kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

অন্ধকারের মধ্যে এক টুকরো আলো

ভাঙ্গুড়া (পাবনা) প্রতিনিধি   

১৮ অক্টোবর, ২০১৯ ২০:৪৯ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



অন্ধকারের মধ্যে এক টুকরো আলো

পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তৃষা সবার ছোট। ছোটবেলা থেকেই সে অত্যন্ত মেধাবী। পরিবারে ব্যাপক অভাব-অনটনের মধ্যে অন্য চার ভাইবোন লেখাপড়াতে তেমন এগোতে না পারলেও নিজের অদম্য ইচ্ছায় তৃষা পড়াশোনা চালিয়ে যায়। 

হতদরিদ্র কৃষক বাবা তৃষাকে পড়াশোনার জন্য তেমন সুযোগ সুবিধা দিতে পারেননি। এমনকি অভাবের কারণে স্কুল জীবনে একাধিকবার তার পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। কিন্তু এতে কখনো ভেঙে পড়েনি তৃষা। শিক্ষক ও নিকট আত্মীয়-স্বজনের সহযোগিতা নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যায় সে। 

তৃষা মেধাবী বলে অনেকেই তাকে সাধ্যমতো সহযোগিতা করে। এভাবেই দুঃখ-কষ্টের মধ্য দিয়ে পড়াশোনা করে চলতি শিক্ষাবর্ষে মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে তৃষা। এ যেন অন্ধকারের মধ্যে এক টুকরো আলো। তৃষার বাড়ি পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার পারভাঙ্গুড়া ইউনিয়নের পাটুলিপাড়া গ্রামে। বাবা হতদরিদ্র দিনমজুর মজিবর রহমান ও মা কুরসি বেগম।

তৃষার মা কুরসি বেগম জানান, তাদের তিন মেয়ের মধ্যে দুই মেয়েকে প্রাথমিকের গন্ডি পার হতেই বিয়ে দিয়ে দেন। এমনকি অর্থের অভাবে মাধ্যমিকের গণ্ডি পার হলেই দুই ছেলেকেও কাজে লাগিয়ে দিতে বাধ্য হন তারা। পরিবারের জন্য দু-মুঠো অন্ন ও বস্ত্রের জোগাড় করতে ব্যস্ত সবাই। এ অবস্থায় তৃষার মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পাওয়া তাদের কাছে স্বপ্নের মতো।
 
তিনি আরো জানান, ছোটবেলা থেকে তৃষা অত্যন্ত মেধাবী। সে পঞ্চম শ্রেণিতে নিজ গ্রামের স্কুল থেকে ও অষ্টম শ্রেণিতে উপজেলা সদরের মমতাজ মোস্তফা আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ থেকে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পায়। পরে একই স্কুল থেকে ২০১৭ সালে এসএসসি পরীক্ষায় এ প্লাস পায়। এসএসসি পাস করার পরে দিনমজুর দুই ভাই তাদের উপার্জিত আয় দিয়ে তৃষাকে রাজশাহী সরকারি মহিলা কলেজে এইচএসসিতে ভর্তি করেন। সেখান থেকে এ বছর সে এইচএসসিতে এ প্লাস পায়। তৃষার পড়াশোনার আগ্রহ ও ভালো ফলাফল দেখে স্কুল ও কলেজের শিক্ষকরা পারিশ্রমিক ছাড়াই তাকে প্রাইভেট পড়াতেন। এমনকি পরীক্ষার ফরম পূরণের সময়ও শিক্ষকরা তাকে আর্থিক সহযোগিতা করতেন।

তৃষার বাবা বলেন, এসএসসি পাস করার পূর্বে অর্থের অভাবে একাধিকবার তৃষার পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। তবে তৃষার শিক্ষক ও নিকটতম আত্মীয় স্বজনের সহযোগিতার কারণে পড়াশোনা বন্ধ হয়নি। এমনকি তৃষাকে পড়াশোনা করানো নিয়ে প্রতিবেশিরা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করলে তাকে বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তৃষার আপত্তির কারণে সেটা সম্ভব হয়নি। কিন্তু এখন তৃষার হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজে ভর্তি ও পড়াশোনার খরচ যোগানো নিয়ে মহা দুঃশ্চিন্তায় পড়েছেন তিনি।

এদিকে তৃষার মেডিকেলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাওয়ার খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে শুক্রবার ভাঙ্গুড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তার বাড়িতে গিয়ে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান। এ সময় প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা হিসেবে তৃষার পড়াশোনায় সহযোগিতা করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন বলে তার পরিবারকে আশ্বস্ত করেন।

তৃষার ভবিষ্যত ইচ্ছা, চিকিৎসক হওয়ার পর এলাকায় থেকে সাধারণ মানুষের সেবা করার। এছাড়া প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তার মতো হতদরিদ্র মেধাবীদের পাশে দাঁড়ানোরও ইচ্ছা আছে। এসময় তিশা মেডিকেল কলেজে ভর্তি ও পরবর্তীতে পড়াশোনার জন্য প্রশাসন ও সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতা চায়। নতুবা তার পড়াশোনার খরচ চালাতে পরিবারের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে বলে জানায় সে।

পাটুলিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ও ভাঙ্গুড়া টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের অধ্যক্ষ বদরুল আলম বলেন, তৃষা গ্রামের গর্ব। অনেক বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে দরিদ্রতাকে জয় করে সে মেধার পরিচয় দিয়েছে। গ্রামবাসীর উচিত তাকে সহযোগিতা করা।

ভাঙ্গুড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ আশরাফুজ্জামান বলেন, তৃষা অনেক প্রতিকূলতা পেরিয়ে অসম্ভবকে জয় করেছে। তার প্রতিভাকে মূল্যায়ন করতে সকলের তার পাশে দাঁড়ানো উচিত। পরিবারিক দরিদ্রতার কথা ভেবে উপজেলা প্রশাসন সরকারিভাবে তৃষাকে পড়াশোনা করার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবে বলে জানান তিনি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা