kalerkantho

বুধবার । ২৩ অক্টোবর ২০১৯। ৭ কাতির্ক ১৪২৬। ২৩ সফর ১৪৪১                 

নিয়ম না মেনেই জমিতে কীটনাশক ছিটাচ্ছেন কৃষকরা

স্বাস্থ্য ঝুঁকিকে বিরামপুরের ৩৮ হাজার কৃষক

বিরামপুর (দিনাজপুর) প্রতিনিধি   

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ১৭:৫২ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



স্বাস্থ্য ঝুঁকিকে বিরামপুরের ৩৮ হাজার কৃষক

নাকে-মুখে কোনো মাস্ক বা কাপড় নেই। হাতে নেই কোনো হাত মোজা বা গ্লাভস। কাঁধের মধ্যে ঝোলানো কিটনাশকের মেশিন। মুখে একটা বিড়ি নিয়ে মাঠে বিস্তিন্ন ধানক্ষেতে কিটনাশক স্প্রে করছেন দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার উত্তর কাটলা (মাটাল) গ্রামের জার্মান মুরমুই নামের এক কৃষক। ছবি তুলতে গেলে হাসতে হাসতে তিনি বলেন, ‘হামার গাঁওত (গ্রামে) সবাই তো জমিতে এ্যাংকা (এমন) করেই বিষ ছিটায়’।

কৃষক জার্মান মুরমুই বলেন, বিষ গিলে খাইলেও হামার কিচ্চু হবে না, সারাজীবন তো এ্যাংকা করেই (এ ভাবেই) হারা জমিত বিষ ছিটে আওছি (আসছি)’! 

উপজেলার বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকরা ভরদুপুরে তাদের জমিতে কীটনাশক স্প্রে করছেন। কারও নাকে-মুখে কোনো কাপড় বা মাস্ক নেই। অনেক কৃষককে দেখা গেল তারা টি-শার্ট পরে জমিতে কীটনাশক স্প্রে করছেন। কেউবা আবার ধানের জমিতে সারের সাথে আগাছানাশক মিশিয়ে গ্লাভস ছাড়াই হাত দিয়ে ছিটাচ্ছেন। কীটনাশকের প্যাকেট বা বোতলের গায়ে স্পষ্ট অক্ষরে 'বিষ' লেখা থাকলেও তা কেউ আমলেই নিচ্ছেন না। নিয়মনীতি না মেনেই এলাকার কৃষকরা যে যার মত করে জমিতে কীটনাশক ছিটাচ্ছেন।

দাউদপুর গ্রামের কৃষক মহাসিন আলী কাজী কালের কণ্ঠকে বলেন, জমিতে কীটনাশক স্প্রে করার বিষয়ে উপজেলা কৃষি অফিস থেকে কোনো প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না। এমনকি এলাকার ব্লক সুপারভাইজার কীটনাশক প্রয়োগ বিষয়ের উপর কোনো পরামর্শ দেয় না।

তিনি বলেন, ত্রিশ বছর থেকে কৃষি কাজ করি, একদিনও তো কোনো অফিসার এসে আমাদের গ্রামে আমাদেরকে কীটনাশক স্প্রে করার ব্যাপারে কোনো প্রশিক্ষণ দেননি বা সতর্ক করেননি।

কেশবপুর গ্রামের কৃষক আতাউর রহমানকে দেখা গেল তিনি হাফহাতা শার্ট গায়ে দিয়ে জমিতে কীটনাশক স্প্রে করছেন। খালি গায়ে কেন এ কাজ করছেন এমন প্রশ্নের উত্তরে কথা ঘুরিয়ে তিনি বললেন, ‘বাড়িতে গিয়ে সাবান দিয়ে ভালো করে গা ধুইলেই তো সব পরিষ্কার হবে’।

উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য মতে, চলতি বছরে বিরামপুর উপজেলায় প্রায় ১৭  হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধান ও ১৭০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরণের (খরিপ-২) সবজি চাষ হচ্ছে। এসব জমিতে আমন ধান ও সবজিকে ক্ষতিকর কীটপতঙ্গের হাত থেকে রক্ষা করতে কৃষকরা বিভিন্ন ধরণের কীটনাশক ও ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ‘সুষম তরল সার’ জাতীয় পিজিআর ভিটামিন ও হরমোন স্প্রে করছেন।

উপজেলা বিসিআইসি সার ও পদ্মা ওয়েল কোম্পানির কীটনাশকের ডিলার দিলিপ কুণ্ডু কালের কণ্ঠকে বলেন, বিভিন্ন কীটনাশক পণ্য উৎপাদনকারী কোম্পানি আমাদের যখন প্রশিক্ষণ দেন তখন তারা আমাদেরকে জমিতে কীটনাশক ব্যবহার করার সময় নাকে-মুখে মাস্ক ও হাতে গ্লোভস ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। আর সেই পরামর্শগুলোই কীটনাশক বিক্রয়ের সময় আমি সাধারণ কৃষকদের দিয়ে থাকি।

জানতে চাইলে বিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. সিরাজুল ইসলাম মুঠোফোনে কালের কণ্ঠকে বলেন, মুখে মাস্ক ও হাতে গ্লোভস ব্যবহার না করে কেউ কীটনাশক স্প্রে করলে তিনি বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হতে পারেন। এ ছাড়াও ওই ব্যক্তি মাথা ব্যথা, মাথা ঘোরানো, বমিবমি ভাব, চর্মরোগ, চোখ ও শরীরে এলার্জি, শ্বাসকষ্ট এমন কি ফুসফুসে বড় ধরণের রোগও হতে পারে।

তিনি বলেন, সাবধানতার সহিত কীটনাশক ব্যবহার না করলে যে কৃষকরা অবশ্যই ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে, বিয়টি নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোর দরকার।

এ ব্যাপারে বিরামপুর উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ নিকছন চন্দ্র পাল কালের কণ্ঠকে বলেন, কৃষকদেরকে উপজেলায় ডেকে এনে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। তবে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ সহকৃষি অফিসারগণ মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে উঠান বৈঠকের মাধ্যমে কৃষকদেরকে জমিতে কীটনাশক প্রয়োগের সময় সতর্কতা অবলম্বন করতে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কৃষি অফিসে জনবল কম থাকায় এ সমস্যা সমাধানে আরও সময় লাগবে। 

তিনি বলেন, উপজেলায় প্রায় ৩৮ হাজার কৃষক রয়েছেন। তাদের মধ্যে আগামী মাসেই উপজেলার কৃষি অফিসের উদ্যোগে একটি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা