kalerkantho

বুধবার । ২৩ অক্টোবর ২০১৯। ৭ কাতির্ক ১৪২৬। ২৩ সফর ১৪৪১                 

৩৮০০ রোহিঙ্গার এনআইডি ‘সাদা কাগজ’ স্ক্যান করে!

বাড়তি টাকায় মিলেছে ‘ওয়ানস্টপ সার্ভিস’ সুবিধা

এস এম রানা, চট্টগ্রাম    

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:৫৫ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



৩৮০০ রোহিঙ্গার এনআইডি ‘সাদা কাগজ’ স্ক্যান করে!

জনপ্রতি ৫০-৬০ হাজার টাকা করে আদায় করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) দিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তি। নির্ধারিত অঙ্কের চেয়ে ১৫ হাজার টাকা বেশি দিলেই পাওয়া গেছে ‘ওয়ানস্টপ সার্ভিস’ সুবিধা। ৫০-৬০ হাজার টাকায় এনআইডি পেতে প্রায় এক মাস লেগে যেত। আর ‘ওয়ানস্টপ সার্ভিসে’ লেগেছে মাত্র সাত দিন! এর কম সময়ে চট্টগ্রাম থেকে দ্রুত এনআইডি পেতে বাড়তি দিতে হতো ১৫ হাজার টাকা। ওই টাকা দিলেই ই-মেইলের মাধ্যমে এনআইডির পিডিএফ ফাইল চট্টগ্রামে এনে প্রিন্ট করার পর রোহিঙ্গাদের হাতে পৌঁছে দেওয়া হতো। আর ৫০-৬০ হাজার টাকা করে দেওয়া রোহিঙ্গারা পরিচয়পত্র পেত ঢাকা থেকে আসা কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে প্রায় ২১-২৫ দিন পর। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) কাউন্টার টেররিজম ইউনিট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র মতে, ইসির অফিস সহায়ক জয়নাল আবেদীনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, রিমান্ডে থাকা মোস্তফা ফারুক এবং সর্বশেষ গ্রেপ্তার হওয়া ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মো. শাহীন, পাভেল বড়ুয়া ও জাহিদ হাসানের দেওয়া তথ্য এবং তাঁদের হেফাজত থেকে উদ্ধার করা দলিলপত্র পর্যালোচনা করে সিএমপির কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের কর্মকর্তারা এসব তথ্য জেনেছেন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, অসাধু কর্মীরা ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার ৮০০ এনআইডি রোহিঙ্গাদের হাতে তুলে দিয়েছেন অর্থের বিনিময়ে। এ কাজে ছিল ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারকেন্দ্রিক চক্র। পুরো চক্রটি শনাক্ত করতেই তদন্তের পরিধি বাড়ানো হচ্ছে। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ইসি, এনআইডি উইং, পুলিশ ও দুদক নিজ নিজ অবস্থানে থেকে কাজ করছে।

গতকাল সোমবার সিএমপির কাউন্টার টেররিজম ইউনিটে গিয়ে দেখা গেছে, গ্রেপ্তার তিন আসামিকে কারাগারে পাঠানোর জন্য নথিপত্র তৈরি করতে ব্যস্ত তদন্ত কর্মকর্তা। অন্য কর্মকর্তারাও ল্যাপটপ নিয়ে তথ্যানুসন্ধানে ব্যস্ত ছিলেন। ফলে কথা বলতে রাজি হচ্ছিলেন না। তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক রাজেস বড়ুয়া শুধু সংক্ষেপে বলেন, মামলা তদন্তাধীন। তিন আসামি গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাঁদের আদালতে সোপর্দ করা হচ্ছে।’ সিএমপির অন্য কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে ডাটা এন্ট্রি অপারেটররা কিভাবে ইসির এনআইডি তৈরির ওয়েবসাইটে ঢুকে নম্বর পায় সে বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে।

সাদা কাগজ স্ক্যান থেরাপি : জানা যায়, বাংলাদেশের ভোটার হতে ইসির নির্ধারিত ফরমে (ফরম-২) আবেদন করতে হয়। তাতে আবেদনকারীকে শনাক্তকারী, তথ্য সংগ্রহকারী, সুপারভাইজর, যাচাইকারী এবং ডাটা এন্ট্রি অপারেটরের স্বাক্ষর ও জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, আবেদনকারীর ছবি, স্বাক্ষর ও আঙুলের ছাপ এবং সর্বশেষ ধাপে রেজিস্ট্রেশন অথবা সহকারী রেজিস্ট্রেশন কর্মকর্তার স্বাক্ষর ও তারিখ লাগে। এতগুলো ধাপ পেরিয়ে রোহিঙ্গাদের কিভাবে এনআইডি দেওয়া হলো সে বিষয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে চোখ কপালে উঠছে পুলিশ কর্মকর্তাদের। গ্রেপ্তার করা আসামিদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশি এনআইডি পাওয়ার জন্য দালালদের শরণাপন্ন হন। ওই দালালরাই চট্টগ্রাম ইসির অফিস সহায়ক জয়নাল আবেদীন ও গোলাম ফারুকচক্রের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ডাটা এন্ট্রি অপারেটররা পরবর্তী ধাপে ‘ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ’ করে ২০১৪ সাল থেকে রোহিঙ্গাদের হাতে এনআইডি তুলে দিয়ে আসছেন। তবে এই প্রক্রিয়ায় ইসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কোন পর্যায়ে কিভাবে যুক্ত হলেন সে বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে রাজি হননি পুলিশ কর্মকর্তারা।

সূত্র মতে, প্রাথমিক তদন্তে কর্মকর্তারা জানতে পারেন, প্রথম ধাপে দালালরা রোহিঙ্গাদের নিয়ে আসার পর ইসির নির্ধারিত ফরম-২ পূরণ করা হয়। তাতে তাঁদের বাংলাদেশি হিসেবে নাম-ঠিকানা লেখার পর শনাক্তকারী, তথ্য সংগ্রহকারী, সুপারভাইজর, যাচাইকারী এবং ডাটা এন্ট্রি অপারেটরের স্বাক্ষর ও এনআইডি নম্বর ভুয়া বসানো হয়। তদন্তকারীরা এখন অনুসন্ধান করছেন, ডাটা এন্ট্রি অপারেটররা আসলেই তাঁদের ভুয়া এনআইডি নম্বর দিয়েছেন নাকি প্রকৃত নম্বর দিয়েছেন। গ্রেপ্তারকৃত একজনের পেনড্রাইভ থেকে উদ্ধার করা শতাধিক এনআইডির তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

দ্বিতীয় ধাপে অফিস সহায়ক জয়নাল ইসির অফিস থেকে ল্যাপটপ, ক্যামেরা, স্ক্যানার ও আঙুলের ছাপ দেওয়ার যন্ত্রসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ছুটির দিন বাসায় নিয়ে যেতেন। যে রোহিঙ্গা এনআইডি পাওয়ার জন্য ৫০-৬০ হাজার টাকা দিতেন, তিনি জয়নালের বাসায় যেতেন। সেখানে ওই রোহিঙ্গার ছবি তোলা, আঙুলের ছাপ নেওয়া হতো। এরপর প্রয়োজনীয় ডাটা ঢোকানো হতো ইসির নির্ধারিত ওয়েবসাইটে। ফরম-২-এ উল্লিখিত তথ্যাদি ইনপুট দেওয়ার পর দ্বিতীয় ধাপে ফরমটি স্ক্যান করে ওয়েবসাইটে ইনপুট দেওয়ার নিয়ম আছে। না হলে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে না সফটওয়্যার। এ পর্যায়ে নির্ধারিত ফরমটির বদলে একটি সাদা কাগজ স্ক্যান করা হয়। ওই স্ক্যানিং কপি সফটওয়্যার গ্রহণ করে এবং পরবর্তী ধাপে একটি পিন নম্বর ও এনআইডি নম্বর অটো জেনারেট হয়। এবার রোহিঙ্গার তথ্যাদি দিয়ে পূরণ করা ফাইলটি ‘ডেট ফাইল’-এ পরিণত করা হয়। ওই ফাইলটিই পাঠিয়ে দেওয়া হয় ঢাকায় ইসিতে কর্মরত সত্য সুন্দর দে ও সাগরের কাছে। একই সঙ্গে পিন নম্বরটিও আলাদাভাবে পাঠানো হতো। কারণ ওই পিন নম্বর ছাড়া ‘ডেট ফাইলটি’ ওপেন হয় না। ফাইলটি ইসির সফটওয়্যারে যথাযথ পিন নম্বর দিয়ে খুলে পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন সত্য সুন্দর দে, সাগর ও সহযোগীরা। তাঁদের হাতেই তৈরি হয় এনআইডি। এর প্রিন্ট কপি লেমিনেট করার পর কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে চট্টগ্রামে পৌঁছে দেওয়া হতো। আর চট্টগ্রামে সংশ্লিষ্ট রোহিঙ্গাদের হাতে ডাটা এন্ট্রি অপারেটররা এসব এনআইডি তুলে দিতেন। এই প্রক্রিয়ায় এনআইডি হস্তান্তরে সময় লাগে ২১ থেকে ২৫ দিন। 

‘ওয়ানস্টপ সার্ভিস’ : তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সাত দিনেও রোহিঙ্গাদের এনআইডি দিয়েছেন আসামি জয়নাল আবেদীন ও মোস্তফা ফারুক এবং তাঁদের সহযোগীরা। এই প্রক্রিয়ায় মাত্র সাত দিনের মধ্যেই এনআইডি রোহিঙ্গাদের হাতে তুলে দিয়েছেন তাঁরা। তবে এ জন্য রোহিঙ্গাদের বাড়তি ১৫ হাজার টাকা গুনতে হতো। অর্থাত্ ব্যয় হতো অন্তত ৭৫ হাজার টাকা। ওই টাকা পাওয়ার পর আসামিরা দ্রুত এনআইডি তৈরির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ঢাকায় পাঠিয়ে দেন পিন নম্বর ও ডেট ফাইল। ওই পিন নম্বর দিয়ে ফাইলটি খোলার পর এনআইডি তৈরির প্রক্রিয়া শেষ করে ঢাকার চক্রটি। এরপর এনআইডির পিডিএফ ফরম্যাট ফাইলটি ই-মেইলে পাঠানো হয় জয়নাল ও মোস্তফার কাছে। তাঁরা প্রিন্ট করার পর লেমিনেট করেন। ইসির নির্ধারিত একটি যন্ত্র ব্যবহার করে লেমিনেট করা হতো যাতে সাইজের হেরফের না হয়। ওই যন্ত্রটিও উদ্ধার করা হয়েছে।

যে কারণে বলা হচ্ছে ৩৮০০ ভুয়া এনআইডির কথা : তদন্তকারীরা ইসির বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে এখন পর্যন্ত আনুমানিক তিন হাজার ৮০০ এনআইডি রোহিঙ্গাদের হাতে দেওয়ার তথ্য পেয়েছেন। কিভাবে এই তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেল জানতে চাইলে দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, যেসব এনআইডির ফরম ব্ল্যাংক (সাদা পৃষ্ঠা স্ক্যান করা) অবস্থায় আছে এমন এনআইডি নম্বরগুলো ভুয়া হিসেবে শনাক্ত করছে ইসি। তবে এই সংখ্যা ইসির পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানের পর আরো বাড়তে পারে বলে মনে করছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা