kalerkantho

শনিবার । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৯ রবিউস সানি ১৪৪১     

কমলগঞ্জে মধু চাষে নীরব বিপ্লব, বছরে আয় কোটি টাকা

কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) সংবাদদাতা   

১৩ নভেম্বর, ২০১৯ ২১:৪৯ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কমলগঞ্জে মধু চাষে নীরব বিপ্লব, বছরে আয় কোটি টাকা

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের আদমপুর, ইসলামপুর ইউনিয়নের ৩০টি গ্রামের ৪ শতাধিক পরিবার মধু চাষ করে আজ স্বাবলম্বী। বলতে গেলে এলাকায় নীরব বিপ্লব ঘটেছে মধু চাষ। আর এই মধু চাষের মুলকারীগর বা নায়ক আজাদ মিয়া। একটি রানী মৌমাছিকে বাড়ি নিয়ে এসে বাক্সে রেখে দেন। পরে এই বাক্সে হাজারো মৌমাছি জমা হতে থাকে। সেখান থেকেই প্রথম মধু আহরণ।

৫-৬ বছর আগেও মধু চাষের বিষয়টি যে উপজেলার চাষীদের কেউ কল্পনাও করেননি অথচ আজ সেই চাষিরাই তাদের উৎপাদিত মধু বাজারজাত করে বছরে কোটি টাকা আয় করছেন। সরকারি পর্যায়ে পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে এ উপজেলা হয়ে উঠতে পারে মধুচাষের অন্যতম ক্ষেত্র।

জানা যায়, ১৯৯৮ সালে উপজেলার কাঁঠালকান্দি গ্রামের মধুশিকারি মো. আজাদ মিয়া পাহাড়ি এলাকায় যান রাণী ধরতে। কিন্তু রানির দেখা তো মেলে না। একবার পাহাড়ি এক জলার ধারে দলে দলে মৌমাছি এসে পানি পান করছে, আর ফিরে যাচ্ছে। সেখান থেকে মৌমাছিদের পিছু ধরা। একসময় বনের ভেতর দেখা মিলল মৌচাকের, দেখা মিলল রানির। কৌশলে রানিকে ধরা হলো, সুতা দিয়ে বেঁধে রাখা হলো এক স্থানে। দেখা গেল ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে অনেক মৌমাছি রানির কাছে ছুটে এসেছে। রানিকে ঘিরে গুন গুন করছে। এরপর বাড়িতে এনে রানিকে রাখা হলো একটি কাঠের বাক্সে। কয়েক দিনেই সেই বাক্স ও এর আশপাশ মৌমাছির গুঞ্জনে সরব হয়ে ওঠে। চার মাসের মধ্যেই বাক্সে জমল প্রায় আট কেজি মধু। রানি মৌমাছি ধরার পর তাঁর মধু চাষে সাফল্য আসতে শুরু হলো। তার হাত দিয়ে প্রথম মধুচাষের সূচনা হয়। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে মধু চাষের সংখ্যা।

প্রথমে আদমপুর ও ইসলামপুর ইউনিয়নের মধ্যভাগ কালারায়বিল, ছয়ঘরি, কাঁঠালকান্দি, কোনাগাঁও, কানাইদাশী, রাজকান্দি, আধকানি, পুরান-বাড়ি, নয়াপত্তনসহ প্রায় ২৫টি গ্রামে চাষ হলেও বর্তমানে পৌরসভা, সমসেরনগরসহ আরো ইউনিয়নের মানুষ আগ্রহী হয়ে মধু চাষে মনোযোগী হয়েছেন। বর্তমানে প্রায় ৩৫টি গ্রামে বারো মাস মধু সংগ্রহ করা হয় এবং প্রায় ৪ শতাধিক চাষী মধুচাষে জড়িয়ে পড়েছেন। এই মধুচাষিদের অনেকেই এটাকে বাণিজ্যিকভাবে বাড়তি আয়ের পথ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। অনেকে একমাত্র জীবিকার উপায় হিসেবেও নিয়েছেন।

এই মধু চাষের জন্য বাড়তি জমির প্রয়োজন নেই। ঘরের এক পাশে বা কোণে, বারান্দায় বা বাড়ির ঝোপঝাড়ের পাশে বাক্স রাখলেই চলে। মৌচাক বানানো, মধু সংগ্রহের বাকি কাজটুকু করবে মৌমাছি। একটি বাক্স থেকে এক মৌসুমে ৫ থেকে ২৫ কেজি পর্যন্ত মধু পাওয়া যায়। বছরে বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ়, শ্রাবণ ও পৌষ এই মাসগুলোতে মৌচাকে মধু ভালো জমে। এখানকার চাষীদের উৎপাদিত মধু মৌলভীবাজার, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে উন্নত প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা না থাকায় কিছুটা সমস্যায় পড়তে হয় চাষিদের। তার পর কেজি প্রতি ১০০০/৮০০ টাকা দরে বিক্রয় করেন চাষীরা। শুধু এলাকায় নয় প্রবাসীরাও মধু কিনে বিদেশ নিয়ে যাচ্ছেন।

মধু সংগঠক আহমদ সিরাজ বলেন, আমার তিনটি বাক্স আছে। বছরে প্রতিটি বাক্স থেকে প্রায় ২৫ কেজি মধু পাই। আত্মীয়স্বজনের মধ্যে মধু বিলি করার পরও ১০/১৫ হাজার টাকা মিলে।

আলাপকালে চাষী খালেদ আহমেদ নাজমুল ইসলামসহ অনেকেই বলেন, কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ছাড়াই নিজেদের চেষ্টায় তারা মধু চাষ করছেন। সরকারি উদ্যোগে চাষীদের প্রশিক্ষণ ও তাদের উৎপাদিত মধু বাজারজাত হলে যেমন আরো অধিক উৎপাদন সম্ভব হতো তেমনি বাজারমূল্য আরো বেশী পেতেন।

বিগত  ৪ বছর ধরে এ উপজেলায় মধুচাষে নিরব বিপ্লব ঘটেছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় রাজ মধু, দাশকুলি মধু, মাছি মধু, ঘামি মধু ও মধু মালতি এ ৫ জাতের মধুর চাষাবাদ হলেও কমলগঞ্জে সবচেয়ে বেশি চাষাবাদ হচ্ছে দাশকুলি মধুর বাক্স (অ্যাপিস সেরেনা) স্থাপনের মাধ্যমে। মধু চাষিদের বাড়িতে ২-৩টি করে মধু উৎপাদনকারী কাঠের বাক্স স্থাপন করা আছে। এসব বাক্স থেকে বছরে ৩ থেকে ৪ বার মধু সংগ্রহ করেন চাষিরা। স্বল্প খরচে এক একটি বাক্স থেকে ২৫-৩০ কেজি মধু আহরণ করা যায়। বছরে সংগ্রহীত মধু বিক্রি করে চাষিরা জনপ্রতি ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা আয় করছেন। সে হিসাবে বছরে প্রায় ৫০ হাজার কেজি মধু উৎপাদন করছেন তারা।  যার বাজারমূল্য কোটি টাকা।

প্রথমে কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ছাড়াই নিজেদের প্রচেষ্টায় মধুচাষে সাফল্যের মুখ দেখায় এসব গ্রামের নারীরাও এখন নিজেদের জড়িয়ে নিয়েছেন এতে। তারাও এখন ব্যস্ত দিন কাটান। শুধু তাই নয়, নিজেদের ঐক্যবদ্ধ রাখতে তারা গড়ে তুলেছেন ‘কমলগঞ্জ উপজেলা মধুচাষী উন্নয়ন সমিতি’ নামে একটি সংগঠন।

কমলগঞ্জে মধু চাষী উন্নয়ন সমিতির সভাপতি শিক্ষক আলতাফ মাহমুদ বাবুল বলেন, এলাকায় মধু চাষের এমন নীরব বিপ্লব ঘটছে। বর্তমানে বিসিক ও কয়েকটি ব্যাংকের মাধ্যমে সরকারি সহযোগিতা পাচ্ছেন মধুচাষীরা। এই এলাকায় মধু চাষের একটি উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। পুঁজির ব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ ও সরিষার চাষাবাদ বৃদ্ধি করা হলে মধু চাষে আরো বিপ্লব হবে বলে দাবি করেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা