kalerkantho

রবিবার । ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১০ রবিউস সানি ১৪৪১     

মাইকে ফুঁ দিয়ে কবিরাজি, তেল-পানি বাণিজ্য!

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি   

১২ নভেম্বর, ২০১৯ ০১:১৮ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মাইকে ফুঁ দিয়ে কবিরাজি, তেল-পানি বাণিজ্য!

কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার চরপলাশ গ্রামে ‘কথিত’ কবিরাজ সবুজ মিয়ার চিকিৎসা-সভা নিয়ে তোলপাড় চলছে জেলাজুড়ে। তেল ও পানি বেচে এ সভা থেকে আয়োজকদের অন্তত ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকার বাণিজ্য হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্থানীয় লোকজনের কেউ কেউ বলছে, বাণিজ্যের জন্যই আয়োজন করা হয় এই চিকিত্সা-সভা। তবে আয়োজকদের পক্ষ থেকে বিষয়টি অস্বীকার করা হয়েছে। গতকাল সোমবার সরেজমিনে চরপলাশ গ্রামে গিয়ে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

চরপলাশ গ্রামের এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কবিরাজের জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে এ বাণিজ্যের ছক সাজানো হয়। গত শনিবার এখানে অন্তত ৫০ থেকে ৬০ হাজার লোক বিভিন্ন রোগব্যাধি থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় সমবেত হয়। তাদের প্রায় সবাই আয়োজকদের বসানো দোকান থেকে পানি ও তেল কেনে। প্রতি বোতল পানি ২৫ টাকা এবং প্রতি শিশি তেল ৩০ টাকা করে বিক্রি হয়। এ হিসাবে কম করে হলেও ২৫ লাখ টাকা আয় হয়েছে আয়োজকদের। এ ছাড়া সমাবেশস্থলে আরো বিভিন্ন ধরনের দোকানপাট ছিল। এগুলোও আয়োজকদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। 

আরেকজন জানালেন, যেখানে সমাবেশ করা হয়েছে সেখানে স্থানীয় মঞ্জু মিয়ার কাঁচা-পাকা ধানের ক্ষেত ছিল। সেই ক্ষেত মালিককে ১০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দিয়ে আয়োজকরা কবিরাজের আসর বা কথিত চিকিৎসা-সভার আয়োজন করেন। আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, অর্ধশতাধিক প্রভাবশালী লোকের সমন্বয়ে গঠিত হয় এ আয়োজক কমিটি, যাদের বেশির ভাগই ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী। 

আয়োজকদের একজন সাবেক পুলিশ সদস্য চরপলাশ গ্রামের মো. সুমন। তিনি দাবি করেন, কোনো কমিটি নয়, স্থানীয় লোকজনের কবিরাজের বাড়িতে গিয়ে চিকিত্সা নিতে অসুবিধা হয় বিধায় এখানে এ আয়োজন করা হয়। তারা এই কবিরাজের ভক্ত। কবিরাজের পানিপড়া ও তেলপড়া ব্যবহারে অনেকে উপকৃত হয়েছে। এ কারণেই এত লোকের সমাগম। তিনি বলেন, কবিরাজ চিকিৎসার জন্য কোনো টাকা-পয়সা নেন না। তিনি নিজের খরচে বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে লোকজনের সেবা করেন। যারা উনার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করছে তারা মূলত সাধারণ মানুষের ভালো চায় না। 

অন্যদিকে এ ধরনের চিকিৎসার আয়োজনকে সচেতন ব্যক্তিরা কুসংস্কার আখ্যা দিয়েছেন। স্থানীয় সুখিয়া গ্রামের বাসিন্দা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইমদাদুল হক হূদয় বলেন, ‘আমরা যখন মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠাচ্ছি, যখন জ্ঞান-বিজ্ঞানে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে তখন এ ধরনের কুসংস্কারের চর্চা হলে দেশ ও সমাজ পিছিয়ে যাবে।’ 

একই গ্রামের হলুদ মিয়া জানালেন, মানুষের কথা শুনে তিনিও সেখানে গিয়েছিলেন। পানি ও তেলপড়া এনেছিলেন। ব্যবহারও করেছিলেন; কিন্তু কী উপকার হলো কিছু বুঝতে পারছেন না। 

কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অজ্ঞতা ও কুসংস্কারে বশবর্তী হয়ে লোকজন চরপলাশে গিয়েছিল। এ ধরনের চিকিত্সা পদ্ধতিকে নিরুত্সাহ করতে হবে।

প্রসঙ্গত, গত শনিবার কথিত কবিরাজ সবুজ মিয়ার চিকিৎসা নিতে ৫০ থেকে ৬০ হাজার মানুষ সমবেত হয়। বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে বিভিন্ন জেলা ও আশপাশের এলাকা থেকে কবিরাজের একটু পানিপড়া ও তেলপড়া নিতে হাজির হয় তারা। সবাই পানি ও তেলের বোতল উঁচিয়ে ধরে আর কবিরাজ মাইকে ফুঁ দেন। রোগবালই থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় আগত লোকজন পানিপড়া ও তেলপড়া নিয়ে বাড়ি ফেরে। 

স্থানীয় লোকজন জানায়, তেলপড়া ও পানিপড়া নিতে আসা লোকজনের মধ্যে নারীদের সংখ্যাই বেশি ছিল। কথিত চিকিত্সা-সভার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে জেলাজুড়ে শুরু হয় নানা সমালোচনা। এলাকায় দেখা দেয় মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

তবে চারপলাশ গ্রামের অনেকে আবার ঝাড়ফুঁকে উপকৃত হয়েছে বলে দাবি করেছে। আর তারা বিশ্বাস থেকে সেখানে গিয়েছিল বলেও জানায়।

সবুজ মিয়া নামের ওই কবিরাজ ভালুকা উপজেলার রাজ্য ইউনিয়নের পায়লাবের প্রামের অধিবাসী। তিনি বনে কাঠ কেটে জীবিকা নির্বাহ করেন। স্বপ্নপ্রাপ্ত হয়ে এ ধরনের কবিরাজি করেন বলে তাঁর ভক্তরা জানিয়েছে। 

গত শনিবারের এই সমাবেশে উপজেলা চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম রেনু, সুখিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল হামিদ টিটুসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। এ ধরনের সমাবেশে জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতিও সমালোচিত হচ্ছে।

পাকুন্দিয়া থানার ওসি মো. মফিজুর রহমান বলেন, ‘একজন কবিরাজের আগমন উপলক্ষে এমন প্রস্তুতি আমাদের জানা ছিল না। জানার পরপরই আইন-শৃঙ্খলা ঠিক রাখতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পুলিশ ফোর্স পাঠানো হয়। তবে কবিরাজ মাইকে ফুঁ দেওয়ার পরপরই সবাই মাঠ ত্যাগ করে, কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা হয়নি।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা