kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৪ রবিউস সানি     

হাতিয়া গণহত্যা দিবস কাল

অনাহারে-অর্ধাহারে জীবন কাটে উলিপুরের শহীদ জায়াদের

রোকনুজ্জামান মানু, উলিপুর (কুড়িগ্রাম)   

১২ নভেম্বর, ২০১৯ ১৮:৪০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



অনাহারে-অর্ধাহারে জীবন কাটে উলিপুরের শহীদ জায়াদের

নুতুন নাইওর আসছং। সকালে উঠিয়া আগনে সামটিবের লাগছং। হঠাৎ করি ম্যালেটারি আসছে। ছাওয়া পোয়া নিয়ে হামরা সবাই পলাইছি। পরে ম্যালেটারি হামাক টানি হেছরি খুঁজি বাইর করি আনছে। চোখের সামনত তিনজন দেওর ও মোর স্বামীক গুলি করি মারি ফ্যালাইল। পরে সবাইকে ঘরের ভিতর ঢুকি দিয়ে ঘর বাড়ি আগুন দিয়ে পুড়ি দেইল। ওমার হাতে পায়ে ধরিয়েও মোর স্বামীক বাঁচপার পাওং নাই। ম্যালেটারি যাবার পরে হাড্ডিগুলে মাটিত পোতে থুচি। 

কথাগুলো বলতে বলতে অঝোরে কাঁদছিলেন হাতিয়া ইউনিয়নের নীলকণ্ঠ গ্রামের সত্তর বছর বয়সী জুলেফ বেওয়া। এক ছেলে তিন মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। বর্তমানে অন্যের বাড়িতে আশ্রয় থেকে ভিক্ষা করে জীবন চলে তাঁর।

৭১-র গণহত্যায় নিহত আব্দুল জব্বারের স্ত্রী কজভান বেওয়া (৭৫) কালের কণ্ঠকে বলেন, বাবারে সেদিনের কথা মনত তুললে বুক ফাটি যায়। কিভাবে সেদিন চোখের সামনত গুলি করি মোর চেংরা স্বামীক মারি ফ্যালাইল। অল্প বয়সে বিধুয়া হনু। ভিক্ষা করি ৪ বেটিক বিয়ে দিছং। কিভাবে যে দিনগুলে পার করনু আল্লাহ ছাড়া কাইও জানে না। বাড়িঘর জমি-জমা সউগ নদী ভাঙ্গি নিয়ে গেইল তাও অত কষ্ট পাওং নাই। কিন্তু ওই দিনের ঘটনা আজকেও ভুলবার পাং না। কাইও হামার কোনো খোঁজ খবর নেয় না বলেও আক্ষেপ করে জানান তিনি।

শুধু কজভান ও জুলেফ বেওয়া নয়। তাদের মতো মমিজন (৭৮), ছকিনা বেওয়া (৭৫), ময়জন (৭০) সহ অনেক শহীদ জায়ার জীবন কাটে অনাহারে-অর্ধাহারে। সব হারিয়ে এসব পরিবার অভাব অনটনে দুর্বিসহ দিনযাপন করছেন। ক্ষমতার পালা বদল হয়, কিন্তু তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না।

কাল ১৩ নভেম্বর কুড়িগ্রামের উলিপুরে 'হাতিয়া গণহত্যা দিবস'। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাক-হানাদার বাহিনী তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনীর সহযোগিতায় নিরীহ ৬৯৭ জন গ্রামবাসীকে গুলি করে হত্যা করে। সেদিন ২৩ রমজান শনিবার গ্রামের বেশীর ভাগ মানুষ সেহরির খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে, কেউ ঘুমানোর প্রস্তুতি নিশ্চিছিল। এরই মধ্যে ফজরের নামাজের আযান ধ্বনিত হচ্ছে মসজিদে মসজিদে। নামাজের প্রস্তুতি নিতে অজুও সেরে ফেলেছেন অনেকে। হঠাৎ পাকিস্তানি হায়েনার মর্টার সেল আর বন্দুকের অবিরাম গুলি বর্ষণে প্রকম্পিত হয়ে দাগারকুটি গ্রামসহ আশপাশের গ্রামগুলো। গ্রামগুলোর মানুষজন কিছু বুঝে উঠার আগেই পাকিস্তানি হায়েনা ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনী মিলে নিরীহ গ্রামের বাড়ি-ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়। এর সাথে চলতে থাকে লুটপাঠ ও নির্যাতন।

আকস্মিক এ পরিস্থিতিতে এলাকার নিরীহ মানুষজন উদ্ভ্রান্তের মতো এলোপাথাড়ি ছোটাছুটি শুরু করে। পাকিস্তানি বাহিনীর ছোড়া বৃষ্টির মতো গুলিতে মানুষজন জীবন বাঁচতে ব্রহ্মপুত্র নদসহ আশপাশের ধানক্ষেত ও ঝোপ-জঙ্গলে শুয়ে জীবন বাঁচানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে। কিন্তু অসহায় বৃদ্ধ আর শিশুদের আর্তচিৎকারে এলাকার আকাশ-বাতাস ক্রমেই ভারি হয়ে উঠে। এসব অসহায় গ্রামবাসীর জীবন বাঁচানোর চেষ্টা মূহুর্তেই যেন শেষ হয়ে যায়।

পাক-হানাদার বাহিনী আত্মগোপনে থাকা এসব মানুষগুলোকে ধরে নিয়ে দাঁগারকুটিতে জড়ো করে হাত-পা বেঁধে নির্দয়ভাবে গুলি করে হত্যা করে। তাদের এ নারকীয় হত্যাযজ্ঞ থেকে সেদিন বৃদ্ধ ও মায়ের কোলে ঘুমিয়ে থাকা শিশুটিও রক্ষা পায়নি। দিনব্যাপী চলে পাক-হানাদার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ ও অগ্নিসংযোগ। আগুনে পুড়ে ছাঁই হয়ে যায় হাতিয়া ইউনিয়নের অনন্তপুর, দাগারকুটি, হাতিয়া বকসি, রামখানা ও নয়াদাড়া গ্রামের শত শত ঘর-বাড়ি।

স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে জঘন্যতম নারকীয় এ হত্যাকাণ্ডের ইতিহাস জাতীয় পর্যায়ে তেমন গুরুত্ব না পেলেও উলিপুরের মানুষের কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে। আজও নিহত শহীদদের স্বজনরা খুঁজে ফেরেন তাদের আপনজনকে। দাঁগারকুটি গ্রামটিকে ঘিরে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করে এলাকার মানুষজন প্রতি বছর শহীদদের স্মরণ করেন। কিন্তু করালগ্রাসী ব্রহ্মপুত্র নদ দাগারকুটি গ্রামটি তার বুকে ধারন করে নিয়েছে। বর্তমানে অনন্তপুর বাজারের পশ্চিম দিকে নতুন করে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করে দিবসটি পালন করে আসছেন।

ধীরে ধীরে স্বাধীনতা যুদ্ধের এ নারকীয় হত্যাযজ্ঞ হয়তো মানুষের হৃদয় থেকে মুছে যাবে, কিন্তু শহীদের স্বজনরা তাদের আপনজনদের স্মরণ করবেন সারাজীবন নীরবে-নিভৃতে। শহীদ পরিবারগুলোর দাবি হাতিয়া দিবস জাতীয় পর্যায়ে যথাযোগ্য মর্যদায় পালনসহ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও পুনর্বাসন করা হোক। স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে জঘন্যতম নারকীয় এ হত্যাকাণ্ড আজ শুধুই স্মৃতি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা