লক্ষ্মীপুরের রামগতি ও কমলনগরের চরাঞ্চলে সার্বিক উন্নয়ন; ভাঙনরোধ; যোগাযোগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা বাড়ানোর দাবি সেখানকার বাসিন্দাদের। এ লক্ষ্যে চর উন্নয়ন বোর্ড গঠনের দাবি দেশের অন্যান্য চরের বাসিন্দাদের মতো এ দুই উপজেলার চরবাসীরও।
চরের বাসিন্দারা জানান, নানা সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দেশের অন্যান্য চরের মতো রামগতি ও কমলনগরের চরের বাসিন্দারাও দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামোগত দুর্বলতা, নদীভাঙন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং সরকারি সেবার সুযোগ সীমিত হওয়ার কারণে পিছিয়ে। এ অবস্থায় চরবাসীর জীবনমান উন্নয়নে একটি বিশেষায়িত বোর্ড গঠনের প্রয়োজনিয়তার কথা বলছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের নেতাসহ সচেতন মহল।
তাদের মতে, মোট জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ চরে বসবাস করলেও সেখানকার উন্নয়নে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি কোনো পৃথক পরিকল্পনা নেই। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, মৎস্য, যোগাযোগ, শিল্প কলকারখানা না থাকা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ মৌলিক ক্ষেত্রে চরবাসী এখনো বৈষম্যের শিকার।
চরের বাসিন্দাদের ভাষ্য, প্রতিবছর নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের নতুন করে জীবন শুরু করতে হয়। অনেক এলাকায় এখনো পাকা সড়ক, নিরাপদ সুপেয় পানি, ইন্টারনেটসেবা, আধুনিক চিকিৎসাসেবা ও মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। এসব সমস্যা সমাধানে শুধু প্রকল্পভিত্তিক উদ্যোগ নয়, বরং একটি স্থায়ী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন।
চর উন্নয়ন বোর্ড গঠন করা হলে চরাঞ্চলের জন্য পৃথক বাজেট বরাদ্দ, নদীভাঙন প্রতিরোধ, টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ, পর্যটন শিল্পের বিকাশ, চরে উৎপাদিত গরু ও মহিষের দুধ সংরক্ষণ, কৃষি ও মৎস্য খাতের আধুনিকায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দুর্যোগ মোকাবেলায় সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করছে চরের মানুষ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চরবিষয়ক মন্ত্রণালয় গড়ে তোলার জন্য প্রথম বড় আন্দোলন হয় কুড়িগ্রামে। অবসরপ্রাপ্ত কলেজশিক্ষক শফিকুল ইসলাম বেবুর নেতৃত্বে চরবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দাবিতে অনেক সভা-সেমিনার হয়েছে। সেখানে চর উন্নয়ন বোর্ড বা মন্ত্রণালয় গঠনের দাবি জোরালো হয়।
২০১৫ সালে প্রথমবারের মতো ন্যাশনাল চর কনভেনশনে চরের উন্নয়নে ১৪ দফার প্রস্তাবনা তখনকার জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, রামগতি ও কমলনগর উপজেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে অন্তত ২০০ চর রয়েছে। এসব চরে লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। নদীভাঙন ও পলি জমার কারণে এসব চরের সংখ্যা ও আয়তন প্রতিনিয়ত বদলাতে থাকে।
সামাজিক সংগঠনের নেতারা বলছেন, দেশের অর্থনীতিতে চরাঞ্চলের অবদান ক্রমেই বাড়ছে। কৃষি উৎপাদন, মৎস্যসম্পদ ও পর্যটনের অপার সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে চরবাসীর জন্য বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে চর উন্নয়ন বোর্ড গঠন করে একটি দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের দাবি জানান তারা।
চরের বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো উন্নয়নের মূল স্রোতে যুক্ত করতে হলে তাদের জন্য একটি পৃথক ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গঠনের বিকল্প নেই। তাই চর উন্নয়ন বোর্ড গঠনের দাবিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি দাবি তাদের।
সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের কমলনগর উপজেলা সভাপতি মিজানুর রহমান মানিক ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক বেলাল হোসেন জুয়েল বলেন, পরিসংখ্যান বলছে, চরাঞ্চলে অতি-দারিদ্র্যের হার ১২.৯ শতাংশ। তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থানসহ সব মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। চরের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার চিত্র এখনো করুণ। বাল্যবিয়ে ও নারী নির্যাতনের হার চরাঞ্চলে সবচেয়ে বেশি। মর্যাদার প্রশ্নে চরের নারীরা এখনো অনেক পিছিয়ে। অথচ চরের কৃষি উৎপাদনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে এই নারীসমাজ।
সংবিধান অনুযায়ী সব নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতার যে প্রতিশ্রুতি রয়েছে, চরবাসীর জীবনে তার ছায়াও পড়েনি আজও।
চরগাজী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তাওহীদুল ইসলাম সুমন বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত এই বিশাল জনগোষ্ঠী থেকে গেছে জাতীয় পরিকল্পনার বাইরে। পার্বত্য অঞ্চলের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড রয়েছে, হাওরাঞ্চলের জন্য আলাদা কর্তৃপক্ষ রয়েছে, কিন্তু চরের জন্য কিছুই নেই। তাই চরবাসীর দাবি হলো এ বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য আলাদা চর উন্নয়ন বোর্ড গঠন করা।
লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান বলেন, ‘সারা দেশে কোটির মতো বিশাল জনগোষ্ঠীর বসবাস চরাঞ্চলে। তারা এ দেশেরই মানুষ। তারা কেন অধিকার বঞ্চিত থাকবে?’
সংসদ সদস্য আরো বলেন, ‘এই জনপদকে যদি পরিকল্পনার আওতায় আনা যায়, তাহলে এই চরভূমিই হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতির নতুন চালিকাশক্তি। সেই স্বপ্ন পূরণে দরকার দূরদর্শী পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা। বর্তমান সরকার সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিতে কাজ করছে।’