kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

‘শুদ্ধি অভিযানের’ ভয়ে আলোচিত অনেকের বিদেশ পাড়ি!

শিমুল নজরুল, চট্টগ্রাম    

১৭ অক্টোবর, ২০১৯ ১০:৪৪ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



‘শুদ্ধি অভিযানের’ ভয়ে আলোচিত অনেকের বিদেশ পাড়ি!

চট্টগ্রামে অনলাইন ক্যাসিনো, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি ও ইয়াবা কারবারে জড়িত সরকারদলীয় সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম বিভিন্ন সংগঠনের অনেকে দেশ ছেড়ে গা ঢাকা দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। কেউ পবিত্র ওমরা হজের নামে আবার কেউ ইনভেস্টর ভিসায় সপরিবারে গেছেন বিদেশে! এঁদের মধ্যে দুজন ওয়ার্ড কাউন্সিলর রয়েছেন। তাঁরা হলেন ২৮ নম্বর পাঠানটুলি ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. আবদুল কাদের প্রকাশ মাছ কাদের এবং ২৩ নম্বর উত্তর পাঠানটুলি ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ জাবেদ।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ঢাকায় ‘শুদ্ধি অভিযান’ শুরু হওয়ার পর পর চট্টগ্রামেও বহুল আলোচিত যুবলীগ-ছাত্রলীগ নেতাসহ কয়েকজন ওয়ার্ড কাউন্সিলর দেশত্যাগ করেছেন। গত রবিবার রাতে নগরের আগ্রবাদ ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের পাশে র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ পাঠানটুলি এলাকার যুবলীগ নেতা খোরশেদ আহমেদ নিহত হওয়ার পর গ্রেপ্তার কিংবা ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হওয়ার ভয় আরো তাড়া করছে সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের।

এদিকে, সোমবার চট্টগ্রামের র‌্যাব-৭ এর তৈরি করা একটি তালিকায় ৩০-৩৬ জন যুবলীগ, ছাত্রলীগ এবং স্থানীয় প্রভাবশালী টেন্ডারবাজ ও চাঁদাবাজের নাম ওঠে এসেছে। ওই তালিকা ধরে ‘শুদ্ধি অভিযান’ পরিচালনার ঘোষণা দিয়েছেন র‌্যাব-৭ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ মাহবুবুল আলম। 

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন সংশ্লিষ্ট একধিক ব্যক্তি কালের কণ্ঠকে জানান, ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. আবদুল কাদেরের বিরুদ্ধে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজিসহ জমি ও ফ্ল্যাট দখলের অভিযোগ রয়েছে। তাঁর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে একাধিক কিশোর গ্যাং। নগরের আগ্রাবাদ, পাঠানটুলি, মোগলটুলি এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করতে মরিয়া এসব গ্যাং।

এ ব্যাপারে কথা বলতে ২৮ নম্বর পাঠানটুলি ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. আবদুল কাদেরের মোবাইল ফোনে কল করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

অভিযোগ রয়েছে, ২৩ নম্বর উত্তর পাঠানটুলি ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ জাবেদ আন্ডার ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে জড়িত থেকে নীরবে শত কোটি টাকা বানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর। চট্টগ্রামে যে কয়েকজন কাউন্সিলর ইয়াবা কারবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত তাঁদের মধ্যে জাবেদের নাম তালিকার প্রথমদিকে। এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে কালো তেলের চোরাই কারবার করার অভিযোগ। অল্প কয়েক বছরে জাবেদ নগরের দক্ষিণ খুলশী এলাকায় ৪টি ফ্ল্যাট, মনসুরাবাদ ও মিস্ত্রিপাড়ায় ৫টি ভবন এবং চৌমুহনী বংশালপাড়ায় জাবেদ টাওয়ার নামে গড়ে তুলেছেন আরো তিনটি ভবন। এ ছাড়া তাঁর মালিকানায় রয়েছে একটি অয়েল ট্যাংকার। এই ট্যাংকার দিয়ে তেলের চোরাই কারবার পরিচালনা করেন তিনি। 

বর্তমানে সপরিবারে কানাডায় পাড়ি জমিয়েছেন ওয়ার্ড কাউন্সিলর জাবেদ। এর আগে মাঝে মধ্যে দেশে আসলেও বছরের বেশির ভাগ সময় কানাডায় থাকেন তিনি। স্ত্রী ও সন্তানদের গত বছর কানাডায় পাঠিয়েছেন তিনি। চলতি বছরের মাঝামাঝিতে বিনিয়োগকারী (ইনভেস্টর) ভিসা নিয়ে গেছেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর, নগর যুবলীগ নেতা আজিজ, আগ্রাবাদের যুবলীগ নেতা পারভেজ, পলিটেকনিক কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক নেতা মহিউদ্দিন, ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা সাইফুল আলম লিমন, নন্দনকানন এলাকার মো. আবু জাফর, এমইএস কলেজের সামনে ভূঁইয়া গলির মশিউর রহমান দিদার, সিআরবি এলাকার রিটু দাশ বাবলু, নালাপাড়া এলাকার জহির উদ্দিন বাবর, জামালখান এলাকার আবদুর রউফ এবং চান্দগাঁও এলাকার এছরারুল হককে কয়েক দিন ধরে দেখছেন না এলাকবাসী। চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত এসব যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতাদের অধিকাংশ ভারতে চলে গেছেন। এ ছাড়া কয়েকজন নেতা মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছেন।

এলাকাবাসী জানান, যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী ও যুবলীগ ঢাকা দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের সঙ্গে যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবরের রয়েছে ঘনিষ্ঠতা। তাঁদের ছত্রছায়ায় থেকে বাবর রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের সব টেন্ডার নিয়ন্ত্রণসহ রেলের জমি দখল করে মার্কেট নির্মাণ, চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। শুধু রেলওয়েতে নয়, নগরজুড়ে রয়েছে তাঁর চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক। যুবলীগ নেতা জি কে শামীমের মতো বাবরও ছয়জন সশস্ত্র দেহরক্ষী নিয়ে চলাফেরা করেন। নগরের যেখানেই যান না কেন সামনে পেছনে গাড়ি বহর নিয়ে ঘোরেন যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর। সম্প্রতি ঢাকায় শুরু হওয়া শুদ্ধি অভিযানের দিন কয়েক আগেই আরব আমিরাতে পাড়ি জমিয়েছেন চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত যুবলীগের এই কেন্দ্রীয় নেতা। ২০১৩ সালের ২৪ জুন রেলওয়ের দরপত্র নিয়ে বিরোধের জের ধরে নগরের সিআরবি এলাকায় জোড়া খুনের ঘটনা ঘটে। এই জোড়া খূনের মামলার আসামি হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর। তাঁর অনুপস্থিতিতে রেলওয়ের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করে রিটু দাশ বাবলু ও মো. আবু জাফর। সম্প্রতি তাঁরাও এলাকা ছেড়ে পালিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই জোড়া খুনের মামলার অপর আসামি সাইফুল আলম লিমনকে চট্টগ্রামে এখন আর দেখা যাচ্ছে না।

এদিকে, বহদ্দারহাট ও চান্দগাঁও এলাকায় চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজির নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত যুবলীগ নেতা এছরারুল হক। রাস্তার টেক্সি স্ট্যান্ডে চাঁদাবাজি, ফুটপাত দখল করে দোকান বসানো, মার্কেট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদা তোলা, পানি উন্নয়ন বোর্ডের টেন্ডার সবই তাঁর অনুসারীদের দ্বারা পরিচালিত। ২০০৪ সালে নগরের খুলশী ইস্পাহানী স্কুল এলাকা থেকে তাঁকে দুটি অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করেছিল র‌্যাব-৭। পরে জামিনে বের হয়ে গা ঢাকা দিলেও ওই মামলায় তাঁর ১৭ বছরের সাজা হয়। একই বছর অর্থাৎ ২০০৪ সালে র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মারা যান তাঁর এক ভাই। ২০০১ সালে পেপসি কম্পানির ম্যানেজার অপহরণ মামলা রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। গত বছর বহদ্দারহাটে চাঁদা না দেওয়ায় আমজাদ হোসেন নামে এক ব্যবসায়ীকে ড্রিল দিয়ে পায়ের হাড় ফুটো করে দেন এছরারুল।

এ ছাড়া আগ্রাবাদ গণপূর্ত বিভাগের টেন্ডার নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত যুবলীগ নেতা পারভেজকে আগ্রাবাদ এলাকায় কয়েকদিন ধরে দেখা যাচ্ছে না বলে জানান আগ্রাবাদ সরকারি কার্য ভবনে (সিজিও বিল্ডিং) ১ ও ২ -এ কর্মরত সরকারি কর্মকর্তারা। তবে তাঁর বাহিনীর সদস্যরা সিজিও বিল্ডিংয়ে ঘোরাফেরা করে নিয়মিত।

আগ্রবাদ সিজিএস কলোনির বাসিন্দারা জানান, কখনো রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না পারভেজ। কয়েক বছর আগে দুবাই থেকে দেশে ফেরার পর আগ্রাবাদ এলাকায় গড়ে তুলেন কিশোর গ্যাং। তাঁদের দিয়ে পুরো আগ্রাবাদ এলাকায় চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন তিনি। পারভেজ শুধু টাকার জোরে এখন যুবলীগ নেতা পরিচয় দেন বলে অভিযোগ নগর যুবলীগের নেতাদের। স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার ছত্রছায়ায় আগ্রাবাদের সব সরকারি প্রতিষ্ঠানের টেন্ডার নিয়ন্ত্রক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন পারভেজ।

অভিযোগ রয়েছে, ২৭ নম্বর দক্ষিণ আগ্রাবাদ ওয়ার্ড কাউন্সিলর এইচ এম সোহেলের মদদে আগ্রাবাদ সরকারি কার্যভবনে প্রথম আধিপত্য বিস্তার করেন পারভেজ। এখনো গণপূর্ত বিভাগের টেন্ডারের ভাগবাঁটোয়ারার অংশ পান কাউন্সিলর সোহেল। তবে তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

ওয়ার্ড কাউন্সিলর সোহেলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি বলেন, ‘আমার সঙ্গে পারভেজের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এরা দলের নাম ভাঙিয়ে লুটপাট করছে। তাদেরকে মদদ দিচ্ছেন আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা। আমার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক প্রমাণ করতে পারলে আমি তাৎক্ষণিকভাবে কাউন্সিলর পদ থেকে অব্যাহতি দেব।’

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন বাচ্চু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যারা অপরাধী তারা দলের নাম ভাঙিয়ে চলে। তারা আমাদের সংগঠনের লোক নয়। আমার জানা মতে, চট্টগ্রাম নগর কমিটির কেউ অপরাধের সঙ্গে যুক্ত নন এবং কেউ দেশত্যাগও করেননি।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা