kalerkantho

শনিবার । ২৩ নভেম্বর ২০১৯। ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

সরকারি নির্দেশনা অমান্য

অতিরিক্ত ক্লাসের নামে চলছে কোচিং বাণিজ্য

পার্থ সারথী দাস, ঠাকুরগাঁও   

৯ নভেম্বর, ২০১৯ ১৩:০৫ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অতিরিক্ত ক্লাসের নামে চলছে কোচিং বাণিজ্য

জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষার চলাকালীন সকল ধরনের কোচিং সেন্টার বন্ধের নির্দেশনা থাকলেও ঠাকুরগাঁওয়ে সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে বিভিন্ন সরকারি বিদ্যালয় চলছে রমরমা কোচিং বাণিজ্য। শিক্ষকদের দাবি কোচিং বন্ধের বিষয়ে প্রশাসনের কোনো নির্দেশ নেই। শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে কোচিং চালু রাখা হয়েছে। আর জেলা প্রশাসক বলছেন, সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে কোচিং চালু রাখলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। 

চলমান জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষার আগে ২০ অক্টোবর তারিখে ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঠাকুরগাঁওয়ে বিদ্যালয় প্রধান ও সংশ্লিষ্ট সকলকে নিয়ে একাধিকবার সভা করা হয়। সেই সাথে পরীক্ষা চলাকালীন সকল ধরনের কোচিং সেন্টার বন্ধের নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু প্রশাসনের এমন নির্দেশনা উপেক্ষা করে ঠাকুরগাঁওয়ে চলছে রমরমা কোচিং বাণিজ্য। সরকারি বিদ্যালয়গুলো এর বাইরে নয়, নিয়ম ভেঙে অতিরিক্ত ক্লাসের নামে চলছে অতিরিক্ত আয়।

কোচিং এ আসা বেশির ভাগ শিক্ষার্থী জানায়, জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষার কারণে স্কুলে কোচিংয়ে কিছুটা সময় পরিবর্তন হয়েছে, তবে কোচিং বন্ধ হয়নি। বিদ্যালয়ের ক্লাসে তেমন লেখাপড়া না হওয়ার কারণে কোচিং করছেন তারা। আবার অনেকে বলছে বিদ্যালয়ে নির্ধারিত ক্লাসে বুঝে ওঠার আগেই ঘণ্টা বেজে যায়। শিক্ষকরা না বুঝানোর কারণে কোচিং এ এসে তারা সেই শিক্ষকের কাছেই পুনরায় বেশি করে তা বুঝে নেয়।

সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীরা জানান, জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষার কারণে স্কুল বন্ধ রয়েছে, তবে স্কুল বন্ধ থাকলে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। কারণ স্কুলের কোচিং খোলা রয়েছে। সকালে জেএসসি পরীক্ষা থাকলে তারা স্কুলের ভেতরে বিকালে কোচিং ক্লাস করে। একই কথা জানায় সে ক্লাসের অন্যান্য শিক্ষার্থীরাও।
 
কোচিং করতে আসা চতুর্থ শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জানায়, স্কুল চলাকালীন ক্লাসে স্যাররা মাত্র ৪০ মিনিট সময় ক্লাস করান। এত অল্পসময়ে ক্লাস হওয়ার কারণে বেশির ভাগ শিক্ষার্থী শিক্ষকদের কথা বা পড়া তেমন বুঝে উঠতে পারে না। নির্ধারিত ৪০ মিনিট সময় পার হতে না হতেই ঘণ্টা পড়ে যায় এবং পরবর্তী অন্য বিষয়ের ক্লাস শুরু হয়। কিন্তু কোচিং ক্লাসে স্যারেরা আড়াই ঘণ্টা পর্যন্ত ক্লাস নেন এবং ভালোভাবে বুঝিয়ে দেন। একই কথা জানায় সে ক্লাসের অন্যান্য শিক্ষার্থীরাও।

একই বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা জানায়, স্কুলের তুলনায় কোচিংয়ে ভালো লেখাপড়া হয়। স্কুলে ভালো লেখাপড়া হয় না। এ ছাড়া বিদ্যালয়ে শিক্ষকরা সময়ের অভাবে সেভাবে ক্লাস নিতে পারে না, তবে কোচিং এ অনেক সময় দেন শিক্ষকরা। একই শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থী ফারজানা জানায়, স্কুলের শিক্ষক মোকসেদুল ও মোবারক স্যর তাদের কোচিং করায়। যেখানে তাদের ক্লাসের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ জন নিয়মিত পড়ছে। কোচিং এর জন্য স্যাররা প্রতি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে মাসে ১২০০ টাকা নেন।

সরকারি বিদ্যালয়ের ক্লাসে শিক্ষার্থীদের কোচিং করানোর দৃশ্য দেখা গেলেও এ বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা। সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক আলী হোসেন, আব্দুল আল মামুন, সিন্ধু দেব নাথ, নুরে আক্তার বানু জানান, তারা বিদ্যালয়ের ভিতরে অতিরিক্ত ক্লাস করাচ্ছেন। জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষার চলাকালীন ক্লাস বন্ধ রাখার সরকারিভাবে কোনো নির্দেশনা তাদের জাানা নেই। স্কুল থেকে সরকারি কোনো নোটিশ তারা পাননি। ক্লাসের ৬৫ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে সকলেই পিছিয়ে পড়া, অতিরিক্ত ক্লাস করছে এ বিষয়ে শিক্ষকরা কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

একই অবস্থা সদর উপজেলার সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের। সেখানেও জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষার চলাকালীন সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অতিরিক্ত ক্লাসের নামে কোচিং ব্যবসা চালাচ্ছেন বেশির ভাগ শিক্ষক। তবে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পিযুষ কান্তি রায় জানান, এ বিষয়ে তিনি অবগত নন। তবে নিয়ম না মেনে কেউ কোচিং করালে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অবিভাবক জানান, স্কুলগুলোতে লেখাপড়া তেমন হচ্ছে না, শিক্ষকরাও ঠিকমতো মনোযোগ সহকারে বাচ্চাদের ক্লাস নিচ্ছেন না। শিক্ষকরা নিজেরাই ছাত্র-ছাত্রীদের কোচিংমুখী করে তুলছেন। স্কুলের ক্লাস শিক্ষকের কাছে কোচিং না করালে পরীক্ষার ফলাফলে বাচ্চাদের নম্বর কম দেন। অনেকটা বাধ্য হয়েই বেশির ভাগ অবিভাবক তাদের সন্তানদের কোচিং এ পড়াচ্ছেন। শিক্ষকদের আচরণ এখন আর প্রকৃত শিক্ষকদের মতো নেই। সরকারি স্কুলে চাকরি করা বেশির ভাগ শিক্ষক এখন কোচিং ব্যবসা খুলে বসেছেন। যেখানে সরকারি বেতন বাদ দিয়েও শিক্ষকরা প্রতিমাসে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা অতিরিক্ত আয় করছেন। এ বিষয়ে কোনো অবিভাবক প্রতিবাদ করলে তাদের সন্তানদের ভিন্ন চোখে দেখেন শিক্ষকরা। তাই অবিলম্বে সরকারি স্কুলে কোচিং বন্ধ করা উচিত।

জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা খন্দকার মো. আলাউদ্দীন আল আজাদ জানান, জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষা চলাকালীন শুধু বিদ্যালয়ে নয়, বাইরের সকল ধরনের কোচিং বন্ধের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তারপরও যদি কেউ সরকারি স্কুলে অতিরক্ত ক্লাসের নামে কোচিং চালান সেটা খুবই দুঃখজনক।

জেলা প্রশাসক ড. কে এম কামরুজ্জামান সেলিম জানান, এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একজন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে অতিরিক্ত ক্লাসের নামে পরীক্ষা চলাকালীন গোপনে কেউ কোচিং চালালে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ঠাকুরগাঁও জেলায় এবার জেএসসি পরীক্ষায় ২৫টি কেন্দ্রে ২৬৩৩২ জন ও জেডিসিতে ৭টি কেন্দ্রে ৩২৩৯ জন শিক্ষার্থী অংশ নিচ্ছেন। 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা