kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বগুড়ার কোটিপতি ১৩ পুলিশ কর্মকর্তা দুদকের নজরদারিতে

এই জেলায় কারো চাকরি এক যুগ ছাড়িয়েছে

লিমন বাসার, বগুড়া   

১৭ অক্টোবর, ২০১৯ ১৪:২৬ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বগুড়ার কোটিপতি ১৩ পুলিশ কর্মকর্তা দুদকের নজরদারিতে

বগুড়া জেলায় চাকরি করেছেন ঘুরেফিরে বারবার। হয়েছেন বাড়ি-গাড়ির মালিক। অনেকের একাধিক প্লট-ফ্ল্যাটসহ রয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য। কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার মালিক হতে জড়িয়েছেন নানা অপকর্মে। বগুড়ায় বিভিন্ন সময়ে কর্মরত এই ১৩ পুলিশ কর্মকর্তার এসব কর্মকাণ্ডের তথ্য এখন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হাতে। চলছে তদন্ত। বৈধ আয়ের চেয়ে বিপুল সম্পদ অর্জন করে অভিযোগ থেকে বাঁচতে অনেকে সম্পদ রেখেছেন স্ত্রীদের নামে। কেউ বা রেখেছেন আত্মীয়-স্বজনের নামে। 

এই ১৩ জনের মধ্যে এরই মধ্যে কয়েকজনের বিষয়ে অনুসন্ধানে অবৈধ আয় ও সম্পদের খোঁজ পেয়েছে দুদক। কয়েকজন ওসিকে স্ত্রীসহ নিজের সম্পদ বিবরণী দাখিলের জন্য এরই মধ্যে নোটিশও দেওয়া হয়েছে। দুদক বগুড়ার সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, প্রাথমিকভাবে ১৩ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। তাঁদের জমা দেওয়া কাগজপত্র যাচাই-বাছাই শেষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই তালিকায় পরবর্তী সময়ে অন্য অভিযুক্তদের নামও আসতে পারে। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের কারো কারো বগুড়া জেলায় ঘুরেফিরে চাকরি এক যুগ ছাড়িয়ে গেছে। অনেকের এ জেলায়ই দুই থেকে তিনটি সুউচ্চ ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। অনেকে জায়গা কিনে রেখেছেন বাড়ি করার জন্য। এসব সম্পদ নিজেদের নামে না করে কেউ কেউ করেছেন স্ত্রী-সন্তান বা পরিবারের অন্য সদস্যদের নামে। 

বগুড়ার শিবগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হলেন সানোয়ার হোসেন। তিনি বগুড়া সদর থানার এসআই, শাজাহানপুর থানার এসআই, মোকামতলা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ, সান্তাহার পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর সর্বশেষ শিবগঞ্জ থানায় রয়েছেন। প্রায় এক যুগ ধরে তিনি বগুড়ায় চাকরি করছেন। শহরের পুলিশ লাইনসের সামনের এলাকায় রয়েছে তাঁর তিনটি ভবন ও সীমানা ঘেরা জায়গা। এ ছাড়া নামে-বেনামে একাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অংশীদারি থাকারও অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। তিনি অবশ্য বলেছেন, তাঁর জায়গা আছে, বাড়ি করেননি। অন্য কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নেই। 

মোকামতলা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর এখন আদমদীঘি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হিসেবে রয়েছেন আব্দুর রাজ্জাক। বগুড়ায়ই চলছে তাঁর প্রায় এক যুগ। দুপচাঁচিয়া থানার এএসআই হিসেবে চাকরি শুরু করে তিনি সেখানে বিয়ে করেন। ধান-চালের ব্যবসাসহ একাধিক চাতাল ও জমি রয়েছে সেখানে। এ ছাড়া বগুড়া শহরের জহুরুলনগর এলাকায় কোটি টাকার ওপরে একটি ছয়তলা ভবনের মালিক তিনি। রাজ্জাক বলেন, বাড়ি অনেক কষ্টে করেছেন। আর বাকি সব তাঁর শ্বশুরের।

আদমদীঘি সার্কেলে ইন্সপেক্টর পদে রয়েছেন শরিফুল ইসলাম। বগুড়া শহরের বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট রূপকথা হাউজিংয়ের নবম তলায় দেড় কোটি টাকার এক হাজার ৫০০ স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাট রয়েছে তাঁর। তিনি নিজে এবং তাঁর স্ত্রী আলাদা প্রাইভেট গাড়ি ব্যবহার করেন। বগুড়ার সোনাতলা থানার ওসি ছিলেন তিনি। শরিফুল বলেন, ‘চাকরিজীবনের টাকায় এই ফ্ল্যাটটি কিনেছি। এর বাইরে কিছু নেই।’

বগুড়া সিআইডির সাবেক পরিদর্শক আব্দুল মান্নানের বাড়ি ভোলা জেলায়। বগুড়ায় ডিবিতে এসআই, শাজাহানপুর থানায় ওসি এবং সিআইডিতে ইন্সপেক্টর হিসেবে তাঁর প্রায় এক যুগ। ডিবি মান্নান হিসেবে পরিচিত তিনি। শহরের জেলখানা সড়কে গাজী টাওয়ারের ষষ্ঠ তলায় একটি ফ্ল্যাট, শহরের মালতিনগর এলাকায় জমিসহ আরেকটি বাড়ি এবং সাতমাথায় জেলা পরিষদের জায়গা ভাড়া নিয়ে লোটোর বিশাল শোরুম রয়েছে তাঁর। মান্নান বলেন, মালতিনগরে একটি জমি রয়েছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নেই।

বগুড়া ডিবি পুলিশের ইনচার্জ আসলাম আলীর বাড়ি নওগাঁ জেলায়। এর আগে ডিবিতে ইন্সপেক্টর আর সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হওয়ার আগে একই থানায় উপপরিদর্শক ছিলেন। বগুড়ায় চাকরি করছেন সাত বছরের বেশি সময়। শহরতলির চারমাথায় জমি, লতিফপুর জামিল মাদরাসার পেছনে জমি ছাড়াও মালতিনগরে একটি ফ্ল্যাট বাড়ি এবং ঢাকার বিমানবন্দরের সামনে হাজি ক্যাম্প এলাকায় একটি রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় বিনিয়োগ করার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া গ্রামের বাড়ি নওগাঁয় অর্ধশত বিঘা জমি রয়েছে তাঁর। আসলাম বলেন, ফ্ল্যাটে বিনিয়োগের টাকা ফেরত নিয়েছি। আর ঢাকার জায়গাটি ১৮ জন মিলে কেনা। সেখানে কোনো প্রকল্পের কাজ শুরু হয়নি। গ্রামের জায়গাটি পৈতৃক সূত্রে পাওয়া।

নন্দীগ্রাম থানার সাবেক ওসি ফাসির উদ্দিন দীর্ঘদিন বগুড়ায় চাকরি করেছেন। বগুড়া সদর থানার এসআই, পরে ওসি হিসেবে বগুড়ার কাহালু ও দুপচাঁচিয়া থানায় ছিলেন। নন্দীগ্রাম থানায় থাকার সময় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে চাঁদে দেখার গুজবের ঘটনায় দায়ের করা মামলা নিয়ে কোটি টাকার বাণিজ্য করার অভিযোগে তাঁকে প্রত্যাহার করা হয়। বগুড়ায় থাকার সময় তিনি শহরের রহমাননগর এলাকার অ্যামিকাস হাউজিংয়ে একটি ফ্ল্যাট কেনেন। স্ত্রীর নামে কেনেন দামি গাড়ি। এ ছাড়া একাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও জমি রয়েছে তাঁর। ফাসির বলেন, ‘ফ্ল্যাটটি আমার শাশুড়ির।’

গাবতলী মডেল থানার সাবেক ওসি খায়রুল বাশার আগে সারিয়াকান্দি ও বগুড়া সদর থানায় উপপরিদর্শক এবং সদর ফাঁড়ির টিএসআই ছিলেন। পরে বগুড়ার গাবতলী মডেল থানার ওসি এবং বর্তমানে সিআইডির ইন্সপেক্টর হিসেবে বগুড়ায়ই রয়েছেন। সব মিলিয়ে এখানে তাঁর ১০ বছর। তিনি গণ্ডগ্রামে বিপুল জমি কিনে ফার্ম হাউস করেছেন। শহরের আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠসংলগ্ন জলেশ্বরীতলায় রয়েছে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। বাশার বলেন, ‘বাড়িটি শ্বশুর আমার স্ত্রীকে উপহার দিয়েছেন।’ 

বগুড়ার শাজাহানপুর থানার সাবেক ওসি মাহমুদুল আলম। বগুড়া সদর থানার এসআই, ওসি এবং শাজাহানপুর থানার ওসি মিলিয়ে তাঁর ছয় বছরের বেশি সময়ের চাকরি। সহিংসতা মামলার প্রধান আসামি জামায়াতে ইসলামীর নেতা ইয়াছিন আলীর কাছ থেকে কোটি টাকার জমি উপঢৌকন হিসেবে নামমাত্র মূল্যে কিনে নেন তিনি। দলিল নিবন্ধন করেন তাঁর দুই ভাই মাহবুবুর রহমান তালুকদার ও শাহিন রেজার নামে। ঢাকা-দিনাজপুর সড়কের পাশে ওই জমির বর্তমান মূল্য দেড় কোটি টাকা। মাহমুদুল জানান, এটি জামায়াত নেতার কাছ থেকে তাঁর দুই ভাই কিনেছেন।

বগুড়া সদর থানা ও শাজাহানপুর থানার সাবেক পরিদর্শক (তদন্ত) আতিয়ার রহমানের বাড়ি জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলায়। বগুড়ায় ছিলেন সাত বছরের মতো। বগুড়ায় থাকার সময় শহরের ফুলবাড়ী এলাকায় দামি কিছু জায়গা কেনেন। এগুলোর মূল্য কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। জয়পুরহাট শহরে তাঁর রয়েছে সাততলা বাড়ি। এ ছাড়া গ্রামেও প্রচুর জমি কিনেছেন নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে। আতিয়ার রহমান বলেন, ‘আমার নিজের কোনো বাসা বা জায়গা নেই। সব বাবার দেওয়া।’

বগুড়া পুলিশ লাইনসের পেছনে লতিফপুর কলোনির বালুবিশা পুকুরপারে পাঁচতলা বাড়ির মালিক পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক সাইফুল ইসলাম। গ্রামের বাড়ি নওগাঁ হলেও বগুড়া সদর থানা ও ডিএসবি মিলে ১২ বছর চাকরি করেছেন এই জেলায়। বাড়ি ছাড়াও শহরে একাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে তাঁর। সাইফুল বলেন, ‘জমি আমার স্ত্রীর নামে। আমি সেখানে থাকি।’

বগুড়ার সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে দুই বছর এএসপি (হেডকোয়ার্টার), পরে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে পদোন্নতি পান আনোয়ার হোসেন। এরপর ছিলেন নন্দীগ্রাম সার্কেলে। শহরের বিলাসবহুল চায়নিজ রেস্টুরেন্ট রোচাজ-এর ব্যাবসায়িক পার্টনার তিনি। এ ছাড়া হিউম্যান হলার মালিক সমিতি ও শহরের একটি মার্কেটে বেনামে তাঁর ব্যাবসায়িক অংশীদারি রয়েছে। আনোয়ার জানান, শেয়ার স্ত্রীর বড় ভাই নিয়েছেন। অন্য কোনো ব্যবসা নেই তাঁর। 

বগুড়া সদর ও নন্দীগ্রাম থানার সাবেক ওসি হাসান শামিম ইকবাল। বর্তমানে সিরাজগঞ্জে সিআইডির এএসপি পদে কর্মরত। শহরের জলেশ্বরীতলা এলাকায় দুটি ফ্ল্যাট কিনেছেন তিনি।  শামিম বলেন, ‘দুটি নয়, আমার একটি ফ্ল্যাট আছে।’ 
 
শিবগঞ্জ থানার সাবেক ওসি আব্দুর রশিদ সরকার। শিবগঞ্জ ও গাবতলী মিলিয়ে ছয় বছর ছিলেন এ জেলায়। বর্তমানে এএসপি পদে কর্মরত। শহরের নিশিন্দারা প্রাণিসম্পদ অফিসের সামনে বিশাল ছয়তলা ভবনের মালিক তিনি। ভবনের নিচের বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানটিও তাঁর মালিকানায়। আব্দুর রশিদ স্বীকার করেন যে বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তাঁর নিজের।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা