kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

তিস্তার ভাঙনে দিশেহারা তীরবর্তী জনপদের মানুষ

সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি   

১৫ অক্টোবর, ২০১৯ ১৮:৫৫ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



তিস্তার ভাঙনে দিশেহারা তীরবর্তী জনপদের মানুষ

পানি কমতে শুরু করেছে তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র নদীতে। সেই সঙ্গে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে নদী ভাঙন। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার শ্রীপুর, লালচামার, হরিপুর, চণ্ডীপুর, তারাপুর ও কাপাসিয়া ইউনিয়নে তিস্তার ভাঙনের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি। এরেইমধ্যে নদীতে বিলীন হয়েছে কয়েকটি গ্রামের ৭ শতাধিক বসতঘর। ভাঙনে বিলীন হয়েছে অন্তত এক হাজার একর ফসলি জমি। রক্ষা পায়নি গাছপালা আর ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ নানা স্থাপনা। এতে ভাঙন আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন নদী তীরবর্তী জনপদের মানুষ।

চলমান অবস্থা বিবেচনা করে পানি উন্নয়ন বোর্ড তিস্তা নদীর অব্যাহত ভাঙন রোধে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে তিস্তা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে প্রায় ২ হাজার জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে ভাঙন থেকে রক্ষা পেতে ওই এলাকার বাসিন্দারা বসতি ঘর-বাড়ি অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু লালচামার এলাকার (৪নং পয়েন্টে) দক্ষিণ পাশের ও উত্তরে জনবসতি এলাকায় জিও ব্যাগ না ফেলে ফসলি জমি ও ফাকা জয়গায় ফেলছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। পাউবো কর্মকর্তা ও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জনবসতি জায়গায় জিও ব্যাগ না ফেলায় অর্ধশতাধিক ঘর-বাড়ি ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। তবুও ওই স্থানে জিও ব্যাগ ফেলার কোনো পরিকল্পনা নেই কর্তৃপক্ষের।

এদিকে তিস্তা-ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে প্রতি বছরেই বাড়ছে পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক ছিন্ন মানুষের সংখ্যা। গেল এক মাসে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে এ উপজেলার অন্তত ২ হাজার পরিবারের ঘরবাড়ি। ভাঙনের কবলে পড়ে কে কোথায় আশ্রয় নিয়েছে তা জানা নেই অনেকের। নদী ভাঙনে শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে নিঃস্ব অনেকে। কেউ বা বাধ্য হয়ে আশ্রয় নিয়েছে অন্যর জায়গায় ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে। আবার জায়গা না পাওয়ায় খোলা আকাশের নিচে কোনো রকমে দিন কাটাচ্ছে ক্ষতিগ্রস্তরা। এ ছাড়া হুমকির মুখে বসতঘর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক স্থাপনা। ভাঙন কবলিত এলাকায় জিওব্যাগ ফেলছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। 

লালচামাড় ঘাটের বাসিন্দা আইনুল হক বলেন, বন্যার আগেও নদীর ভাঙনে বাড়িঘর, ফসলি জমি বিলীন হয়েছে। এখন আবার পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙনের তীব্রতা বাড়ছে। দফায় দফায় ভাঙনে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। ভাঙনের শিকার অনেকে আশ্রয় নিয়েছেন বাঁধ আর অন্যর জমিতে। খেয়ে না খেয়ে তাদের দিন কাটছে কোন রকমে। 

হরিপুর ঘাটের বাসিন্দা আবদুর ছালাম বলেন, ভাঙনের কারণে প্রতিনিয়ত তাদের বাড়িঘর সড়িয়ে নিতে হচ্ছে। ঘরবাড়ি সড়িয়ে নিয়ে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন তাও জানা নেই তার। বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে না উঠতেই নদীর ভাঙনে এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা।

কাপাসিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য রফিকুল ইসলাম বলেন, তিস্তার ভাঙনে দিশেহারা হয়ে পড়েছে নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষ। গত কয়েক দিনে লালচামারসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের ৭ শতাধিক বসতভিটে ও ১ হাজার আবাদি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের মুখে আরও বহু বাড়িঘর, ফসলি জমি, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।

নদী বাঁচাও মানুষ বাঁচাও আন্দোলনের আহ্বায়ক সাদেকুল ইসলাম দুলাল বলেন, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রের অব্যাহত ভাঙনে হাজারো বসত-বাড়ি ও ফসলি জমি নদী গর্ভে চলে গেছে। বাপ-দাদার শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে নিঃস্ব পরিবার গুলো আশ্রয় নিয়েছে বাঁধসহ অন্যর জায়গায়। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত এসব পরিবারকে সহায়তা ও পুনর্বাসনে বারবার দাবি জানিয়ে আসলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তার। তার দাবি জিওব্যাগ কোনো সমাধান নয়, ভাঙন রোধে দ্রুত পরিকল্পনা অনুযায়ী স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করার।

এদিকে তিস্তার ভাঙন ঠেকাতে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করার দাবিতে মানববন্ধন করে আসছেন এলাকাবাসী। সম্প্রতি ভাঙনে দিশেহারা এলাকার মানুষ তিস্তা নদীর পাড়ে পুঠিমারী এলাকায় দাঁড়িয়ে একসঙ্গে নামাজ আদায় ও বিশেষ মোনাজাত করেন। কচিমবাজার এলাকায় নদী পাড়ে দাঁড়িয়ে মানববন্ধন করেছেন এলাকাবাসী।

এ বিষয়ে গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বলেন, প্রাথমিকভাবে ভাঙন ঠেকাতে জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলার কাজ চলছে। ভাঙন রোধে তীর রক্ষায় বেশ কয়েকটি প্রকল্প জমা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রকল্পগুলো অনুমোদন পেলে দ্রুতই কাজ শুরু করা হবে বলেও জানান তিনি।

অব্যহত নদীর ভাঙনে উদ্বিগ্ন গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী। তিনি বলেন, ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড তৎপর রয়েছে। বরাবরেই ভাঙন রোধে নদী তীরবর্তী এলাকায় শুধু অস্থায়ীভাবে বালুর বস্তা ফেলানোর কাজেই হয়েছে। তবে এবার ৬টি পয়েন্টে ৪১২ কোটি টাকার প্রকল্পে একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এই প্রকল্প অনুমোদন হলে স্থায়ীবাঁধ নির্মাণসহ পুরো এলাকাকে সুরক্ষিত করা সম্ভব হবে।

শুধু আশ্বাসেই নয়, ভাঙন রোধে মজবুত বাঁধ নির্মাণসহ ক্ষতিগ্রস্তদের পূর্ণবাসনে দ্রুতই কার্যকর পদক্ষেপ  নেওয়ার দাবি নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষের। 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা