kalerkantho

বুধবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৩ রবিউস সানি     

ছাত্রলীগ নেতা সুদীপ্ত হত্যা মামলা

‘বীরদর্পে’ আদালতে আ. লীগ নেতা ‘বড়ভাই’ মাসুম

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম   

১৩ নভেম্বর, ২০১৯ ০২:৫৭ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘বীরদর্পে’ আদালতে আ. লীগ নেতা ‘বড়ভাই’ মাসুম

চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগ নেতা সুদীপ্ত হত্যার ‘নির্দেশদাতা’ হিসেবে পরিচিত আওয়ামী লীগ নেতা দিদারুল আলম মাসুম গতকাল মঙ্গলবার সদলবলে ‘বীরদর্পে’ হাজির হন চট্টগ্রামের আদালতে। ওই সময় হ্যান্ডমাইক নিয়ে সমর্থকরা স্লোগান দেয় মাসুমকে ঘিরে। চট্টগ্রামের আদালত অঙ্গনে মাসুমের এমন শোডাউন দেখে আইনজীবীদের মধ্যেই নানা গুঞ্জন শুরু হয়। আগে পিবিআই যেদিন তাঁকে গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করেছিল, সেদিন ‘স্লোগান’ দেওয়ার সাহস দেখায়নি নগর পুলিশের আগের তালিকাভুক্ত এই সন্ত্রাসীর শীর্ষ অনুগতরা।

গতকাল আদালতে আত্মসমর্পণ করতে যাওয়ার আগে চট্টগ্রামের একটি রেস্টুরেন্টে কয়েকজন আইনজীবীর সঙ্গে ভোজসভা, সমর্থকদের আদালত অঙ্গনে জড়ো করা এবং আদালতকক্ষের বারান্দায় হ্যান্ডমাইকে স্লোগান দিয়ে মিছিল করার ঘটনাকে ‘ক্ষমতার দাম্ভিকতা ও অশুভ ইঙ্গিত’ বলেই মনে করছেন নিহত সুদীপ্ত বিশ্বাসের বাবা মেঘনাথ বিশ্বাস। 

গতকাল সকাল ৯টার পর থেকেই দিদারুল আলম মাসুমের অনুসারীদের চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আদালত ভবনের সামনে জড়ো হতে দেখা গেছে। ১০টার পর আদালতে নিয়মিত বিচারপ্রার্থী ছাড়াও দলীয় লোকজনের ভিড় বাড়তে থাকে। এরই একপর্যায়ে গাড়ি নিয়ে আদালত অঙ্গনে পৌঁছেন দিদারুল আলম মাসুম। মুহূর্তেই তাঁকে ঘিরে ধরে সর্মকরা। সঙ্গে বেশ কয়েকজন আইনজীবীও ছিলেন। ওই সময় নেতাকর্মীরা মাসুমের পক্ষে স্লোগান দেওয়া শুরু করেন। তখন আদালত ভবনের দোতলায় এজলাসের সামনেও হ্যান্ডমাইক নিয়ে প্রচণ্ড ভিড় তৈরি করে মিছিল করতে থাকেন নেতাকর্মীরা। মাসুম আত্মসমর্পণ করেন মুখ্য মহানগর হাকিম ওসমান গনির আদালতে। 

মাসুমের অনুসারীদের এমন ভিড়, ঠেলাঠেলি ও হুড়াহুড়ির মধ্যেই পুরো আদালত অঙ্গনে আতঙ্ক তৈরি হয়। ওই সময় আদালত পুলিশ ছাড়াও কোতোয়ালি থানা পুলিশের একটি দল সেখানে উপস্থিত ছিল। 

আদালত অঙ্গনে হ্যান্ডমাইক নিয়ে স্লোগান দেওয়ার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) অতিরিক্ত উপকমিশনার (প্রসিকিউশন) মোহাম্মদ কামরুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দিদারুল আলম মাসুম মহানগর হাকিম আদালতে আত্মসমর্পণ করতে এসেছিলেন। আদালত ভবনের নিচে হ্যান্ডমাইকে স্লোগান দিয়েছে। দোতলায় এজলাসের সামনে হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করতে দেওয়া হয়নি। কারণ এজলাসের সামনে উচ্চ শব্দে স্লোগান দেওয়া বেআইনি।’ আদালতের সামনের বারান্দায় হ্যান্ডমাইক ব্যবহূত হওয়ার পরও আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি নিজেই সেখানে উপস্থিত ছিলাম। হ্যান্ডমাইক হয়তো হাতে ছিল, দোতলায় ব্যবহূত হওয়ার দৃশ্য আমার নজরে আসেনি।’ 

নিহত সুদীপ্তর বাবা মেঘনাথ বিশ্বাস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আসামি জামিন পাওয়ার পর হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়, আমি নিরাপত্তাহীনতা বোধ করি। এরপর আমি উচ্চ আদালতে আপিল করি। আপিল শুনানির পর আদালত জামিন আদেশ বাতিল করে ১৩ নভেম্বরের মধ্যে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশনা দেন। শুনেছি, নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের আগে তিনি লালখান বাজার এলাকার একটি অভিজাত রেস্টুরেন্টে চট্টগ্রাম বারের অনেক আইনজীবীকে নিয়ে বিশেষ বৈঠক করেছেন। অথচ অর্থাভাবে আমি একজন আইনজীবীও নিয়োগ করতে পারিনি। আবার আত্মসমর্পণের দিন দেখলাম, হ্যান্ডমাইক নিয়ে বীরদর্পে স্লোগান দিচ্ছে এজলাসের সামনেই।’ তিনি বলেন, ‘ক্ষমতাবানদের দাপটে আমার মতো নিরীহ শিক্ষক সন্তান হত্যার বিচার পাব কি না সেই শঙ্কায় থাকি সর্বক্ষণ।’

আসামিপক্ষের আইনজীবী কাজী সানোয়ার আহমেদ লাভলু বলেন, ‘দিদারুল আলম মাসুম হাইকোর্ট থেকে ছয় মাসের জামিন পেয়েছিলেন। কিন্তু বাদীপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আপিল বিভাগ সেই জামিন বাতিল করে ১৩ নভেম্বরের মধ্যে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের আদেশ দেন। উচ্চ আদালতের আদেশ মেনে তিনি মঙ্গলবার আত্মসমর্পণ করেন। আমরা আদালতে বলেছি, আসামির হার্টে তিনটি রিং পরানো আছে। তাঁর চিকিত্সার প্রয়োজনীয়তার কথা আদালতে বলেছি। আদালত আসামিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন এবং চিকিত্সার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন।’

২০১৭ সালের ৬ অক্টোবর সকালে নগরীর সদরঘাট থানার দক্ষিণ নালাপাড়ার বাসা থেকে ডেকে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল নগর ছাত্রলীগের সহসম্পাদক সুদীপ্ত বিশ্বাসকে। ওই ঘটনায় সুদীপ্তর বাবা মেঘনাথ বিশ্বাস বাদী হয়ে সদরঘাট থানায় অচেনা সাত-আটজনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেছিলেন। থানা পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের পর তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই। পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা সন্তোষ চাকমার তদন্তে মামলায় গতি ফেরে এবং প্রকৃত আসামিরা গ্রেপ্তার হতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় কয়েকজন আসামি গ্রেপ্তার, অডিও ক্লিপ উদ্ধার-পরবর্তী বেরিয়ে আসে সুদীপ্তকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন লালখান বাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম মাসুম। তিনি ২০১২ সালের আগে পর্যন্ত নগর পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ছিলেন। 

তদন্ত পর্যায়ে গত ৪ আগস্ট ঢাকা থেকে মাসুমকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। পরে ১৫ সেপ্টেম্বর উচ্চ আদালত থেকে জামিন পান তিনি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা