kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ নভেম্বর ২০১৯। ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২১ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

এলএনজি গ্যাস পাইপলাইন সঞ্চালনে জমি অধিগ্রহণ

ঘুষ দিলে টাকা মেলে!

উজ্জ্বল বিশ্বাস, বাঁশখালী (চট্টগ্রাম)   

১৭ অক্টোবর, ২০১৯ ০২:১৩ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ঘুষ দিলে টাকা মেলে!

বাঁশখালী-আনোয়ারার ওপর দিয়ে এলএনজি গ্যাস পাইপলাইন সঞ্চালনে ভূমি অধিগ্রহণ করা জায়গার টাকা পেতে জমির মালিকদের গলদঘর্ম হতে হচ্ছে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখায় জমির টাকার বিপরীতে ১২ থেকে ১৮ শতাংশ ঘুষ দিয়ে চেক নিতে হচ্ছে তাঁদের। অভিযোগ রয়েছে, ঘুষের টাকা না দিলে ফাইলের কোনো সুরাহা হয় না। যাঁরা ঘুষ দেননি, ভূমি অধিগ্রহণের জমির টাকা তাঁদের ভাগ্যে এখনো জোটেনি।

হিসাব কষে দেখা গেছে, ২০৫ কোটি টাকার জমি অধিগ্রহণে ১০ হাজার মালিককে যদি ১২ থেকে ১৮ শতাংশ ঘুষ গুনতে হয় তাহলে ২০ থেকে ৩২ কোটি টাকা ঘুষ বাণিজ্য করবে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখা। এদিকে প্রকাশ্যে ঘুষ আদায়ের অভিযোগ ওঠায় গত ২৯ সেপ্টেম্বর সার্ভেয়ার মাজেদুজ্জামানকে বদলি করা হলেও অন্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

জানা যায়, পেট্রোবাংলার অধীন গ্যাস ট্রান্সমিশন কম্পানি ক্যাসটল কন্সট্রাকশন কম্পানি লিমিটেড, লিবরা এন্টারপ্রাইজ ও দিপন গ্যাস নামে তিনটি কম্পানি মহেশখালী-আনোয়ারা গ্যাস লাইন প্রজেক্টের বাঁশখালী- আনোয়ারা অংশের ৪৩ কিলোমিটার এলাকার গ্যাস সঞ্চালন কাজ পায়। ওই গ্যাস লাইন সঞ্চালনের জন্য ৮৬ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। ১০ হাজার জমির মালিককে ক্ষতিপূরণ হিসেবে বরাদ্দ ধরা হয় ২০৫ কোটি টাকা। এলাকা ও মৌজাভিত্তিক ক্ষতিপূরণের পরিমাণ শতকপ্রতি সর্বনিম্ন চার লাখ থেকে সর্বোচ্চ ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত ধরা হয়েছে। 

পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের কাছে ২০৫ কোটি টাকা পরিশোধও করা হয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের গাফিলতি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে জমির ২৫ শতাংশ মালিক এখনো টাকা পাননি। যাঁরা পেয়েছেন তাঁরা ১২ থেকে ১৮ শতাংশ ঘুষ দিয়ে চেক নিয়েছেন। যাঁরা ওই টাকা দিতে নারাজ তাঁদের ফাইলপত্রের কোনো কিনারাও হচ্ছে না।

ক্যাসটল কন্সট্রাকশন কম্পানি লিমিটেডের প্রধান ব্যবস্থাপক মো. মারুফুল আলম, লিবরা এন্টারপ্রাইজের প্রধান ব্যবস্থাপক মাহবুবুর রহমান ও দিপন গ্যাসের প্রধান ব্যবস্থাপক মোশারফ হোসেন তিনজনই একই সুরে বলেন, ‘চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় ভূমি মালিকদের কাছ থেকে প্রকাশ্যে ঘুষ আদায়ের ঘটনা খুবই দুঃখজনক। অনেক জমির মালিক আমাদের কাছে এসে সাহায্য চেয়েছেন।’

বাঁশখালীর ছনুয়া ইউনিয়নের জনৈক আবু ছিদ্দিকের ছেলে মো. রোকন উদ্দিন বলেন, ‘আমার ১০ শতক জায়গার জন্য ৮৭ লাখ ৮৬ হাজার টাকার চেক পেয়েছি। চেক পাওয়ার আগে আমাকে ১৫ শতাংশ ঘুষের টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে। ওই ঘুষের টাকা দেওয়ার পর আমি দ্রুত চেক পেয়েছি। চেক দেওয়ার সময় ২ শতাংশ উত্স কর কেটে রাখা হয়েছে।’ এভাবে ঘুষের টাকা দিয়ে চেক পেয়েছেন আনোয়ারা উপজেলার বরুমছড়া গ্রামের আলী নবী, মফিজ উদ্দিন, রতন দেব, বাঁশখালীর উত্তর জলদী গ্রামের রাখাল দাশ, জসিম উদ্দিন, উত্তম সিকদার ও জালাল উদ্দিন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি বলেন, ‘আমি আমার জায়গা বাবদ ৮৪ লাখ টাকা পেয়েছি ১৮ শতাংশ ঘুষ দিয়ে। আমি আরো এক কোটি ২০ লাখ টাকা পাব। ওই টাকারও ঘুষ পরিশোধ করেছি। ফাইলপত্র দ্রুত প্রস্তুত হচ্ছে।’ 

বাঁশখালীর উত্তর জলদী গ্রামের জহিরুল হক, হাবিবুর রহমানসহ অনেকে অভিযোগ করেন, ‘আমাদের এলাকায় আশরাফুল নামে এক ব্যক্তি তাঁর নিকটাত্মীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তাকে ধরে ঘুষ ছাড়া টাকা তুলেছেন। আমরাও ওইভাবে টাকা তোলার চেষ্টা চালিয়ে ১০-১৫ বার ব্যর্থ হয়েছি।’ 

বাঁশখালী উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) আল বশিরুল ইসলাম বলেন, ‘ভূমি অধিগ্রহণ শাখার বিষয়টি আমার আয়ত্তে নেই। তবে প্রকাশ্যে ঘুষ আদায়ের খবরটা প্রচার হচ্ছে। তাই জনসাধারণকে ঘুষ না দেওয়ার জন্য সতর্ক করা হয়েছে।’

আনোয়ারা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. সাইফুজ্জামান বলেন, ‘বিষয়টি চট্টগ্রাম এলএ শাখার। আনোয়ারা উপজেলার কোনো ব্যক্তি দালালদের খপ্পরে পড়লে আমাদের কিছু করার নেই।’

বাঁশখালীর দায়িত্বপ্রাপ্ত ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা সুরাইয়া আক্তার সুইটি বলেন, ‘ঘুষ দেওয়ার বিষয়টি আমিও শুনেছি। যাঁরা ঘুষ দেন তাঁরা বিষয়টি স্বীকার করেন না। অভিযোগ পেলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যেত।’

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এলএ) মো. আমিরুল কায়ছার বলেন, ‘কোনো ভূমির মালিক দালালের খপ্পরে পড়লে অফিসের কেউ দায়ী হতে পারে না। ঘুষখোরদের ব্যাপারে আমরা জিরো টলারেন্সে আছি।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা