kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৫ অক্টোবর ২০১৯। ৩০ আশ্বিন ১৪২৬। ১৫ সফর ১৪৪১       

রোহিঙ্গাদের এনআইডি

চুনোপুঁটি ধরা রাঘব বোয়ালরা ছোঁয়ার বাইরে!

রাশেদুল তুষার, চট্টগ্রাম   

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০৩:০৭ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



চুনোপুঁটি ধরা রাঘব বোয়ালরা ছোঁয়ার বাইরে!

চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানা নির্বাচন অফিসের পিয়ন জয়নাল আবেদীনকে আটক এবং নির্বাচন কমিশনের হারানো ল্যাপটপ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে রোহিঙ্গা ভোটার ও জাতীয় পরিচয়পত্র কার্ড দেওয়ার ঘটনার জট খোলা হয়েছে। নির্বাচন অফিসের এই পিয়ন বাইরের চারজন সহযোগীর মাধ্যমে সিন্ডিকেট তৈরি করে দীর্ঘদিন এনআইডি কার্ড জালিয়াতি করে আসছিলেন। তবে ঊর্ধ্বতন কারো সহযোগিতা ছাড়া একজন নন-টেকনিক্যাল অফিস পিয়ন দীর্ঘদিন ধরে এত বড় নিখুঁত জালিয়াতির ঘটনা চালিয়ে যাবেন এবং সেটি তদন্তে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) টেকনিক্যাল কর্মকর্তাদের রীতিমতো ঘোল খাওয়াবেন, এটা নির্বাচন অফিসের কর্মকর্তাদেরও বিস্মিত করেছে।

তদন্তের দায়িত্বে থাকা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কর্মকর্তাদের মতেও একজন অফিস পিয়ন বর্তমানে নির্বাচন অফিসসংশ্লিষ্ট নয় এমন সহযোগীদের সহায়তায় এত পরিকল্পিতভাবে শক্তিশালী এনআইডি সার্ভারে হানা দেবেন, সেটা ঠিক বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। একাধিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও দুদক সূত্রের বরাতে মনে করা হচ্ছে, জয়নাল আবেদীনকে সামনে ঠেলে দিয়ে পেছনের রাঘব বোয়ালরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। জয়নাল চক্রকে আটক করা এনআইডি উইংয়ের তদন্তদলও গতকাল রাতে ঢাকায় ফিরে গেছে। তবে মামলায় নগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের তদন্তে হয়তো জালিয়াতির নেপথ্যে থাকা চক্রের তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে মনে করে তারা।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, কয়েকজন ভোটার হতে ইচ্ছুক রোহিঙ্গার তথ্য হাতে জমা হলেই জয়নাল মূলত বৃহস্পতিবার বন্ধের দিন অফিস থেকে গোপনে ডিএসএলআর ক্যামেরা, ফিঙ্গার প্রিন্ট স্ক্যানার, সিগনেচার প্যাড তাঁর বাসায় নিয়ে যেতেন। আর শুক্র ও শনিবার বন্ধের দিনে বাসায় বসে সে ল্যাপটপের সঙ্গে সেসব সরঞ্জাম জুড়ে তথ্য তৈরি (ডাটা ক্রিয়েট) করে তাতে রোহিঙ্গাদের আঙুলের ছাপসহ মেইলে ঢাকায় জাতীয় পরিচয়পত্র জালিয়াতি চক্রের অন্য সদস্য সাগরের কাছে পাঠাতেন। আবার রবিবার অফিস খোলার দিন আগেভাগে অফিসে এসে সব কিছু যথাস্থানে রেখে দিতেন।

পরে সাগর নির্বাচন কমিশনের সার্ভারে অবৈধভাবে ঢুকে তথ্য আপলোডসহ যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করে জাতীয় পরিচয়পত্রের প্রিন্ট কপি এসএ পরিবহনের মাধ্যমে জয়নালের কাছে পাঠিয়ে দিতেন। প্রতিটি পরিচয়পত্র তৈরির জন্য জয়নাল রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা করে নিতেন।

নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো নতুন ভোটারের যাবতীয় তথ্য ক্লায়েন্ট সার্ভারের নির্ধারিত ফরমেটে এন্ট্রি করার পর সেটি এনআইডি ডাটাবেইসের মেইন সার্ভারে আপলোড দিতে হয়। এই মেইন সার্ভারে ঢোকার জন্য যে পাসওয়ার্ড থাকে সেই গোপনীয় নম্বরগুলো শুধু সংশ্লিষ্ট থানা ও উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কাছেই থাকে।

একজন উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একটি উপজেলা বা থানার এনআইডি ডাটা সংশ্লিষ্ট উপজেলার সার্ভার থেকেই দিতে হবে। এ ছাড়া ঢাকার সেন্ট্রাল অফিসে যাঁরা সার্ভারের দায়িত্বে আছেন তাঁরা মেইন সার্ভারে আপলোড দিতে পারবেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে রোহিঙ্গাদের ভোটার করার যে জালিয়াতির তদন্ত কমিটি খুঁজে পেয়েছে সেখানে দেখা গেছে, পাশাপাশি ফরমের ভোটার কিন্তু আপলোড হয়েছে কোনোটা চট্টগ্রাম শহরের কোতোয়ালির বাকলিয়া ওয়ার্ড, সাতকানিয়া, বাঁশখালী কিংবা কক্সবাজার সদর ও টেকনাফের সার্ভারের আইডি ব্যবহার করে। চক্রটি কিভাবে এতগুলো মেইন সার্ভারের পাসওয়ার্ড পেল সেটাই রহস্যজনক।’

জানা গেছে, জয়নাল আবেদীন মঙ্গলবার গ্রেপ্তারের পর পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে চট্টগ্রাম আঞ্চলিক ও জেলা নির্বাচন অফিসের খায়ের, মোজাম্মেল, আনোয়ার, বোয়ালখালীর নির্বাচন অফিসের টেকনিক্যাল সাপোর্ট স্টাফ ও দালাল নজিবুল্লাহর তথ্য দিয়েছেন। দেখা যাচ্ছে যাদের নাম এসেছে তাদের সবাই নির্বাচন অফিসের তৃীয় অথবা চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। জালিয়াতচক্রের বিস্তার শুধু চুনোপুঁটির মধ্যেই ঠিক এ তথ্যটি বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না দুদক কর্মকর্তাদের কাছে। পূর্ণাঙ্গ তদন্তের অনুমতি পেলে সন্দেহের ভিত্তিতে প্রয়োজনে নির্বাচন অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব নেওয়া হবে।

নির্বাচন কমিশনের তদন্ত নিয়ে মন্তব্য করতে না চাইলেও দুদক তদন্তদলের প্রধান ও দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-২-এর সহকারী পরিচালক রতন কুমার দাশ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রাথমিক তদন্তে আমরা এনআইডি জালিয়াত সিন্ডিকেটের বেশ কিছু তথ্য পেয়েছি। সেই তথ্যের ভিত্তিতে আমরা আজকালের মধ্যে আমাদের প্রধান কার্যালয়ে প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্ট পাঠাব। প্রাথমিক তদন্তে যে তথ্য পেয়েছি তাতে মনে হচ্ছে, এখানে বিস্তারিত তদন্তের সুযোগ রয়েছে। আমরা সেই অনুমোদন চাইব।’

তবে শুধু একজন পিয়নের সিন্ডিকেট এত বড় ও সুপরিকল্পিত জালিয়াতি করতে পারে বলে দুদক মনে করে না। পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানে পুরো সিন্ডিকেটকে চিহ্নিত করা সম্ভব হবে বলে দুদকের এই কর্মকর্তা জানান।

এ প্রসঙ্গে জানতে চট্টগ্রাম সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মুনির হোসাইন খানের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি তদন্তাধীন ব্যাপারে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা