kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

জি কে শামীমের উত্থান যেভাবে

সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি   

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ১৭:১০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



জি কে শামীমের উত্থান যেভাবে

শুক্রবার (২০ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর নিকেতনে তার ব্যবসায়িক কার্যালয় জি কে বিল্ডার্সে অভিযান চালিয়ে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকার বেশি নগদ অর্থ, ১৬৫ কোটি টাকার বেশি এফডিআর এবং বিপুল মার্কিন ও সিঙ্গাপুরি ডলারসহ আটক করা হয় যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সমবায়বিষয়ক সম্পাদক জি কে শামিমকে। 

সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়েছে বলে গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট মো. সারোয়ার আলম। শামীমকে আটকের পর সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সারোয়ার আলম আরো বলেন, শামীমের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির অভিযোগ রয়েছে। 

শামীমের বৈধ অস্ত্র অবৈধ কাজে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে উল্লেখ করে বলেন, আদালতে শামীম নির্দোষ প্রমাণিত হলে ছাড়া পাবে আর দোষী প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার সন্মানদী ইউনিয়নের (চরভুলুয়া গ্রামের) দক্ষিণপাড়ার মৃত মো. আফসার উদ্দিন মাস্টারের ছেলে জি কে শামীম। আফসার উদ্দিন মাস্টার ছিলেন হরিহরদি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তিন ভাই তিন বোনের মধ্যে সে মেজ। বড় ছেলে গোলাম হাবিব নাসিম ঢাকায় জাতীয় পার্টির রাজনীতি করেন।

স্থানীয় ও তার রাজনীতির কর্মীরা জানান, প্রাইমারি ও হাই স্কুল পাস করার পর ঢাকার বাসাবো আর সবুজবাগ এলাকায় বড় হয়েছেন তারা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইরেজিতে অনার্স, মাস্টার্স করেন। বিবাহিত জীবনে তিনি দুই কন্যা ও এক পুত্র সন্তানের জনক। স্ত্রী শামীম সুলতানা ঢাকার একটি সরকারি কলেজের প্রভাষক। দুই মেয়ে ও ছেলে ঢাকায় লেখাপড়া করে বলে তার এক আত্মীয় নিশ্চিত করেছেন। গ্রামে খুব একটা যাতায়াত নেই। শামীম যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সমবায়বিষয়ক সম্পাদক।

পারিবারিক সূত্রে সে বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত। সোনারগাঁ উপজেলা বিএনপির সভাপতি খন্দকার আবু জাফর একই গ্রামের হলেও তাদের সাথে পারিবারিক দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের। বিএনপির যুব সংগঠন যুবদল নেতা জি কে শামীম লেখাপড়া শেষে ঠিকাদারি কাজ শুরু করেন। বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় থাকাকালে শামীম ছিলেন ঢাকা মহানগর যুবদলের সহসম্পাদক এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক গণপূর্তমন্ত্রী মির্জা আব্বাসের খুবই ঘনিষ্ঠ। মীর্জা আব্বাসের সুনজরের কারণে তিনি গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ঠিকাদারি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন।

বিএনপি নেতা মীর্জা আব্বাস ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর জি কে শামীমের ভয়ে মতিঝিল, পল্টন, শান্তিনগরের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা পালিয়ে বেড়িয়েছেন। রাজধানীর সবুজবাগ, বাসাবো, মতিঝিলসহ বিভিন্ন এলাকায় জি কে শামীম প্রভাবশালী ঠিকাদার হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। পরবর্তীতে ২০০১ সালে মীর্জা আব্বাস গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরই গণপূর্ত ভবনের সব টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করেন। বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীনই সে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে।

বিএনপি ক্ষমতাচ্যুত হলে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আধিপত্য ধরে রাখতে ভোল পাল্টিয়ে যোগ দেন আওয়ামী লীগের যুব সংগঠন যুবলীগে। অদৃশ্য ও রহস্যময় পন্থায় যুবলীগের ত্যাগী নেতাদের হটিয়ে তিনি বাগিয়ে নেন যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সমবায়বিষয়ক সম্পাদকের পদ। হয়ে ওঠেন যুবলীগের প্রভাবশালী নেতা, তার নিয়ন্ত্রণে চলে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সকল প্রকার সরকারি টেন্ডার। নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতির পদটিও নিজের করে নেন। সে সুবাদে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল হাই ও সাধারণ সম্পাদক বাদলের সাথে একাধিকবার তাকে নারায়ণগঞ্জে দেখা গেছে বলে জানান স্থানীয় রাজনীতিবিদরা।

ছয়জন অস্ত্রধারী দেহরক্ষী নিয়ে চলাফেরাই কাল হয় শামীমের। এ দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এমন কি অবনতি হলো যে একজন ঠিকাদারের জন্য ছয়জন বিশালদেহী দেহরক্ষীর প্রয়োজন। জানা যায়, প্রায় ছয় ফুট উচ্চতার সবার হাতে শটগান গায়ে বিশেষ সিকিউরিটির পোশাকই নিয়ন্ত্রণ করত গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ঠিকাদারি। তার অস্ত্রধারী দেহরক্ষী ও ক্যাডার বাহিনী দ্বারা সারা দেশের কনস্ট্রাকশনের যত বড় বড় কাজ নিয়ন্ত্রণ করতেন। তার নির্বাচিত ঠিকাদরি প্রতিষ্ঠান ছাড়া কেউ কাজ করতে পারেন না। এমনকি তাকে না জানিয়ে কেউ দরপত্র ক্রয় করতে সাহস পেত না।

জি কে শামীমের অফিস সূত্রে জানা যায়, জি কে বিল্ডার্স বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, পঙ্গু হাসপাতাল, মিরপুর ৬, মহাখালী ডাইজেস্টিভ, অ্যাজমা সেন্টার, ক্যান্সার হাসপাতাল, সেবা মহাবিদ্যালয়, বেইলি রোডের পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্স, সচিবালয় কেবিনেট ভবন, এনবিআর, নিউরো সায়েন্স, বিজ্ঞান জাদুঘর, পিএসসি, এনজিও ফাউন্ডেশন ও র‌্যাব হেডকোয়ার্টার্স সহ অন্তত ২২টি সরকারি টেন্ডার কয়েক হাজার কোটি টাকার নির্মাণকাজের দায়িত্ব পেয়েছেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা