kalerkantho

খুলনা-মোংলা রেললাইন প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণে দুর্নীতি

দুর্নীতিবাজরা ভরছে পকেট আর ক্ষতিগ্রস্তরা ঘুরছে টেবিলে টেবিলে

ফকিরহাট-মোল্লাহাট (বাগেরহাট) প্রতিনিধি   

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:২৩ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দুর্নীতিবাজরা ভরছে পকেট আর ক্ষতিগ্রস্তরা ঘুরছে টেবিলে টেবিলে

বাগেরহাট জেলার ফকিরহাটে খুলনা-মোংলা রেললাইনের জমি অধিগ্রহণে নানা অনিয়ম দুর্নীতির মাধ্যমে রক্ষক নিজেই হলেন ভক্ষক। তারা ছিলেন বাগেরহাট এল এ শাখার সার্ভেয়ারসহ একটি চক্র। জমি অধিগ্রহণের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় স্থানীয়রা দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন দপ্তরে এ চক্রটির বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেও সরকারি অর্থ উদ্ধারে উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি সংশ্লিষ্ট দপ্তর।

খুলনা-মোংলা রেললাইন স্থাপন প্রকল্পে বাগেহাটের ফকিরহাট উপজেলার লখপুর জাড়িয়া মাইট কুমড়া মৌজায় এস এ ৯৫০ দাগের অধিগহণকৃত সকল সম্পদ সম্পত্তির মূল্য উল্লখ করে চূড়ান্ত নোটিশ (৭ ধারা) ও সরেজমিনে থাকা অবকাঠামো ও গাছপালার বিবরণীতে (যৌথ ফিল্ড বহি) মো. আজিজুল হক ও তার ভাই মো. রফিকুল ইসলাম নাম ব্যবহার করে অবকাঠামোর ২৫ লাখ ৪১ হাজার ৮৫০ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। ওই দাগে যৌথ ফিল্ড বহিতে শুধু ঘরের কথা উল্লেখ আছে। তবে ৭ ধারা নোটিশে দেখান হয়েছে গাছপালা। 
কোথা থেকে এল এ গাছ যাননে চাওয়া হয় ওই দাগের জমিতে বসবাসকারী জমির মালিক আনোয়ারের কাছে।

তিনি বলেন, ৯৫০ দাগে অধিগ্রহণ হওয়া অংশে কোনো ঘরবাড়ি ছিল না। আজিজুল হকের এ দাগে কোনো সম্পত্তি নেই। সার্ভেয়ার কামাল হোসেন ও সার্ভেয়ার মনিরুজ্জামানসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের একটি চক্র কাগজ কলমে ঘর বানিয়েছেন। 

সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য তাছলিমা বেগম লতা বলেন, ইমান আলীর রফিকুল ইসলাম নামে কোনো ছেলে নেই। সরকারি অর্থ আত্মসাতের জন্য সবই বানিয়েছে কর্মকর্তারা।

এটাই শেষ নয়, জাড়িয়া মাইট কুমড়া মৌজায় এসএ ১১৬৫ দাগে অবস্থিত সম্পদের বিবরণী উল্লেখ করে সার্ভেয়ার কামাল ও মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে দুটি যৌথ ফিল্ড বহি তৈরি হয়েছে। জমির প্রকৃত মালিক আব্দুর সত্তার। তার ছেলে মো. ইসরাফিল শেখের নামে শুধু অবকাঠামোর যৌথ ফিল্ড বহি তৈরি হয়েছে। তবে ওই জমিতে থাকা গাছপালা ও অবকাঠামের ভুয়া মালিক দেখিয়ে যৌথ ফিল্ড বহি তৈরি হয়েছে মোস্তাক শেখের নামে।

বিষটি প্রকৃত জমি মালিক জানতে পেরে জেলা প্রশাসক বরাবর ২৪ জানুয়ারি ২০১৮ তারিখে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগের পরিপেক্ষিতে সরেজমিনে তদন্তে আসেন ১৫ মার্চ ২০১৮ তারিখে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কামরুল ইসলাম। তবে এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি সংশ্লিষ্ট দপ্তর। বরং ৭ ধারা নোটিশে এস এ ১১৬৫ দাগের পরিবর্তে হাতে কলমে ১১৭৭ দাগ লিখে ঘরবাড়ি ও গাছ পালার ২৫ লক্ষ ৪৮ হাজার ৭২৯ টাকা উাত্তলন করা হয়েছে লখপুর এলাকার ইমান আলীর পুত্র মোস্তাকের নামে।

আ. সত্তার অভিযোগ করে বলেন, সরেজমিনে তদন্ত করে কাগজপত্র অনুসারে আমার জমির শ্রেণি বাস্ত লেখা হয়েছিল ক্রমিক নং ৩২ অনুযায়ী যৌথ ফিল্ড বহিতে। সার্ভেয়ার কামালসহ এ চক্রটির নানা অনিয়ম দুর্নীতি প্রসঙ্গে অভিযোগ করায় পরবর্তীতে আমার জমির শ্রেণি হয়ে গেছে বিলীন। বিষয়টি লিখিতভাবে জমির সকল কাগজপত্র সংযুক্ত করে দুইবার অভিযোগ করা হয়েছে জেলা প্রশাসকের কাছে। আমর সম্পদের ক্ষতিপূরণ ৩২/১নং ক্রমিকে ভুয়া যৌথ ভিল্ড বহি তৈরি করে আত্মসাৎ করা হয়েছে মোস্তাকের নামে। আমার ভাগ্যে জোটেনি কানাকড়িও। জমি ও সম্পদের ক্ষতিপূরণের টাকা উত্তলন করতে আমাকে ধর্না দিতে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের টেবিলে টেবিলে।

জমির দলিল অনুষারে দেখা যায়, ১১৭৭ দাগে মোস্তাক শেখের কোনো জমি নেই। জমির প্রকৃত মালিক আব্দুর রহমান। কথা হয় তার সাথে। এ চক্রটির অনিয়ম দুর্নীতির হাত থেকে রেহাই পাননি দরিদ্র ভ্যানচালক আব্দুর রহমানও।

তিনি বলেন, আমার জমিতে থাকা গাছপালা ও অবকাঠাম ক্ষতিপূরণ এসেছে ৮ লাখ ৬৫ হাজার ৪৪০ টাকা। আমি পেয়েছি মাত্র ৪ লাখ ২৮ হাজার টাকা। বাকি টাকা সার্ভেয়ার কামালের যোগসাজসে ৭ ধারা নোটিশে আমার ভাই বানিয়ে রফিকুলের নামে উত্তোলন করা হয়েছে।

বিষয়টি আর গভীরে অনুসন্ধানে গিয়ে ২৮ নং ক্রমিকের ১১৭৭ দাগের যৌথ ফিল্ড বহিতে দেখা যায় রফিকুল ইসলামের পিতার নাম মৃত মোকছেদুল হক। স্থানীয় ইউপি সদস্য ফিরোজ খান জানান, রফিকুল নামে কাউকে আমরা চিনি না। এমকি এই জমিতে তার কোনো সম্পদ বা সম্পত্তি কখনোই ছিল না।

তবে কে এই রফিকুল। জানা যায়, সার্ভেয়ার কামাল হোসেনের মামাতো ভাই রবিউল ইসলাম ওরফে রফিকুল ওরফে ছাবু। তিনি খুলনার মোল্লারবাগ ইস্ট সার্কুলার রোর্ডের ৫২/২ দক্ষিণ টুটপাড়া এলাকার মৃত মকছেদুল হকের পুত্র।

রফিকুলের (রবিউল ইসলাম ছাবু) কাছে জানতে চাওয়া হয় খুলনা-মোংলা রেললাইন প্রকল্পে জাড়িয়া মাইটকুমড়া মৌজায় তার কোনো জমি বা সম্পদ অধিগ্রহণ হয়েছে কি না? তিনি এক কথায় উত্তর দেন 'না'। তবে এর বাইরে কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে রাজি হয়নি তিনি।

অনিয়ম ও দুর্নীত প্রসঙ্গে বাগেহাটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) শাহিন হোসেন বলেন, আমাদের অফিসাররা সরেজমিনে গিয়ে তদন্ত করে ফিল্ড সিডিউলে (যৌথ ফিল্ড বহি) স্বাক্ষর করেছে। আমি বলবো না এক দম সব ফ্রেস হয়েছে। যোদি কেউ ইচ্ছা করে চালাকি করে একজনের টাকা দুইবার নেওয়া সম্ভব। যদি কেউ এরকম করে থাকে তাহলে আমরা তার বিরুদ্ধে মামলা করে টাকা ফেরত এনে যার টাকা তাকে ফেরত দেব। আমাদের কাছে এমন আইন আছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা