kalerkantho

বুধবার । ২০ নভেম্বর ২০১৯। ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

চলে গেলেন মুক্তিযোদ্ধা মুক্তুমিয়া, রয়ে গেল স্বীকৃতির অপ্রাপ্তি

পঞ্চগড় প্রতিনিধি   

২৩ অক্টোবর, ২০১৯ ১৮:১৮ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



চলে গেলেন মুক্তিযোদ্ধা মুক্তুমিয়া, রয়ে গেল স্বীকৃতির অপ্রাপ্তি

জীবনের শেষ দিনগুলো এভাবেই কেটেছে মুক্তিযোদ্ধা মুক্তুমিয়ার। ছবি : কালের কণ্ঠ

পঞ্চগড় সদর উপজেলার অমরখানা ইউনিয়নের ভিতরগড় এলাকার সেই ভিক্ষুক মুক্তিযোদ্ধা মুক্তুমিয়া (৯১) আজ বুধবার ভোরে মারা গেছেন। সন্ধ্যায় স্থানীয় কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেও আজও স্বীকৃতি মেলেনি তার। জীবনের শেষ ভাগ তার কেটেছে ভিক্ষাবৃত্তি করে। জাতীয় পতাকায় ঢেকে সম্মান পাওয়ার শেষ স্বপ্নটুকু অপূর্ণই রয়ে গেল তার। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মুক্তুমিয়ার পরিবারসহ স্থানীয়রা।

মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয়রা জানান, ৬ নম্বর সেক্টরের সাব সেক্টর ৬ এর ৩/এ মধুপাড়া কম্পানির কম্পানি কমান্ডার এ কে এম মাহবুব উল আলমের নেতৃত্বে অমরখানা ভিতরগড়সহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় যুদ্ধ করেন মুক্তুমিয়া। টানা নয় মাস রেকি করা, গাইড, সংবাদ সরবরাহ কিংবা পাকসেনাদের ক্যাম্প আক্রমণ সবকিছুতেই মুক্তিমিয়া অংশগ্রহণ করেন বীরত্বের সাথে। তার চোখের সামনেই গোলাম গাউসকে ব্যয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে পাকসেনারা। এ কে এম মাহবুব উল আলমের গেড়িলা থেকে সম্মুখ যুদ্ধ বইটির একটি অংশে মুক্তুমিয়াকে শিরোনাম স্মৃতিচারণ করা হয়েছে। তার বীরত্বের কথাও তুলে ধরা হয়েছে।

যুদ্ধ শেষে স্বাধীন বাংলাদেশে মুক্তুমিয়ার ভাগ্যে তেমন কিছু জোটেনি। তাঁর অনেক সহযোদ্ধা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি মেলেনি তাঁর। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী হলেও জীবন সংগ্রামে তিনি এক পরাজিত সৈনিক। দরিদ্রতা আর টানাপোড়েনের সংসারের ঘানি টানতে শেষ বয়সে মুক্তুমিয়াকে ভিক্ষার থলি হাতে নিতে হয়। স্বাধীনতা দিবস কিংবা বিজয় দিবসেও তাকে ভিক্ষার থালি নিয়ে বের হতে হয়েছে মানুষের দ্বারে দ্বারে দুমুঠো ভাতের আশায়।

মুক্তুমিয়ার পরিবার জানায়, সর্বশেষ মুক্তিযোদ্ধা বাছাই বোর্ডে তার নাম সর্বসম্মতিক্রমে তালিকাভুক্ত হয়। কিন্তু তা অজ্ঞাত কারণে এখনো গেজেটভুক্ত হয়নি। এ ছাড়া মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক পঞ্চগড়ে এসে জনসমুখ্যে তাকে সহযোগিতা করার আশ্বাস দিলেও তা পাননি মুক্তুমিয়া। জীবনের শেষ বয়সে বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে গত কয়েক মাস ধরে বিছানায় পড়েছিলেন মুক্তুমিয়ার। টাকা না থাকায় ভালো চিকিৎসা করাতে পারেনি তার পরিবার। অবশেষে বুধবার ভোরে পরলোকগমন করেন এই বীর যোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সম্মান, স্বীকৃতি আর সহযোগিতা কোনোটিই তার ভাগ্যে জুটলো না। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সম্মান নিয়ে মৃত্যুবরণে ইচ্ছেটাও তার পূরণ হলো না।

মৃত্যুবরণের এক মাসে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মুক্তুমিয়া বলেছিলেন, ৯ মাস যুদ্ধ করেছি। মুক্তিসেনাদের পথ দেখিয়েছি। দেশ স্বাধীন হলো আমার ভাগ্যে কিছু জুটলো না। এখন ভিক্ষা করে খাই। যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় ডাকাতি করলো তারাই এখন বড় মুক্তিযোদ্ধা। অথচ আমার নাম এখনো মুক্তিযোদ্ধার তালিকাভুক্ত হয়নি। সে সময় মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি নিয়ে ওপারে যাওয়ার আশা ব্যক্ত করেছিলেন মুক্তুমিয়া।

মুক্তুমিয়ার স্ত্রী আমেনা খাতুন বলেন, মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট পাওয়ার জন্য আমরা সব জায়গায় দৌড়াদৌড়ি করেছি। হবে হবে বলে আজও স্বীকৃতি পাওয়া হলো না। তার শেষ ইচ্ছেটাও পূরণ হলো না।

স্থানীয় অধিবাসী ইয়াসিন আলী বলেন, আমরা মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের বই পড়ে জেনেছি মুক্তুমিয়া একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু আজ তাকে বঞ্চনা আর অপ্রাপ্তি নিয়েই দুনিয়া থেকে চলে যেতে হলো। এটা আমাদের কাছে লজ্জার। 

অমরখানা ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আব্দুল মান্নান ভূইয়া বলেন, মুক্তুমিয়া মুক্তিযুদ্ধের সময় গাইড হিসেবে অনেক বড় ভূমিকা পালন করেছেন বলে জেনেছি। কিন্তু তিনি গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা হওয়ায় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কোনো সুযোগ-সুবিধা পাননি। 

পঞ্চগড় সদর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান বলেন, মুক্তুমিয়া মারা যাওয়ার খবর শোনার পর জেলা প্রশাসক বিশেষ মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে বসছিলেন। কিন্তু গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা না হওয়ার কারণে মুক্তুমিয়াকে গার্ড অব অনার দেওয়ার সুযোগ নেই। 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা