kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

আজ ৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ব স্বাক্ষরতা দিবস

পটুয়াখালীর চরাঞ্চল, বিদ্যার্জন যেখানে বিলাসিতা!

এমরান হাসান সোহেল, পটুয়াখালী   

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০৮:২৫ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পটুয়াখালীর চরাঞ্চল, বিদ্যার্জন যেখানে বিলাসিতা!

রূপা, নাসরিন। দুজনে প্রতিবেশী। তাই ওরা খেলার সাথীও। রাতে শুধু বিচ্ছিন্ন হয়। আর সারাটা সময় একসাথে কাটিয়ে দেয়। ওদের বাড়ি পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলার পূর্বদিক দিয়ে বঙ্গোপসাগরে বহমান তেঁতুলিয়া নদীর বুকে জেগে ওঠা চর চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের মিয়াজান গ্রামে। ভর্তি হয়েছিল ওদের বাড়ির পাশের চর রায়সাহেব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। কিন্তু ওখানে গিয়ে লেখাপড়া করা হয় না। তাই অধিকাংশ সময় সংসারের সহযোগী আয়ের সদস্য হিসাবে কাজ করে। এ কারণে ওরা খেলার সময়ও পায় কম। ওদের দেখা পাওয়া যায় বাড়ির কাছাকাছি একটি জলাভূমিতে খুচন জাল দিয়ে মাছ ধরা অবস্থায়। স্কুলে যাওয়া না যাওয়া নিয়ে দীর্ঘ সময় কথা হয় ওদের সাথে।

ওদের বক্তব্য, অভাবের সংসার ওদের, তাই স্কুলে গেলে সংসারের খাওন মেটানো অভিভাবকের পক্ষে সম্ভব না। এ কারণে স্কুলের পরিবর্তে ওরা আয় করে। মৌসুম পরির্বতনে ওদের পেশারও পরিবর্তন হয়। খুদে জেলের পরিবর্তে হয় ধানের ছড়া কুড়ানি, আলু কুড়ানি, ডাল কুড়ানি, কেউ গরু চড়ায়, বনাঞ্চলে কাঠ কাটে, কেউ আবার গভীর নদী কিংবা সাগরে মাছ শিকারে যায়। এভাবেই ওরা শিক্ষা বিমুখ হয়ে বেড়ে ওঠে। রূপা ও নাসরিন এ বছর পাঁচদিন স্কুলে গিয়েছিল।

সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ওই চরের কাঁদা পানির রাস্তায় হেটে দেখা গেছে অধিকাংশ শিশুই ব্যস্ত সংসারের আয় বাড়ানো নিয়ে। কেউ বড়শি দিয়ে, কেউ জাল দিয়ে। কেউ আবার বড় ভাই কিংবা বাবার সাথে নদীতে ব্যস্ত ইলিশ শিকারে। লেখাপড়ার তাগিদ থাকলেও ওরা অসহায় অভাবের কাছে।

দক্ষিন চর ওয়াডেলের নাঈম(৮) বছরের এক শিশু বলে, ‘আমাগো-তো স্কুলে যাইতে মোন চায়। কিন্তু কেমনে জামু। ঘরে চাউল না থাকলে স্কুল আর লেহাপড়া দিয়া কি অইবে। এই লইগ্যা স্কুলে ভর্তি অওনের (হওয়ার) পরও আমার পড়ালেহা অয় নাই। আমি এ্যাহন আর স্কুলে যাই না।’

ওই এলাকার মো. খলিল ব্যাপারী বলেন, ‘আমাগো গুরাগ্যারাকে (ছেলে মেয়ে) চাইলেও আমরা লেহাপড়া করাইতে পারি না। উপবৃত্তি যদি সরকার তরের (মূল ভূখণ্ড) স্কুলের ছাত্রছাত্রীকে মাসে ৫০০ টাহা দেয় আমাগো চরের স্কুলের ছাত্রছাত্রীগোরে ১০০০ টাহা উপবৃত্তি দেতে অইবে। চরের স্কুলের শিক্ষকের সংখ্যা তরের স্কুলের শিক্ষকের সংখ্যার চেয়ে বেশী থাকতে অইব। রাস্তাঘাট ভাল করতে অইবে। স্কুলে স্যারেগো ডেইলি আজিরা (হাজিরা) নিশ্চিত করতে অইবে। চরে যে ছেলে মেয়ে আইএ (এইচএসসি), বিএ বা মেট্রিক (এসএসসি) পাশ করছে হেই সব পোলাপানরে শিক্ষক নিয়োগ দিতে অইবে। তরের স্যারেরা চরে ঠিক মোত আয় না, ক্লাসও নেয় না। এইসব বাস্তবায়ন না অইলে চরের পোলাপানরে স্কুলে পাডান বা শিক্ষিত করা অসম্ভব। শহরের মাইনস্যের (মানুষের) সিনামা টিভি দেহা আর আমাগো পোলাপালের লেহাপড়া করা সোমান কতা। পারলে এই সত্য কথাডা ল্যাহেন সাংবাদিক ভাই।’

চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নে ৫টি বিদ্যালয়ে ২৬জন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও শিক্ষক রয়েছে ১৫জন। বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এসব শিক্ষকদের উপস্থিতিও বিদ্যালয়ে কম।

চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নে ৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। অনেক শিশু স্কুলে ভর্তি হলেও অভাবের কারণে স্কুলে যায় না। ওই ইউনিয়নের চর রায় সাহেব গ্রামের অভিভাবক সুলতান মৃধা বলেন, ‘আমাগো চরের মানুষের অভাবের কারণে বাপ-মায় পোলাপানরে স্কুলে না দিয়া কামাই (আয়) করতে পাডায়। আবার দুই চাউরগা য্যাও (যা) স্কুলে যায় বর্ষা কালে রাস্তাঘাট না থাহনে পানিতে ডুইব্বা থাহে এইলইগ্যা (এজন্য) পোলাপান স্কুলে যাইতে চায় না।’

প্রায় একই বক্তব্য দিলেন ওই ইউনিয়নের ওয়াডেল গ্রামের মো. খোকন ব্যাপারি, হানিফ খা, চর ব্যারেটের ধলু মাঝি, মো. মমিনউদ্দিন হাওলাদার। ওই ওই ইউপি চেয়ারম্যান এনামুল হক আলকাছ মোল্লা বলেন, ‘চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের চর কচুয়া, চর নিমদি, চর ধানদি, চর আলগি ও পাঁচখেজুড়িয়া গ্রামে কোন স্কুল না থাকায় ওই গ্রামের প্রায় পাঁচশত শিক্ষার্থী স্কুল বিমুখ। এছাড়াও উত্তর চর মিয়াজানে কোন স্কুল না থাকায় ওই এলাকার প্রায় ছয়শত শিশুরা স্কুলে যায় না।’

এ চিত্র শুধু পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নেই না। দশমিনা উপজেলার চর হাদি, চর শাহজালাল, পাতারচর, চর বোরহান, গলাচিপা উপজেলার চর কারফারমা, বলইবুনিয়া, চর বিশ্বাস ও চরকাজল এবং রাঙ্গাবালী উপজেলার চর বেষ্টিন, চর রুস্তুম, মধ্যচর মোন্তাজ, বাইলাবুনিয়া, চরলক্ষী, চর গঙ্গা, মধুখালী, পশ্চিম মৌডুবি, গরুভাঙা এলাকারও একই চিত্র।

রাঙ্গাবালী উপজেলার চরলক্ষী এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে ওই এলাকার অধিকাংশ শিক্ষার্থী বর্ষা মৌসুমে স্কুলে যায় না। চরমোন্তাজ ইউনিয়নের গাজীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাস্তার অভাবে স্কুলে যাওয়া থেকে বিরত থাকে। স্কুলে আসা যাওয়ার রাস্তা না থাকা এবং অভাবের কারণে তারা স্কুল বিমুখ থাকে বছরের অধিকাংশ সময়। বাউফল, দশমিনা, গলাচিপা ও রাঙ্গাবালী উপজেলার বিভিন্ন পর্যায়ের বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ওইসব উপজেলার চরাঞ্চলের প্রায় ২৫ হাজার শিশু উল্লেখিত কারণে স্কুল বিমুখ থাকে।

চরের মানুষের ভাগ্যন্নোয়ন নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা এনজিও সাবেক একজন এজিও কর্মী মো.হেমায়েত উদ্দিন বলেন, ‘পটুয়াখালীর চরাঞ্চলসহ উপকূলের অধিকাংশ মানুষ সুবিধাবঞ্চিত। এসব মানুষকে মূলস্রোতের সাথে নিয়ে আসতে হলে আলাদা চর নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে হবে। যা সরকারের কাছে আমাদের প্রস্তাব দেয়া রয়েছে। তা না হলে চরের মানুষের শিক্ষা স্বাস্থ্যসহ কোনো অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব না।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পটুয়াখালীর চরাঞ্চলে কাজ করা একজন সহকারি প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার বলেন, ‘চরের শিশুদের লেখাপড়া শতভাগ নিশ্চিত করতে মূল ভূখণ্ডের চেয়েও প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে অধিক উপবৃত্তিসহ চাল বা গম রিলিফ দিতে হবে। শিক্ষকদেরও বাড়তি সুযোগ সুবিধা দিতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ চরের রাস্তাঘাটের উন্নয়ন করতে হবে। অন্যথায় চরের শিশুদের মূলস্রোতে নিয়ে আসা সম্ভব নয়।’

এ ব্যাপারে পটুয়াখালী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ছাইয়াদুজ্জামান বলেন, ‘চরাঞ্চলের শিশুরা শতভাগ স্কুলে ভর্তি রয়েছে। তবে এটা ঠিক যে উপস্থিতি শতভাগ আমরা এখনও করতে পারিনি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা