kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৪ রবিউস সানি     

কসবায় ট্রেন দুর্ঘটনা

বাবা-মাকে হাসপাতালে রেখে শেষ শয্যা হলো আদিবার

শাহ ফখরুজ্জামান, হবিগঞ্জ   

১৩ নভেম্বর, ২০১৯ ১৮:৫৭ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বাবা-মাকে হাসপাতালে রেখে শেষ শয্যা হলো আদিবার

শিশু আদিবার এই ছবি এখন শুধুই ছবি।

পৃথিবীতে যেকোনো শিশুর জন্য আপন ও নিরাপদ স্থান তার বাবা ও মা। সোমবার দিবাগত রাতে এমন নিরাপত্তার মধ্যেই শিশু আদিবা উদয়ন ট্রেনে করে চট্টগ্রাম যাচ্ছিল। হঠাৎ রাত পৌনে ৩টার দিকে সিলেট-চট্টগ্রাম পথের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার মন্দভাগ রেলওয়ে স্টেশনের ক্রসিংয়ে আন্তঃনগর উদয়ন এক্সপ্রেস ও তূর্ণা নিশীথার মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে শিশু আদিবা আক্তার ছোঁয়াসহ অনেকেই নিহত হন।

ছোঁয়ার নিথর দেহ কয়েক ঘণ্টার জন্য ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হাসপাতালের লাশ ঘরে। আর ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন তার বাবা সোহেল মিয়া ও মা নাজমা বেগম। তার গ্রামের বাড়ি বানিয়াচং উপজেলার বড় বাজার এলাকায়। জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করে ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ নিয়ে আসা হয় ছোঁয়ার নানা বাড়ি সৈদারতুলা এলাকায়। বরই পাতার গরমজলে গোসল করানো পর মঙ্গলবার রাত প্রায় ৯ টায় পারিবারিক কবর স্থানে তার লাশ দাফন করা হয়। কিন্তু গুরুতর অসুস্থ্য থাকায় চিরনিদ্রায় যাওয়া আদরের ছোঁয়ার সাথে শেষ দেখা হলো না তার বাবা-মায়ের।

জানাজায় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা চেয়ারম্যান আবুল কাশেমসহ হাজার হাজার মানুষ। সকলের চোখে মুখেই ছিল বিষাদের ছায়া। এ বিষয়টি যেন সবার মনে বেশি আঘাত করেছে। ছোঁয়ার মৃত্যুতে হবিগঞ্জজুড়ে শোকের ছায়া নেমেছে। পঙ্গু হাসপাতালে থেকে জানা গেছে, সাধ্যমতো তাদের (নাজমা বেগম ও সোহেল মিয়া) চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ছোঁয়ার বাবা-মা হাত-পাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত রয়েছে।

মামা মো. জামাল মিয়া বলেন, ছোঁয়ার বাবা সোহেল মিয়া ও মা নাজমা বেগমের সঙ্গে উদয়ন এক্সপ্রেসে করে চট্টগ্রাম যাচ্ছিল। পথে দুর্ঘটনা হলো। তাদের আর গন্তব্যে যাওয়া হলো না। ছোঁয়াকে যেত হলো এ পৃথিবী ছেড়ে। আর তাঁর বাবা-মার অবস্থা খারাপ হওয়ায় তাদের পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এসব দৃশ্য মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। অবশেষে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করে ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ নিয়ে এসে নিজ হাতে ছোঁয়াকে দাফন করেছি।

এদিকে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার বহুলা গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা আলমগীর আলম তার একমাত্র ছেলে সন্তান ইয়াসিনকে কোলে বসিয়ে যাচ্ছিলেন চট্টগ্রাম। দুর্ঘটনার সময় তিনি ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হন। যখন জ্ঞান ফিরে তখন তিনি খুজতে থাকেন আদরের সন্তান ইয়াসিনকে। উদ্ধারকারীরা আলমগীরকে নিতে চাইলেও ক্ষত-বিক্ষত শরীর নিয়ে তিনি খুঁজতে থাকেন ইয়াসিনকে। দুই ঘণ্টা পর উদ্ধারকারীরা ইয়াসিন হাসপাতালে আছে বললে তিনি উদ্ধারকারীদের সাথে যান হাসপাতালে। পরে যখন জানতে পারেন ইয়াসিন আর নেই। তখন ক্ষত-বিক্ষত শরীর নিয়ে আর বুকে পাথর বেধে তিনি হাসপাতাল থেকে চলে আসেন ছেলেকে দাফন করতে।

ইয়াসিন ছিল বহুলা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণির ছাত্র। সেই স্কুলের সামনেই হাজার হাজার জনতার উপস্থিতিতে হয় জানাজা। পরে বাড়ির পাশেই দাফন করা হয় ইয়াসিনকে। আলমগীর আলম এই মৃত্যুকে মেনে নিতে পারেনি। সে কান্না করে বলে এর ছেয়ে আমার নিজের মৃত্যু হলে ভালো হতো। আমি এক বছরে বাবাকেও হারালাম। আর এখন আমার একমাত্র ছেলেকে নিজ হাতে দাফন করলাম। আমার ইচ্ছা ছিল আমার ছেলে বড় হয়ে মাওলানা হবে এবং আমার জানাজা পড়বে।

ইয়াসিনের একমাত্র বোন ঝিনুক বহুলা এডভোকেট মো. আবু জাহির উচ্চ বিদ্যালয়ের জেএসসি পরীক্ষার্থী। বুধবার ছিল বিজ্ঞান পরীক্ষা। একমাত্র ভাই ও খেলার সাথির মৃত্যুতে সে সারারাত পড়া লেখা না করে কান্নাকাটি করে। বুধবার সকাল তাকে পরীক্ষায় যাওয়ার কথা বললে সে পরীক্ষা দিতে অপারগতা প্রকাশ করে। পরে তার স্বজনরা অনেক বুঝিয়ে রাজি করায়। কিন্তু যখন ঘর থেকে বের হয় তখন বাড়ির সামনেই চোখে পড়ে ভাই ইয়াসিনের কবর। তখন আবারও সে কেঁদে উঠে। পরে অতিকষ্টে সে পরীক্ষা দেয়। অ্যাডভোকেট মো. আবু জাহির উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আসাদুজ্জামান জানান, বুধবার ছিল বিজ্ঞান পরীক্ষা। ঝিনুক সেই পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। 

এদিকে ইয়াসিনের স্কুল বহুলা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষকরা বুধবার ছুটে যান তার বাড়িতে। তখন বাড়িতে ইয়াসিনের জন্য দোয়ার আয়োজন করা হয়েছিল। শিক্ষকদের দেখে ইয়াসিনের মা বাবা আবারও কান্নায় ভেঙে পড়েন।

হবিগঞ্জের নিহত আদিবা ও ইয়াসিনসহ আট জনেরই দাফন সম্পন্ন হয়েছে। জেলা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি আলী মো. ইউসুফ এর দাফন মঙ্গলবার বিকেলে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার আনোয়ারপুর গ্রামে সম্মন্ন হয়। চুনারুঘাট উপজেলার উলুকান্দি গ্রামের ফটিক মিয়ার ছেলে রুবেল মিয়া (২০) এর দাফনও হয় ওই দিন বিকেলে। ওই উপজেলার পাকুড়িয়া গ্রামের আবুল হাসিম মিয়ার ছেলে সুজন মিয়া (৩০) ও তার খালা রাজারবাজার গ্রামে কুলসুমা বেগম (৪৫) এর দাফন সম্পন্ন হয় মঙ্গলবার সন্ধ্যায়।

বানিয়াচং উপজেলার মুরাদপুর গ্রামের আইয়ূব হোসেনের ছেলে আল-আমিন (৩৫) এর দাফন হয় মঙ্গলবার রাতে। হবিগঞ্জ সদর উপজেলার সৈয়দাবাদ গ্রামের আজমত উল্লার পুত্র রিপন মিয়ার দাফন সম্পন্ন হয় মঙ্গলবার রাতে।

আহত ২৪ জন আছেন বিভিন্ন হাসপাতালে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সকল নিহতের পরিবারকে প্রদান করা হয়েছে ১৫ হাজার করে টাকা। আহতদেরকেও চিকিৎসা সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।

রেল যাত্রীদের মাঝে আতঙ্ক

হবিগঞ্জের সাথে চট্টগ্রামের সড়ক যোগাযোগ তেমন ভালো না হওয়ায় ট্রেন এর উপর নির্ভর করেন সবাই। এই লাইনে চলাচলকারী আন্তঃনগর পাহাড়ীকা ও উদয়ন এক্সপ্রেসে বরাদ্ধকৃত আসনের কয়েকগুন যাত্রী দাড়ানো টিকেটে ভ্রমণ করেন। দুর্ঘটনায় কবলিত ট্রেনের যে বগিগুলো বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার অধিকাংশ যাত্রী ছিলেন হবিগঞ্জ জেলার। হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ রেলস্টেশন থেকেই এ সকল যাত্রীরা ট্রেনে উঠেছিলেন। হবিগঞ্জের অধিকাংশ যাত্রী ছিলেন ঝ বগিতে। এই বগির যাত্রীরাই বেশী হতাহত হয়েছে।

শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার সাইফুল ইসলাম জানান, শায়েস্তাগঞ্জ থেকে কুমিল্লায় ৫ জন, ফেনীতে ৫ জন, লাকশাম এর ৫ জন ও চট্টগ্রাম গন্তব্যে ৩৫ জন টিকেট কাটেন। এর বাহিরে দাঁড়ানো টিকেট ছিল ৫০টি। এই স্টেশন থেকে ১শ যাত্রী ট্রেনে উঠেন। কিন্তু দুর্ঘটনায় হবিগঞ্জের বেশী লোক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় হবিগঞ্জ জেলায় ট্রেনযাত্রীদের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে। রেল জংশনে কমে গেছে মানুষের উপস্থিতি। দুর্ঘটনার খবরে অনেকেই ফিরে গেছেন স্টেশন থেকে।

শায়েস্তাগঞ্জ রেলজংশনের মাস্টার সাইফুল ইসলাম জানান, দুর্ঘটনার পর থেকে ট্রেনের শিডিউলে বড় বিপর্যয় না ঘটলেও যাত্রী সংখ্যা অনেক কমে গেছে। অন্যান্য দিনের তুলনায় টিকিট ক্রেতাদের ভিড় নেই। তবে দুয়েকদিনের মধ্যে যাত্রীদের আতঙ্ক দূর হয়ে যাবে বলেও মনে করছেন তিনি।

শায়েস্তাগঞ্জে ট্রেনে কাটা যাত্রীকেও দেখানো হয়েছে তালিকায়

হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম বড়চর নামক স্থানে ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে নজরুল ইসলাম (১৬) নামে এক কিশোর নিহত হলেও তার নাম চলে এসেছে কসবা ট্রেন দুর্ঘটনার তালিকায়। কসবায় দুর্ঘটনায় হবিগঞ্জের ৮ জন নিহত হলেও জেলা প্রশাসনের তালিকায় চলে এসেছে নজরুল ইসলামের নাম। নজরুল হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার ইসলামপুর গ্রামের হারুন মিয়ার ছেলে।

শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ শফিকুল ইসলাম খান জানান, মঙ্গলবার সকালে নজরুলের মরদেহ উদ্ধার করা হয় শায়েস্তাগঞ্জের পশ্চিমবড়চর এলাকা থেকে। সম্ভবত জালালাবাদ মেইল ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে সে নিহত হয়।

নজরুল ইসলাম মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে সিএনজি-অটোরিক্সা চালাত বলে জানা গেছে। ট্রেন লাইমের মধ্যে দ্বিখণ্ডিত অবস্থায় লাশ উদ্ধার করার সময় তার জন্মনিবন্ধন পাওয়া যায়। 

কসবা ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারকে সরকারিভাবে ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহায়তা করা হবে বলে প্রচার হলে নজরুলের নাম কেই তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করেছে বলে মনে করছেন অনেকেই। এ ব্যাপারে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে বলে জানিয়েছেন হবিগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সার্বিক অমিতাভ পরাগ তালুকদার।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা