kalerkantho

বুধবার । ২০ নভেম্বর ২০১৯। ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

কাস্টমসে নিয়োগের ফাঁদে ৩১ লাখ টাকা হাওয়া

চাকরিতে যোগদান করতে এসে ৩ তরুণ দেখেন সব ভুয়া!

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম   

৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০২:৪৬ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



চাকরিতে যোগদান করতে এসে ৩ তরুণ দেখেন সব ভুয়া!

তিন তরুণের বাড়ি সাতক্ষীরা ও লালমনিরহাটে। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে ‘অফিস সহকারী’ ও ‘অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর’ পদে চাকরি পেতে এই তরুণরা ২০১৮ সালের জুনে চট্টগ্রামে এসে একটি স্কুলে লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন। পরীক্ষায় উত্তীর্ণের ফল চলে যায় তাঁদের গ্রামের ঠিকানায়। এরপর মৌখিক পরীক্ষা, এমনকি পুলিশ ভেরিফিকেশন পর্যন্ত করে ফেলা হয়। 

এরপর জনপ্রতি আট থেকে ১২ লাখ টাকায় চাকরি দেওয়ার দফারফা হয়; টাকাও জমা হয় ‘চাকরিদাতার’ অ্যাকাউন্টে। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের পোস্ট অফিস থেকে স্মারক নম্বরসহ পাঠানো হয় তাঁদের নিয়োগপত্রও। এরপর গতকাল রবিবার সকালে নির্ধারিত সময়ে চাকরিতে যোগদান করতে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে এসে দেখেন সব কিছুই ভুয়া! 

বিষয় বুঝতে পেরে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিন তরুণ। তাঁদের একজন মিলন চক্রবর্তী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতারণায় পড়েছি এখনো আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। কাস্টমসের শীর্ষ কর্তারা বলার পরও আমি পুরো ঘটনা প্রতারণা মেনে নিতে পারছি না।’ 

কিন্তু ‘নিখুঁত’ এক প্রতারণার শিকার হয়ে ৩১ লাখ টাকা খুইয়েছেন তিন চাকরিপ্রত্যাশী তরুণ। চরম এই প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসকে ঘিরে। কিন্তু সব কিছুর কারিগর ছিলেন আনোয়ারুল ইসলাম পরিচয়ধারী এক ব্যক্তি। তাঁর বাড়ি নোয়াখালী জেলায় বলে জানা গেছে। আনোয়ারুল ইসলামের দুটি মোবাইল নম্বরে (০১৭২৯১০২৫৮১ ও ০১৭৫৫৩১৮২৩২) ফোন করে বন্ধ পাওয়া যায়। ধারণা কা হচ্ছে, তাঁর সঙ্গে একটি সংঘবদ্ধ চক্র রয়েছে। 

ঘটনার বিষয়ে কাস্টমস কমিশনারের পিএ আকতার হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রবিবার সকালে তিন তরুণ কমিশনারের কক্ষে এদিক-সেদিক ঘোরাঘুরি করছিল। পরে কথা বললে বিষয়টি জানতে পারি। একপর্যায়ে তাদের হাতে থাকা সব কাগজপত্র এবং কমিশনার মহোদয়ের স্বাক্ষর এবং আগের অতিরিক্ত কমিশনার মহোদয়ের স্বাক্ষর দেখে নিশ্চিত হই সব কিছু ভুয়া ও জাল। তারা প্রতারণার শিকার হয়েছে।’ 

প্রতারণার শিকার তিন তরুণের নাম মিলন চক্রবর্তী, আবদুল গফুর ও সাগর ইসলাম। তাঁদের মধ্যে মিলন চক্রবর্তী লালমনিরহাট জেলার হাতীবান্ধা থানার নওদাবাস এলাকার পূর্ববেজ গ্রামের কৃষ্ণকান্ত চক্রবর্তীর ছেলে। আবদুল গফুর সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার বামনখালী গ্রামের আকিম উদ্দিনের ছেলে আর সাগর ইসলাম কলারোয়া উপজেলার আরিফুল ইসলামের ছেলে। 

চাকরি দেওয়ার নামে মিলন চক্রবর্তীর কাছ থেকে আট লাখ টাকা এবং বাকি দুজনের একজনের কাছ থেকে ১১ লাখ ও আরেকজনের কাছ থেকে ১২ লাখ টাকা আদায় করে প্রতারকচক্রটি। 

মিলন চক্রবর্তী জানান, নিজেকে আনোয়ারুল ইসলাম পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখিয়ে আট লাখ টাকা দিলে তাঁকে সেখানে চাকরি দেওয়ার প্রস্তাব করেন। টাকা দেওয়ার পর চট্টগ্রামের একটি হাই স্কুলে ‘নিয়োগ পরীক্ষা’ নেওয়া হয়। যে কক্ষে পরীক্ষা নেওয়া হয় সেখানে আরো ১৫ থেকে ২০ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেন। নিয়োগ পরীক্ষার পর লালমনিরহাট জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে এসআই আব্দুল মালেক নামের একজন কর্মকর্তা তাঁর বাড়িতে গিয়ে পুলিশ ভেরিফিকেশন করেন। এরপর লালমনিরহাট সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে তাঁর মেডিক্যাল পরীক্ষাও করা হয়।

কান্নাভেজা চোখে মিলন বলেন, ‘চাকরির আশায় দুই বিঘা জমি বিক্রি করে সাত লাখ টাকা এবং ধারদেনা করে আরো এক লাখ টাকা নিয়ে মোট আট লাখ টাকা দিই প্রতারক আনোয়ারুল ইসলামের হাতে। লালমনিরহাট থেকে শনিবার চট্টগ্রাম পৌঁছি এবং চট্টগ্রামের ওয়্যারলেস ঝাউতলা এলাকায় তার সঙ্গে দেখা করলে সে নিশ্চিত করে। গতকাল চাকরিতে যোগ দিতে চট্টগ্রাম কাস্টমসে এসেই জানতে পারি সব ভুয়া।’ কথিত আনোয়ারের সঙ্গে কিভাবে পরিচয় তা অবশ্য জানাননি মিলন।

জানা গেছে, গত ২৬ আগস্ট চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার ফখরুল আলমের স্বাক্ষরিত একটি দুই পৃষ্ঠার নিয়োগপত্র দেওয়া হয় মিলন চক্রবর্তীকে। সেখানে স্বাক্ষর ও সিল দুটিই ভুয়া। আর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিটি ২৬ আগস্ট চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে ডাক গ্রহণ ও প্রেরণ শাখা থেকে পাঠানো হয়েছে। সেখানে একটি ‘স্মারক নম্বর’ও উল্লেখ করা হয়েছে।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কাস্টমসের অতিরিক্ত কমিশনার আকবর হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কাস্টমসে এ ধরনের কোনো পরীক্ষা হয়নি। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিও দেওয়া হয়নি। আর কাগজপত্র যাচাই করে দেখি সব কিছুই ভুয়া ও জাল। তাদের বলেছি লিখিতভাবে প্রতারণার অভিযোগ দিতে। এরপর আমরা পুলিশকে জানিয়ে পদক্ষেপ নিতে বলব।’

এ বিষয়ে প্রতারণার শিকার হওয়া তরুণরা পাশের চট্টগ্রাম বন্দর থানায় গিয়েছিলেন কি না জানতে চাইলে বন্দর থানার ওসি সুকান্ত ভট্টাচার্য্য কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ ধরনের কোনো অভিযোগ আমাদের কাছে আসেনি। আর যেহেতু প্রতারণা চট্টগ্রামে ঘটেনি সুতরাং সেটি সাতক্ষীরা ও লালমনিরহাট থানায় অভিযোগ করতে হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা