘটনার দুই দিন আগে শ্রীমঙ্গলে খালাতো বোনের বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়েছিল ফারজানা আক্তার। সঙ্গে পরিবারের আরো আট সদস্য। একসঙ্গে গেলেও তাদের সঙ্গে আর ফেরা হয়নি চাঁদপুর বাগাদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থীর (এসএসসি পরীক্ষার্থী)। চাঁদপুরের উত্তর বানিয়া ইউনিয়নের বানিয়া গ্রামে ফিরেছে তার নিথর দেহ।

বিজ্ঞানে পড়ছিল ফারজানা। মা-বাবার সঙ্গে নিজের স্বপ্নও যুগপৎ হওয়ায় হতে চেয়েছিল চিকিত্সক। কিন্তু নিয়তির নির্মমতায় হঠাৎ ঝড়ে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগও পেল না ফারজানা। মারা গেল ঘটনাস্থলেই। কসবায় মর্মান্তিক ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহত ১৬ জনের একজন ফারজানা। একই বগিতে ছিল তার মা রোজিনা বেগম (৪৫), মামি শাহিদা আক্তার (৪৫), বড় ভাই হাসান ব্যাপারী (২৫), মামাতো বোন মিতু আক্তার (২৩), নানি ফিরোজা বেগম (৬৫), মামাতো বোন ইমলি (৪), বোনের ছেলে জোবায়ের (৩)। আহত পাঁচজনকে পঙ্গুতে ভর্তি করানো হয়েছে। একজন চিকিৎসা নিচ্ছে রাজধানীর বারডেম হাসপাতালে। জোবায়ের চাঁদপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে আর ইমলী সুস্থ আছে।

হাসপাতালের জরুরি বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, নিশ্চুপ মিতুর মুখে আঘাতের চিহ্ন। ভেঙে গেছে বাম হাত-পা। জরুরি বিভাগের সিনিয়র স্টাফ নার্স জসিম উদ্দিন বলেন, ‘মেয়েটার শরীরের একপাশ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখনো কথা বলতে পারে না। ঠিক হতে সময় লাগবে।’

শ্রীমঙ্গল থেকে চট্টগ্রামগামী উদয়ন এক্সপ্রেসে উঠেছিল তারা। উদ্দেশ্য কুমিল্লায় নেমে সেখান থেকে চাঁদপুর যাওয়া। মাত্র ২০ মিনিট পরে নামতে পারত কুমিল্লা রেলস্টেশনে। তবে এর আগেই ঘটে যায় এ দুর্ঘটনা। ফারজানার মা রোজিনা বেগম বলেন, ‘আর আধা ঘণ্টা ২০ মিনিট পর আমরা কুমিল্লা নাইমা যাইতাম। কিন্তু হঠাৎ এমনটা হইল। ঘটনার পর দেখলাম মাইয়াডারে কম্বল দিয়া মোড়াইয়া রাখছে। কম্বল রক্তে ভিইজ্জা গেছে। কাতরাইতে কাতরাইতে সে কইছিল, মা, আমি কি বাঁচমু না?’

একই ট্রেনে গত সোমবার রাত ১২টায় উঠেন সোহেল মিয়া (৩৫) ও তাঁর পরিবার। হবিগঞ্জ থেকে চট্টগ্রামে যাচ্ছিলেন তাঁরা। দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে সোহেলের ছোট্ট মেয়ে আদিবা। জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালের পরিচালক মো. আবদুল গনি মোল্লা বলেন, ‘ট্রেন দুর্ঘটনার পর থেকে এই পর্যন্ত (বুধবার বিকেল) ১৫ জন ভর্তি হয়েছে। অনেকের হাত, পা ও কোমরসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানের হাড় ভেঙে গেছে। এদের মধ্যে তিনজনের বড় ধরনের অপারেশন করতে হতে পারে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা