kalerkantho

রোহিঙ্গা সমাবেশের নেপথ্যে যারা

নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার   

৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ২৩:৪১ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



রোহিঙ্গা সমাবেশের নেপথ্যে যারা

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গত ২৫ আগস্টের লাখো সমাবেশের নেপথ্যে আর্থিকসহ নানাভাবে ভূমিকা পালনকারী বেশ কিছু এনজিও, ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানকে শনাক্ত করা হয়েছে। শনাক্ত করা ব্যক্তির মধ্যে রোহিঙ্গা ছাড়াও কক্সবাজারের কয়েকজন পেশাজীবীর নামও রয়েছে। কক্সবাজারের প্রশাসন এবং গোয়েন্দা সূত্রের প্রাথমিক শনাক্ত করা একটি প্রতিবেদন ইতিমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকটও পাঠানোর কথা জানা গেছে। তবে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা এসব অস্বীকার করেছেন।

জানা গেছে, মিয়ানমারের নির্যাতনের শিকার হয়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পালিয়ে আসার দুই বছর পূর্ণ উপলক্ষে গত ২৫ আগস্ট সমাবেশটির আয়োজন করা হয়েছিল। কুতুপালং ক্যাম্পের বর্ধিত-৪ নম্বর ব্লকে বিশাল এই সমাবেশের আয়োজন করা হয় রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহর সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস এন্ড হিউম্যান রাইটস (এআরএসপিএইচ), ভয়েস অব রোহিঙ্গা এবং রোহিঙ্গা রিফিউজি কাউন্সিল (আরআরসি)-এর উদ্যোগে। এ ব্যাপারে রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইনচার্জের (সিআইসি) কাছে লিখিত আবেদন জানিয়েছিলেন। কিন্তু অনুমতি ছাড়াই সেদিনের সমাবেশটি করা হয়েছিল।

সমাবেশের জন্য সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছেন কক্সবাজারের উখিয়া ডিগ্রী কলেজের মাসুদ ভুঁইয়া নামের একজন প্রভাষক। সেদিনের সমাবেশে মাসুদ ভুঁইয়া সার্বক্ষণিক মঞ্চে রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহর পাশে বসাছিলেন।

জানা গেছে, উখিয়ার সিকদার বিল গ্রামের বাসিন্দা মাসুদ ভুঁইয়া রোহিঙ্গা বংশোদ্ভুত বাংলাদেশি নাগরিক। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি রোহিঙ্গাদের নানা কর্মকাণ্ডে জড়িত। এমনকি মাসুদ ভুঁইয়া মুহিবুল্লাহর সংগঠনেরও একজন অন্যতম উপদেষ্টা। তবে মাসুদ ভুঁইয়া জানিয়েছেন, তিনি একজন মানবাধিকার কর্মী। তিনি সমাবেশটিতে গিয়েছিলেন আমন্ত্রিত হয়েই।

সেই সঙ্গে মুহিবুল্লাহর সংগঠন-এআরএসপিএইচ-এর উপদেষ্টা হিসাবে রাজধানী ঢাকায় কর্মরত দুলাল মল্লিক নামের একজন আইনজীবীসহ কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির আরো দুই আইনজীবীর নামও উঠে এসেছে। আইনজীবী দুলাল মল্লিক উখিয়ার বাসিন্দা। তবে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। অপর দুইজনের একজন উখিয়ার বাসিন্দা অ্যাডভোকেট আবদুর রহিম। তিনি কক্সবাজারে দুদকের নিয়োজিত আইনজীবী হিসাবে কর্মরত।

অপরজন টেকনাফের বাসিন্দা অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান কক্সবাজার জেলা ও দায়রা আদালতে সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর হিসাবে কর্মরত। তারা দুইজনই কালের কণ্ঠকে বলেছেন- ‘আমরা রোহিঙ্গা মুহিবুল্লাহকেও কোনোদিন দেখিনি। কিভাবে তার সংগঠনে আমাদের নাম থাকবে সেটাই বুঝছি না।’

অপরদিকে মুহিবুল্লাহর সংগঠনের উপদেষ্টা হিসাবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপকের নামও এসেছে। ড. ফরিদুল আলম নামের ওই অধ্যাপকের পরিচয় সম্পর্কে অবশ্য কিছুই জানা যায়নি।

এই সমাবেশের জন্য অনেক সংস্থার প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ মদদ রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কর্মরত সেবা সংস্থা ‘কারিতাস’ সেদিনের রোহিঙ্গা সমাবেশে মদদদাতাদের মধ্যে অন্যতম ভূমিকা পালন করে বলেও জানা গেছে। সমাবেশ চলাকালীন কুতুপালং এক্স-৪ এ কারিতাসের যেসব অফিস ছিল, সেদিন তা অঘোষিতভাবে বন্ধ রেখে We want justice for Rohingya নামের একটি সংগঠনকে ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছিল। সংস্থার লোকজনকেও সেদিন সমাবেশেরে কাজে লাগানো হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে কারিতাসের কর্মকর্তারা। কারিতাস সংস্থার চট্টগ্রামস্থ প্রকল্প পরিচালক মাজহারুল ইসলাম জানান- ‘কারিতাস রাষ্ট্রবিরোধী কোনো কাজ করে না। তাই ২৫ আগস্ট আমাদের লোকজন ক্যাম্প ছিল এবং কার্যক্রমও চলমান ছিল।’

এসব বিষয়ে কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নিকারুজ্জামান চৌধুরী তদন্ত প্রতিবেদন প্রদানের কথা অস্বীকার করে বলেছেন- ‘বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। অনেক কিছুই আমাদের নজরেও এসেছে। আমরা সব বিষয় খতিয়ে দেখছি। এছাড়াও অন্যান্য যেসব এনজিও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে রোহিঙ্গা সমাবেশে মদদ দিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

জানা গেছে, ২৫ আগস্টের রোহিঙ্গা সমাবেশকে কেন্দ্র করে দেশি-বিদেশি এনজিও সংস্থা এবং রোহিঙ্গাদের সংগঠনগুলো ব্যাপকভাবে তৎপর ছিল। প্রশাসনের অগোচরে বিদেশি লোকজনও সেই সমাবেশকে সামনে নিয়ে রোহিঙ্গা শিবিরে এসেছিল। এসব বিদেশিরাই এনেছিল নগদ টাকা। বিদেশিদের দেওয়া নগদ টাকা সমাবেশে লোক সমাগমের কাজেও লাগানো হয়।

আবার বিদেশে অবস্থানকারী প্রচুরসংখ্যক রোহিঙ্গারাও সেদিনের সমাবেশকে সামনে নিয়ে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠায়। রোহিঙ্গারাই তাদের  নিকটাত্মীয়দের টাকা এনে সমাবেশে ব্যয়ে করেছে। এমনকি অনেক এনজিও, আইএনওজি অঘোষিতভাবে ওইদিন তাদের কার্যক্রম বন্ধ রেখে রোহিঙ্গাদের সহযোগিতা দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সমাবেশে লক্ষ রোহিঙ্গার উপস্থিতি ভাবিয়ে তুলে দেশের নিরাপত্তা নিয়েও। এমন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের সমাবেশ নিয়ে তদন্তে নামে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা। বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের নিয়ে গঠিত সংগঠন ছাড়াও যেসব এনজিও সংস্থা এবং সমাবেশে মদদ দিয়েছেন তাদের চিহ্নিত করার কাজ শুরু করে দেয়।

জানা গেছে, বিদেশি এনজিও সংস্থা ‘এডিআরএ’ (আদ্রা) ও ‘আল মারকাজুল ইসলামী’ নামে দুটি এনজিও রোহিঙ্গা সমাবেশে টি-শার্ট ও ব্যানারসহ নগদ অর্থ সরবরাহ করেছে। গত ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গাদের সমাবেশের পূর্বে ‘এডিআরএ’ এনজিও গত ১৯ ও ২১ আগস্ট কক্সবাজার শহরের কলাতলিস্থ শালিক রেস্তোরাঁয় বৈঠক করে বিতর্কিত রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহকে আড়াই লাখ টাকা অনুদান দেয়। এছাড়া ‘আল মারকাজুল ইসলামী’ সমাবেশে রোহিঙ্গাদের জন্য টি-শার্ট তৈরিতে নগদ অর্থ সহযোগিতা করে।

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলা সদরের মসজিদ মার্কেটের নিশাত প্রিন্টার্স, মিডিয়া প্রিন্টার্স ও সফট কম্পিউটার্স নামের ৩টি প্রতিষ্ঠান সেই সমাবেশের গেঞ্জি, প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার ফেস্টুন ছাপানোর কাজ করে। কক্সবাজার শহরের বাজারঘাটা শাহ মজিদিয়া প্রিন্টার্স থেকেও ছাপানো হয় এসব। প্রাথমিক সন্ধানে জানা গেছে, উখিয়া উপজেলা সদরের ৩টি এবং কক্সবাজার শহরের ছাপাখানার মালিকরা সবাই জামায়াত-শিবিরের রাজনীতিতে জড়িত।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ বিষয়ে স্বীকার করেন যে, উখিয়ার ৩টি প্রতিষ্ঠানের মালিকরাই অকপটে সমাবেশের গেঞ্জি ছাপানোর কথা স্বীকার করেছেন। তৎমধ্যে ভয়েস অব রোহিঙ্গা সংগঠনের জন্য ৭০০ সাদা হাফ টি-শার্ট ও ২৮টি ব্যানার করেন বলে শিকার করে উখিয়া মসজিদ মার্কেটের নিশাত প্রিন্টার্স ও মিডিয়া প্রিন্টার্স। তাছাড়া রোহিঙ্গা রিফিউজি কমিউনিটির (আআরসি) জন্য হাফ টি-শার্ট ছাপানোর কথাও স্বীকার করা হয় কক্সবাজার বাজারঘাটা শাহ মজিদিয়া প্রিন্টার্স কর্তৃপক্ষ।

অনুসন্ধানকালে জানা গেছে, কুতুপালং ক্যাম্প এক্স-৪ এর ‘ই’ ব্লক এলাকায় সবচেয়ে বড় সমাবেশ ছাড়াও রেজিস্টার্ড ক্যাম্পে ফুটবল খেলার মাঠ ডি-৫ ব্লক মাঠে ভিন্ন ভিন্ন সংগঠনের পক্ষে সমাবেশ ও র‌্যালি করা হয়। সমাবেশ সফল করতে ডি-৫ ব্লক ‘রোহিঙ্গা রিফিউজি কমিটি’ (আরআরসি) সংগঠনের চেয়ারম্যান সিরাজুল মোস্তফার বিভিন্ন স্থান থেকে চাঁদা সংগ্রহ করে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা