kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন

রোহিঙ্গা এনআইডিতে দুই ‘পারিবারিক সিন্ডিকেট’

ইসির সাতজনের সম্পদ অনুসন্ধান চায় দুদক

রাশেদুল তুষার, চট্টগ্রাম   

২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০৩:১০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



রোহিঙ্গা এনআইডিতে দুই ‘পারিবারিক সিন্ডিকেট’

মূলত নির্বাচন কমিশন (ইসি) সংশ্লিষ্ট দুটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট বিপুল অর্থের বিনিময়ে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি কার্ড) ও ভোটার তালিকায় নিবন্ধনের মাধ্যমে মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি নাগরিকত্ব পাইয়ে দিত। প্রতিটি এনআইডি কার্ডের বিনিময়ে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা নিত চক্রটি। এই চক্র দুটি নিয়ন্ত্রণ করতেন ইসির দুই কর্মী। ২০১৫ সাল থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ভোটার হওয়ার তথ্য উঠে এলেও নির্বাচন কমিশনের অনেকটা নীরব দায়সারা ভূমিকার প্রসঙ্গ উঠে এসেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গঠিত তদন্ত কমিটির প্রাথমিক তদন্তে।

রোহিঙ্গাদের এনআইডি কার্ড প্রাপ্তি ও ভোটার হওয়ার চাঞ্চল্যকর ঘটনায় দুদক গঠিত এনফোর্সমেন্ট টিম গতকাল বৃহস্পতিবার দুদক চেয়ারম্যানের কাছে প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনে রোহিঙ্গাদের এনআইডি কার্ড প্রাপ্তির জন্য একাধিক সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ও জনপ্রতিনিধির অর্পিত ক্ষমতা অপব্যবহার করে প্রতারণা ও জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারি যন্ত্রপাতি আত্মসাত্, রোহিঙ্গাদের নামে ভুয়া জন্ম নিবন্ধন সনদ প্রদান, নাগরিকত্বের সনদ প্রদান, ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তকরণ, এনআইডি প্রদান ও পাসপোর্ট তৈরিতে সহায়তার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় বিস্তারিত অনুসন্ধানের সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সাতজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পদ অনুসন্ধানের অনুমোদন চাওয়া হয়েছে।

প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা নিশ্চিত করে দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-২-এর উপপরিচালক মাহবুব আলম গতকাল বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নির্ধারিত সময়েই আমরা প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। প্রাথমিকভাবে যেসব তথ্য পাওয়া গেছে তাতে আমাদের মনে হয়েছে, এই দুর্নীতির সঙ্গে অনেক রাঘব বোয়াল জড়িত। আমরা বিস্তারিত তদন্তের জন্য আবেদন করেছি। অনুমোদন পেলে দুদকের এই তদন্ত বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।’

দুর্নীতি দমন কমিশনের নির্দেশে গঠিত তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটির প্রধান হচ্ছেন (দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-২-এর সহকারী পরিচালক) রতন কুমার দাশ। অন্য দুই সদস্য হলেন উপসহকারী পরিচালক শরিফ উদ্দিন ও উপসহকারী পরিচালক জাফর সাদেক শিবলী।
গতকাল বিকেলে দুদক চেয়ারম্যানের কাছে জমা দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনের একটি কপি কালের কণ্ঠের হাতে এসেছে। 

পরিবারকেন্দ্রিক দুটি সিন্ডিকেট
রোহিঙ্গাদের অবৈধ উপায়ে ভোটার করতে নির্বাচন কমিশনের কমপক্ষে দুটি সিন্ডিকেটের সন্ধান পায় দুদক এনফোর্সমেন্ট টিম। এর একটির নিয়ন্ত্রক চট্টগ্রাম ডবলমুরিং থানা নির্বাচন অফিসের পিয়ন জয়নাল আবেদীন। অন্য গ্রুপটি পরিচালনা করেন নির্বাচন কমিশন প্রধান কার্যালয়ের এনআইডি প্রজেক্টে কর্মরত টেকনিক্যাল এক্সপার্ট শাহানূর মিয়া। এর মধ্যে জয়নাল আবেদীনকে গত ১৭ সেপ্টেম্বর ইসির এনআইডি উইংয়ের তদন্তদল আটক করে চুরি হওয়া নির্বাচন কমিশনের একটি নিবন্ধিত ল্যাপটপসহ পুলিশে সোপর্দ করে। তাঁর বিরুদ্ধে কোতোয়ালি থানায় মামলা করা হয়েছে। 

এই জয়নালের অন্তত ১০ জন আত্মীয় চাকরি করছেন নির্বাচন কমিশনে। ২০০৪ সালে নির্বাচন কমিশনে যোগ দেন জয়নাল। একই সময়ে তাঁর ভগ্নিপতি নুর আহমদও যোগ দেন অফিস সহায়ক পদে। নুর আহমদ এখনো আছেন চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন অফিসে। আবার কক্সবাজার জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ের অফিস সহকারী মোজাফফর হচ্ছেন গ্রেপ্তার জয়নালের খালাতো ভাই। রাঙামাটি জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ের উচ্চমান সহকারী মোহাম্মদ আলীও জয়নালের নিকটাত্মীয়। আর কমিশন সচিবালয়ে কর্মরত প্রশাসনিক কর্মকর্তা ওসমান গণি এই মোহাম্মদ আলীর ভাগ্নে।

জয়নাল সিন্ডিকেটের অন্য সদস্যরা হলেন ঢাকায় এনআইডি প্রজেক্টে আগে কর্মরত টেকনিক্যাল এক্সপার্ট সত্য সুন্দর দে ও সাগর (দুজনই সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের দায়ের করা মামলার আসামি), জয়নাল আবেদীনের স্ত্রী, জেলা নির্বাচন অফিসে আউটসোর্সিংয়ের কাজ করা রিশি। এ ছাড়া রোহিঙ্গা সরবরাহ করেন জয়নাল আবেদীনের বেতনভুক্ত সেক্রেটারি জাফর, অস্থায়ী অপারেটর সৈকত বড়ুয়া, শাহজামাল, পাভেল বড়ুয়া, জয়নালের বোন-জামাই বয়ান উদ্দিন ও জনপ্রিয় বড়ুয়া। কক্সবাজার থেকে রোহিঙ্গাদের নিয়ে আসেন কক্সবাজার জেলার নির্বাচন অফিসের অফিস সহায়ক মোজাফফর ও দালাল নজিবুল্লাহ।

গ্রেপ্তার জয়নাল আবেদীন নির্বাচন কমিশনের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সচিব মোহাম্মদ জকরিয়ার ভাগ্নে। জয়নাল ও জকরিয়া দুজনের বাড়িই বাঁশখালী উপজেলায়। জয়নালের আত্মীয়-স্বজন যাঁরা নির্বাচন কমিশনে চাকরি করছেন, তাঁদের বেশির ভাগের বাড়িও বাঁশখালীতে। এই সিন্ডিকেটের সবাই ২০০৪ সালে মোহাম্মদ জকরিয়ার সুপারিশে চাকরি পেয়েছেন বলে দুদক তাদের রিপোর্টে উল্লেখ করেছে।

রোহিঙ্গাদের অবৈধ উপায়ে ভোটার করতে নির্বাচন কমিশনের দ্বিতীয় সিন্ডিকেটটি হলো শাহানুর গ্রুপ। তিনি নির্বাচন কমিশন প্রধান কার্যালয়ের টেকনিক্যাল এক্সপার্ট হিসেবে এনআইডি প্রজেক্টে কর্মরত। তাঁর ১০-এর অধিক নিকটাত্মীয় মাঠ প্রকল্পের প্রায় প্রতিটি ভোটার তালিকা হালনাগাদ কর্মসূচিতে কর্মরত বলে খোঁজ পেয়েছে দুদক। তাঁর সিন্ডিকেটে রয়েছেন চট্টগ্রাম জেলার পাঁচলাইশ নির্বাচন অফিসের অপারেটর তাসলিমা আক্তার, চট্টগ্রাম জেলার ডাবলমুরিং নির্বাচন অফিসে তাঁর আপন ছোট ভাই শাহজামাল, চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী নির্বাচন অফিসের অপারেটর তাঁর ভাগিনা জাহিদ হোসেন, কক্সবাজার সদর নির্বাচন অফিসের অপারেটর শাহানুরের খালাতো ভাই নঈম ইসলাম, আরেক খালাতো ভাই শাহ আলম বোয়ালখালী নির্বাচন অফিসের অপারেটর ও শাহানুর মিয়ার বন্ধু কক্সবাজার রামু নির্বাচন অফিসের অপারেটর হিরো। এ ছাড়া হালনাগাদে আরো রয়েছেন শাহানুরের আপন খালাতো দুই বোন অপারেটর ইয়াসমিন আক্তার রূপা ও ফারজানা আক্তার। শাহানুর মিয়ার মামা শহীদুল্লাহ তাঁকে লোকবল সংগ্রহ করে এসব অপকর্মে সহায়তা করেন।

উল্লেখ্য, শাহানুর মিয়ার বাড়ি চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলায়। তাঁর সিন্ডিকেটের অন্যদের বাড়িও আশপাশের উপজেলায়। 

মামলার এজাহার নিয়ে প্রশ্ন
দুদক তদন্ত শুরুর পর তড়িঘড়ি করে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জয়নালকে আটক করে তাঁর বিরুদ্ধে নগরীর কোতোয়ালি থানায় যে মামলা রুজু করা হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দুদক কর্মকর্তারা। কারণ হিসেবে তাঁরা জানান, কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্তৃক দুদকের তফসিলভুক্ত অপরাধের জন্য কোনো মামলা রুজু/রেকর্ড করার ক্ষমতা থানা-পুলিশের নেই। কারণ দুদক বিধিমালা-২০১৯ সংশোধনে বলা হয়েছে, দুদকের তফসিল অপরাধের মামলা দুদক কার্যালয়ে রেকর্ড করতে হবে। সে মোতাবেক ইসির মামলাটিও রেকর্ড করার আইনত ক্ষমতা একমাত্র উপপরিচালক দুদক, চট্টগ্রামের। কী কারণে ইসি কর্তৃক মামলাটি দুদকের তফসিলের বাইরে করা হয়েছে এবং কোন স্বার্থে কোন কোন রাঘব বোয়ালকে বাঁচানোর অপচেষ্টায় দুদককে পাশ কাটিয়ে একটি ত্রুটিযুক্ত মামলা করা হলো তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন দুদক কর্মকর্তারা।

২০১৪ সালে হারিয়ে যাওয়া ল্যাপটপ দিয়ে ২০১৫ সালে ভোটার হন নূরু ডাকাত
নির্বাচন অফিস থেকে জানানো হয়, আলোচিত ৪৩৯১ নম্বর আইডি ল্যাপটপটি ২০১৪ সালে ভোটার তালিকা হালনাগাদের সময় হারিয়ে যায়। চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মুনীর হোসাইন খান বর্ণিত ল্যাপটপটি গত ২০১৪ সালে হারিয়ে যায় মর্মে মৌখিক তথ্য প্রদান করলেও এ বিষয়ে কোনো জিডি কিংবা অফিশিয়াল নোটিং সরবরাহ করতে পারেননি। সম্প্রতি বন্দুকযুদ্ধে নিহত রোহিঙ্গা ডাকাত সর্দার নুর আলমের এনআইডিটি ল্যাপটপ নং ১৫৫৭-৪৩৯১ (১৫৫৭ হলো পাঁচলাইশ উপজেলার আইডি এবং ৪৩৯১ হলো ল্যাপটপ আইডি) ব্যবহার করে করা হয়েছিল বলে দুদক জানতে পেরেছে।

সন্দেহ তিন ট্রাভেল এজেন্সিকে
বাবুস সালাম ট্রাভেল এজেন্সি, কর্ণফুলী ট্রাভেল এজেন্সি ও চট্টগ্রামের বিবিরহাটের নূর ট্রাভেলস রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট প্রদানে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা