kalerkantho

সোমবার । ২১ অক্টোবর ২০১৯। ৫ কাতির্ক ১৪২৬। ২১ সফর ১৪৪১       

পিয়নের নামে রেললাইন প্রকল্পের টাকা আত্মসাত

ফকিরহাট-মোল্লাহাট (বাগেরহাট) প্রতিনিধি   

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ১৫:২৮ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পিয়নের নামে রেললাইন প্রকল্পের টাকা আত্মসাত

বাগেরহাটের সড়ক ও জনপদ বিভোগের পিয়ন সিরাজুল ইসলাম ও তার ছেলে আরাফাত হোসেন। ছবি : কালের কণ্ঠ

বাগেরহাটের ফকিরহাটে সড়ক বিভাগের কোটি টাকার সম্পত্তি দখলের পর খুলনা-মোংলা রেললাইন প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্তদের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে সড়ক ও জনপদ বিভোগের সেই কোটিপতি পিয়নসহ তার পুত্র ও আত্মীয়-স্বজনের নামে। 

অভিযোগের সূত্র ধরে অনুসন্ধানে জান যায়, খুলনা-মোংলা রেললাইন স্থাপন প্রকল্পে ফকিরহাট উপজেলার লখপুর ইউনিয়নের জাড়িয়া মাইট কুমড়া মৌজায় এস এ ১১৭৬ দাগের মালিক মৃত আলতাপ হোসেনের স্ত্রী আম্বিয়া বেগম। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসছেন এ জমিতে। ওই জমির অধিগ্রহণ হওয়া অংশের ২৬/৫ নং ক্রমিকের যৌথ ফিল্ড বহি অনুষারে ৮০৭টি বিভিন্ন গাছপালার ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন মাত্র ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৭৪০ টাকা।

জমির মালিক মৃত আলতাপ হোসেনের পুত্র আজাহার বলেন, সার্ভেয়ার কামাল হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের একটি চক্রের সহযোগী দালাল আজিজুল হক মাতুব্বরের চাওয়া ঘুষের টাকা দিতে না পারায় তাদের গাছের টাকা কম দেওয়া হয়েছে। তাদের অংশে থাকা আরো ১৪৪টি গাছের ক্ষতিপূরণের মূল্য ১৪ লাখ ১৪ হাজার ৯৮৭ টাকা আজিজুল হকের ভাই ইমান আলীর পুত্র সিরাজুল ইসলামের নামে উত্তলন করা হয়েছে। সিরাজের এ দাগে কোনো গাছ পালা ছিল না। যা স্থানীয়দের সাথে আলাপ করলে জানতে পারবেন। সবই কর্মকর্তার আশির্বাদ। তিনি প্রকৃত ক্ষতিপূরণের টাকা পেতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

সার্ভেয়ার কামাল এ প্রসঙ্গে বলেন, আমি যার কথা বলে দিয়েছি আমার লোক তাকে কি করে দিয়েছে কর্মকর্তারা তা আপনাকে বলে বোঝাতে পারব না।

তবে কি সার্ভেয়ার কামাল হোসেনের ইশারায় প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার তাদের সম্পদের ক্ষতিপূরণের অর্থ থেকে বঞ্চিত হয়েছে? 

এ ব্যাপারে সিরাজুল ইসলামের প্রতিবেশি লখপুর ইউনিয়নের মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার খোরশেদ আলম বলেন, সার্ভেয়ার কামালের প্রধান সহযোগী আজিজুল হক মাতুব্বরের ভাই হওয়ার সুবাদে সিরাজুল ইসলাম ফাঁকা জমিতে গাছপালা দেখিয়ে সরকারি আর্থ আত্মসাৎ করেছে। তার ১১৭৬ দাগে ভোগ দখলীয় জমিতে কোনো গাছপালা ছিল না।

এটাই শেষ নয়, সিরাজুল ইসলামের পুত্র আরাফাত হোসেনের জাড়িয়া মাইট কুমড়া মৌজায় এস এ ৯৩১ দাগে কোনো জমি না থাকলেও গাছপালা ও ঘর বাড়ির ক্ষতিপূরণের ৭ লাখ ৬৩ হাজার ৯৫৪ টাকা উত্তোলন করেছেন। 

আরাফাত এ প্রসঙ্গে বলেন, জাড়িয়া মাইট কুমড়া মৌজার এস এ ৯৩১ দাগের সম্পত্তি আমার দাদা ইমাল আলীর। সার্ভে রিপোর্ট অনুযায়ী ৭ ধারা নোটিশ পেয়ে আমি টাকা উত্তোলন করেছি। 

দেখা যায়, ওই জমির দলিল এই দাগের সম্পত্তি ২০০৯ সালে সিরাজুল ইসলামের পিতা ইমাল আলী ২৩৪৩/০৯ ও ২৩৪৮/০৯ নং দলিলে রেজিট্রি করে দেন মো. শামছুর রহমান ও মো. ফজলুর রহমানের নামে। তবে কার সম্পদের ক্ষতিপূরণের টাকা তুলেছে আরাফাত?

অনুসন্ধানকালে কথা হয় এস এ ৯৩১ দাগের একটি অংশের জমির মালিক আফসার উদ্দিন শেখের সাথে। তিনি বলেন, ‘রেললাইন স্থাপন প্রকল্পে তার জমিতে থাকা সম্পদ ও অবকাঠামোর আংশিক ক্ষতিপূরণের টাকা উত্তোলন করতে পারলেও বাকি ঘরবাড়ি ও গাছপালা ক্ষতিপূরণ পাইনি। তা ভুয়া সার্ভে রিপোর্টে কাগজ কলমে আমার সম্পদের ক্ষতিপূরণের টাকা আরাফাতকে মালিক বানিয়ে আত্মসাৎ করেছে সার্ভেয়ার কামালসহ একটি চক্র। আরাফাত বা তার পিতার এ দাগে কোনো সম্পত্তি নেই। তিনি আরো বলেন, আমার ক্ষতিপূরণের টাকা ফেরত পেতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করার পরও কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি কর্মকর্তারা’।

এটাই শেষ নয়, সিরাজুল ইসলামের দুই শ্যালক লখপুর গ্রামের মৃত মফিজুরের পুত্র মো. মাহাবুব ও মো. আবুল কাশেম। জমির মালিক না হলেও তাদের নামে জাড়িয়া মাইট কুমড়া মৌজার এস এ ৯৩২ দাগে ২২/২ ক্রমিকের ঘরবড়ি ও গাছপালার যৌথ ফিল্ড বহি তৈরি হয়েছে। উত্তোলন হয়েছে ক্ষতিপূরণের টাকা। 

এ জমির প্রকৃত মালিক মিনহাজ উদ্দিনের পুত্র মুজিবর। তিনি বলেন, আমার জমিতে কোনো ঘর বাড়ি ছিল না। সার্ভেয়ার কামালের প্রধান দালাল আজিজুল হকের নেতৃত্বে তার আত্মীয়ের নামে আমার জমিতে থাকা গাছপালার ক্ষতিপূরণের টাকা উত্তোলন হয়েছে। কাগজ কলমে ঘর দেখিয়ে আত্মসাৎ করেছে সরকারি অর্থ। আমি আমার ক্ষতিপূরণের টাকা ফেরৎ পাওয়াসহ সরকারি অর্থ আত্মসাৎকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপ কামনা করছি’। 

আলাপ করা হয় সিরাজুল ইসলামের সাথে। তিনি অসুস্থ থাকায় তার পুত্র আরাফাতের সাথে কথা বলতে বলেন তিনি। এস এস ১১৭৬ দাগের গাছ পালার টাকা উত্তোলন প্রসঙ্গে সিরাজুল ইসলামের পুত্র আরাফাত বলেন, কর্মকর্তারা ভুল করলে তার দায় আমাদের না। সরেজমিনে পরিদর্শন করে যৌথ ফিল্ড বহি তৈরি করে ৭ ধারা নোটিশ আমাদের দেওয়া হয়েছে। তাই আমরা ক্ষতিপূরণের টাকা তুলেছি। তবে তার মামার নামে টাকা উত্তোলন প্রসঙ্গে তিনি কিছু বলতে রাজি হননি।

স্থানীয় অবসর প্রাপ্ত সেনা সদস্য বাবলুরজ্জামান বলেন, রেল লাইন প্রকল্পে যে স্থানে সিরাজুল ইসলামসহ তার পুত্র ও আত্মিয়ের নামে কোনো সম্পদ ছিল না সে স্থান থেকে লাখ লাখ টাকা ভুয়া মালিক সেজে উত্তোলন করেছে তারা। তাদের নামে একাধিক অভিযোগ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে করার পরেও দেশের আইন ব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলেছে তারা।

তিনি আরো বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত ৩০ এপ্রিল কালের কণ্ঠের ১৮ পাতায় 'ফকিরহাটের কোটি পতি পিয়ন' শিরোনামে সিরাজের বিরুদ্ধে সড়ক বিভাগের জায়গা দখল প্রসঙ্গে প্রকাশিত সংবাদ প্রসঙ্গে বাগেরহাট সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আনিসুর জামান মাসুদ বলেছেন, ঘটনাস্থাল পরিদর্শন করে দ্রুত আইন আনুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সাড়ে চার মাস অতিবাহিত হলেও কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি তিনি।

বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশিদ বলেন, আমি তো প্রকাশ্যে প্রিন্ট ও ইলেক্টনিক মিডিয়ার সামনে থেকে ক্ষতিপূরণের টাকা বিতরণ করছি। যাতে কোনো দুর্নীতি না হয়। আমি যোগদানের পর ঘোষণা দিয়েছি কোনো অবস্থাতেই যেন দুর্নীতি না হয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা