kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

হিল্লা বিয়েতে রাজি না হওয়ায় 'একঘরে'

নিয়াজ মোরশেদ, আক্কেলপুর (জয়পুরহাট)   

২১ অক্টোবর, ২০১৯ ২০:৩৮ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



হিল্লা বিয়েতে রাজি না হওয়ায় 'একঘরে'

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া-বিবাদে রাগের মাথায় ‘তালাক’ শব্দটি উচ্চারণ করে আব্দুল ছাত্তার। ওই কথাটি আবার গ্রামের মাতবর জালাল হোসেনের কানে পৌঁছে। এরপর একের পর এক সালিশ বসিয়ে জোরপূর্বক গৃহবধূ মাসুদা বেগমকে হিল্লা বিয়ে (ফতোয়া) করতে চাপ দেয় মাতবররা। এতে রাজি না হওয়ায় মাতবরা ওই গৃহবধূসহ তার পরিবারকে একঘরে করে রেখেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি ঘটেছে জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার বিঞ্চপুর গ্রামে।

সরেজমিনে আজ সোমবার বেলা ১১টায় বিঞ্চপুর গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, গৃহবধূ মাসুদা বেগমের বাড়ি বিঞ্চপুর গ্রামের প্রায় শেষ প্রান্তে। তার বাড়ির দরজায় তালা দেওয়া ছিল। প্রতিবেশীদের সাথে মাসুদার পরিবারের বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে গ্রামের মাতবর জালালের ভয়ে কেউ কোনো মুখ খুলতে চায়নি।

প্রতিবেশীরা জানায়, জালাল আওয়ামী লীগ সমর্থক। আর তাই তিনি ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে গ্রামের লোকজনদের দাবিয়ে রাখেন। তাই মাসুদার বিষয়ে কেউ কোনো কিছু বলতে সাহস পায়নি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিঞ্চপুর গ্রামের মাসুদা বেগমের সাথে বিয়ে হয় নওগাঁ সদরের সড়ল শীকারপুর গ্রামের আব্দুল ছাত্তার। তিনি প্রায় ১৫ বছর আগে স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে তার শ্বশুর বাড়িতে এসে বসবাস করছিলেন। সংসার জীবনে তাদের এক ছেলে তিন মেয়ে রয়েছে। বড় ছেলে মাসুদ রানা ঢাকায় বিক্সা চালায়, সূবর্ণা আক্তার নামে এক মেয়ের বিয়ে হয়েছে। আর ছোট দুই মেয়ে মরিয়ম আক্তার (১৬) ও জান্নাতুন ফেরদৌস (১১) স্কুলে লেখাপড়া করেন। মাসুদার স্বামী পেশায় একজন কৃষক। গত ১৫-২০ দিন আগে মাসুদার সাথে তার স্বামী আব্দুল ছাত্তারের ঝগড়-বিবাদ হয়। ওই সময় রাগের মাথায় আব্দুল ছাত্তার মাসুদাকে মুখে ‘তালাক’ শব্দটি উচ্চারণ করেন। এর পর তিনি ঘটনাটি গ্রামের মাতবরদের কাছে গল্প করেন। মতবররা তখন বিষয়টি নিয়ে গ্রামে সালিশ ডাকেন।

ওই সালিশে তিলকপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য জালাল হোসেন, এক নম্বর ওয়ার্ডের (ইউপি) সদস্য বাদেশ আলী, ওই ওয়ার্ডের যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মোকছেদ হোসেনসহ গ্রামের প্রায় ৫০-৬০ জন উপস্থিত ছিল। ওই সালিশে জালাল হোসেন, বাদেশ ও মোকছেদ গৃহবধূ মাসুদাকে হিল্লা বিয়ে করা প্রস্তাব দেয়। তখন মাসুদা ওই হিল্লা বিয়ে করতে অস্বৃকীতি জানায়। এই ঘটনাটি নিয়ে পর পর তিন বার রাতে জালাল হোসেনের দোকানের সামনে সালিশ অনুষ্ঠিত হয়।

গৃহবধূ মাসুদা বলেন, হিল্লা বিয়ে করতে ডাকা সালিশে আমি এবং আমার স্বামী ওই হিল্লা (ফতোয়া) রাজি হইনি। একপর্যায়ে মাতবররা আমাকে এবং আমার স্বামীকে চাপ দিলে আমার স্বামী রাজি হয় কিন্তু আমি রাজি হয়নি। ওই সালিশের পরে আমার স্বামী আর আমাকে নিতে চায় না। আমার স্বামী এখন ওই মাতবরদের কাছেই সবসময় থাকছেন। মাতবররা যা বলছেন তিনি তাই শুনছেন। এখন মাতবরদের একই কথা হিল্লা বিয়া হলে তোমার এখানে থাকা হবে না হলে তোমাকে আমরা আমাদের সমাজে নিব না। সমাজে থাকতে হলে তোমাকে হিল্লা বিয়া হওয়াই লাগবে। এই ঘটনার আগে সমাজের সবাই আমাদের সাথে কথা বলতো হিল্লা বিয়া না হওয়ায় কেউ আমাদের সাথে কথা বলে না। মাতবররা সবাইকে বলে দিছে কেউ যেন আমাদের সাথে কথা না বলে। আমাদের এখন এক ঘরে করে রাখা হয়েছে।

মাসুদা স্বামী আব্দুল ছাত্তার বলেন, আমি মৌখিকভাবে আমার স্ত্রীকে তালাক শব্দটি উচ্চারণ করেছি। কিন্তু সালিশে যে হিল্লা বিয়ে করার কথা বলা হচ্ছে এতে আমি রাজি না।

মতবর ও ইউপি সদস্য বাদেশ আলী বলেন, মাসুদাকে নিয়ে গ্রামে একটি সালিশ হয়েছিল। সেখানে তাদের জমিজমা বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। আমি মাসুদাকে হিল্লা বিয়ে করতে বলিনি। সে এসব মিথ্যা কথা আপনাদের বলছেন।

হিল্লা বিয়েতে চাপ প্রয়োগ করে একঘরে করে রাখার বিষয়টি অস্বীকার করে মতবর জালাল হোসেন বলেন, শুনেছি মাসুদার স্বামী তাকে মৌখিকভাবে তালাক দিয়েছে। তাদেরকে নিয়ে গ্রামে সালিশ হয়েছিল সেখানে হিল্লা বিয়ের কোনো কথা উঠেনি। আমি তাকে হিল্লা বিয়ে হওয়ার কোনো কথা বলিনি। 

তিলকপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সেলিম মাহবুব স্বজল বলেন, আমার ইউনিয়নের এই রকম কোনো ঘটনা আমার জানা নেই। এই বিষয়ে কেউ আমার কাছে কোনো অভিযোগও করেনি। তার পরেও বিষয়টি আমি দেখছি। 

আক্কেলপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু ওবায়েদ বলেন, এই রকম কোনো ঘটনা আমার জানা নেই।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা