kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

দীর্ঘ ১৫ বছর পর অনুষ্ঠিত হচ্ছে কুলাউড়া আ. লীগের সম্মেলন

পদ পদবীর আশায় ডজন খানেক নেতার দৌড়ঝাঁপ

কুলাউড়া (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি   

৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০৪:২০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



পদ পদবীর আশায় ডজন খানেক নেতার দৌড়ঝাঁপ

সকল জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে দীর্ঘ ১৫ বছর পর আগামী ১০ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন। সম্মেলনকে ঘিরে সকল প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। সম্মেলনকে ঘিরে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে সমগ্র উপজেলা জুড়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মাঝে। কাউন্সিলের মাধ্যমে দলের নেতাকর্মীরা নতুন নেতৃত্বের প্রত্যাশা করছেন। তবে নবীন ও প্রবীণের সমন্বয়ে নতুন কমিটি গঠিত হবে এমন আশা করছেন দলের বয়োজ্যেষ্ঠ নেতারা।

অন্যদিকে দীর্ঘ ১৫ বছর পর উপজেলা আওয়ামী লীগের এই সম্মেলন হওয়ায় নেতাকর্মীদের প্রাণচাঞ্চল্য অনেকটা বেড়ে গেছে। ইতিমধ্যেই নিজের পছন্দের প্রার্থীদের পক্ষে উপজেলা জুড়ে বিলবোর্ড ও ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে। শহরে ও তৃণমূলের হাটবাজারে সম্মেলনের আসা সম্ভাব্য অতিথিদের পোস্টার ব্যাপকভাবে সাঁটানো হচ্ছে। অতিথিদের সম্মানে বেশ কয়েকটি তোরণ ও গেট নির্মাণের কাজ শুরু হচ্ছে। সম্মেলন সফল করতে প্রচারনার কাজ চলছে তোড়জোড়ে। পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে প্রতিদিন মিছিল মিটিং হচ্ছে শহরে ও বিভিন্ন ইউনিয়নে।

কারা আসছেন কুলাউড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে এ প্রশ্নের জবাব মিলবে সম্মেলনে। সমঝোতা না ভোটে নেতা নির্বাচিত করা হবে এ নিয়েও রয়েছে আলোচনা। অনেকে আলোচনার মাধ্যমে কমিটির পক্ষে মত দিলেও কেউ কেউ কাউন্সিলরদের প্রত্যক্ষ ভোটে কমিটি হওয়ার পক্ষে মত দিচ্ছেন। আবার অনেকে সমঝোতার মাধ্যমে নেতৃত্বে আসার জন্যও তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন। সম্মেলনকে সামনে রেখে কুলাউড়া আ. লীগের নেতাকর্মীরা পদ পদবী পেতে লবিং, দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। গত ২৪ অক্টোবর পৌরসভা হলরুমে বর্ধিত সভায় সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে চাঙ্গা হয়ে উঠছে আওয়ামী রাজনীতি।

এর আগে সর্বশেষ ২০০৪ সালে ৭১ সদস্য বিশিষ্ট কুলাউড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটি গঠন করা হয়। এরপর কমিটির অনেক দায়িত্বশীল পদের লোকজন মারা গেছেন। আবার অনেকে বউ বাচ্চা নিয়ে প্রবাসে গেড়েছেন স্থায়ী নিবাস। ফলে বিগত কমিটির সিংহভাগ নেতাদের কোনো অস্তিত্ব নেই। এর মধ্যে দলের বয়ে গেছে অনেক দৌড়ঝাঁপটা। একটা সময় দলীয় কোন্দলে বিপর্যস্ত ছিল দলের অবস্থা। সমস্ত প্রতিকূলতা কাটিয়ে আওয়ামী লীগ যেন নতুন করে জেগেছে। সর্বত্রই সাজ সাজ রব। আলোচনা সমালোচনার ঝড় বইছে কারা আসছেন নতুন নেতৃত্বে। 

অনেকেই মনে করছেন দলকে যারা সুসংগঠিত করে কাজ করেছেন তাদের কে নেতৃত্বের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হক। দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী আছে আবার প্রার্থী নেই এমন খেলা চলছে সর্বত্র। নেতাদের জিজ্ঞেস করলে বলেন, দলের কাউন্সিলররা এবং জেলা ও কেন্দ্র যে দায়িত্ব দেবে, সেই দায়িত্ব পালন করব। এমন প্রত্যয়দিপ্ত কথা এর আগে বললে দল আরো সুসংগঠিত হতো বলে তৃণমুল নেতাকর্মীরা জানান।

কুলাউড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনের তারিখ ঘোষণার পরপরই ডজন খানেক পদ প্রত্যাশীরা শীর্ষ নেতাদের আশীর্বাদ পেতে জোর লবিং করে যাচ্ছেন। পাশাপাশি তৃণমূল ও কাউন্সিলরদের সমর্থন আদায়ের প্রাণপণ চেষ্টা করছেন।

সবচেয়ে বেশি সোচ্চার হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক। পছন্দের প্রার্থীর ছবি দিয়ে সভাপতি কিংবা সাধারণ সম্পাদক পদে দেখতে চাই বলে প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছেন। সভাপতি পদে বর্তমান সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মতিন, সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম রেনু, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কুলাউড়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এ কে এম সফি আহমদ সলমান রয়েছেন সর্বত্র আলোচনায়। এর আগে একেএম সফি আহমদ সলমান কাদিপুর ইউনিয়ন পরিষদে তিন বার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন এবং বিগত পৌরসভা নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

সাধারণ সম্পাদক পদে উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আমেরিকা প্রবাসী আব্দুল মুক্তাদির তোফায়েল, বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক ফজলু, কেন্দ্রীয় কৃষক লীগ নেতা শফিউল আলম শফি, সাবেক কুলাউড়া উপজেলা চেয়ারম্যান ও দলের যুব বিষয়ক সম্পাদক আ স ম কামরুল ইসলাম, উপজেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক সিএম জয়নাল আবেদীন, উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি ও সাবেক ছাত্রনেতা বদরুল ইসলাম বদর, উপজেলা শ্রমিক লীগের যুগ্ম আহবায়ক সিপার উদ্দিন আহমদ, পৃথিমপাশা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক ছাত্রনেতা নবাব আলী সাজ্জাদ খান রয়েছেন আলোচনায়। 

এক সময় আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাটি ছিলো কুলাউড়া। কিন্তু প্রায় সাড়ে তিন বছর থেকে কুলাউড়ায় আওয়ামী লীগের শত্রু আওয়ামী লীগ হয়ে দাঁড়ায়। যার শুরু হয়েছিল বিগত পৌরসভা নির্বাচন এর মাধ্যমে। পৌরসভা নির্বাচনে উপজেলা আওয়ামী লীগের একপক্ষ নৌকা প্রতীকের জন্য মনোনীত করেছিল উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এ কে এম সফি আহমদ সলমানকে। অপর পক্ষ উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য শফি আলম ইউনুসকে মনোনীত করে কেন্দ্রে নাম পাঠালেও পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নৌকা প্রতীক তুলে দেন উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এ কে এম সফি আহমদ সলমানের হাতে। অপর পক্ষ নেত্রীর সিদ্ধান্ত মেনে না নিয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য শফি আলম ইউনুছের পক্ষ নিয়ে নৌকা প্রতীকের পরাজয় ঘটায় স্বতন্ত্র প্রার্থীর বিজয়ের মধ্য দিয়ে।

সেখান থেকে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায় কুলাউড়া উপজেলা আওয়ামী লীগ এবং আওয়ামী লীগের সকল সহযোগী সংগঠন। সেই থেকে একাংশের নেতৃত্ব দেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম রেনু। অপরাংশের নেতৃত্ব দেন উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এ কে এম সফি আহমদ সলমান।

দুই ভাগে বিভক্ত উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের কারণে বিগত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অনেক ত্যাগী এবং নিবেদিত আওয়ামী পরিবারের সন্তান নৌকা প্রতীক থেকে বঞ্চিত হন। যেটা মেনে নেয়নি তৃণমূল পর্যায়ের আওয়ামী পরিবারের মানুষ। যার ফলে নৌকা প্রতীকের ভরাডুবি হয়। ১৩টি ইউনিয়নের মধ্যে মাত্র ৪টি ইউনিয়নে নৌকা প্রতীক বিজয়ী হয়।

সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচন যেখানে উভয় গ্রুপের ডজল খানেক প্রার্থী নৌকা প্রতীকের জন্য লবিং শুরু করেন। যার কারণে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপজেলা আওয়ামী লীগের উভয় গ্রুপকে ব্যতিরেকে কুলাউড়ায় নৌকা প্রতীককে বিজয়ী করার জন্য মহাজোটের শরীক বিকল্প ধারার এম এম শাহীন এর হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে নৌকা প্রতীক তুলে দিয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগকে নির্দেশ পাঠালেন বিভক্ত উপজেলা আওয়ামী লীগ এক হয়ে নৌকা প্রতীককে যেন বিজয়ী করেন।

নৌকা প্রতীককে বিজয়ী করার জন্য আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ মহল এর চেষ্টায় দীর্ঘদিন থেকে বিভক্ত উপজেলা আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপকে এক করা হয়। কিন্তু আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ভেতরে ভেতরে আবারো শুরু হয় বিরোধ। সেই বিরোধের জের ধরে আবারো দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায় কুলাউড়া উপজেলা আওয়ামী লীগ। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী কোনো গ্রুপের না হয়ায় বিভক্ত হলেও নৌকা প্রতীককে বিজয়ী করার জন্য দিনরাত পরিশ্রম করেও শেষ রক্ষা সম্ভব হয়নি। উপজেলা আওয়ামী লীগের এই বিরোধের সুবাদে সুযোগ নেয় বিরোধী পক্ষ। জাতীয় নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে এমপি নির্বাচিত হোন সাবেক এমপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ।

এর পর গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচন নৌকা প্রতীক পেলেন উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান উপজেলা আওয়ামী লীগের যুব বিষয়ক সম্পাদক আ স ম কামরুল ইসলাম। কিন্তু আওয়ামী লীগ মনোনীত মহাজোট শরীক দল ছাড়া বাকি দল গুলো নির্বাচন বর্জন করায় আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী মহল নির্বাচনকে উৎসব মুখর করতে নৌকা প্রতীকের পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী অংশ নেয়ার ব্যাপারে উন্মুক্ত করে দেওয়ায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিপুল ভোটে বিজয়ী হোন উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এ কে এম সফি আহমদ সলমান। নৌকার প্রার্থী কামরুল ইসলাম স্বতন্ত্র প্রার্থী সফি আহমদ সলমানের অর্ধেক ভোটও পাননি।

উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এ কে এম সফি আহমদ সলমান জানান, তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের নিয়ে দলকে আমি সুসংগঠিত করেছি। দলের কেন্দ্রীয় ও জেলার নেতৃবৃন্দ কাউন্সিলে আমাকে সভাপতি হিসেবে মনোনীত করবেন এটা আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। কাউন্সিল অত্যন্ত সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হবে।

দলের সম্মেলন প্রসঙ্গে কুলাউড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম রেনু জানান, দলের সম্মেলন যাতে সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয় সেজন্য ইতিমধ্যে ইউনিয়ন পর্যায়ে বর্ধিত কর্মিসভা হয়েছে। আওয়ামী লীগ ও এর সকল অঙ্গ সহযোগী সংগঠন যাতে ঐক্যবদ্ধ থেকে সম্মেলনকে সফল করে সেজন্যে সকলের সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা