kalerkantho

বুধবার । ২০ নভেম্বর ২০১৯। ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

অসচ্ছল মেধাবী ভর্তিচ্ছুদের বিনা খরচে ভর্তির প্রস্তুতি

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ১০:২৩ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



অসচ্ছল মেধাবী ভর্তিচ্ছুদের বিনা খরচে ভর্তির প্রস্তুতি

চলছে প্রস্তুতিমূলক পড়াশোনা

অসচ্ছল মেধাবী ভর্তিচ্ছুদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতিতে বিনা মূল্যে সাহায্য করছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আরেফিন মেহেদী। এ উদ্যোগের গল্প শুনেছেন আলী ইউনুস হৃদয়। ছবি তুলেছেন অন্তর রায়

শিরিন আহমেদ সম্প্রতি এইচএসসি পাস করেছেন। তাঁর বাবা শীত মৌসুমে গরমের কাপড় বিক্রি করেন। শিরিনের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ইচ্ছা; কিন্তু অর্থের চিন্তা তাঁকে দমিয়ে দিয়েছিল। অন্যরা যেখানে বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে ব্যস্ত, সেই সুযোগ শিরিনের নেই। একসময় পরিচিত একজনের কাছে জানতে পারলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছুদের বিনা মূল্যে পড়াচ্ছেন কয়েক শিক্ষার্থী। সেখানেই তিনি এখন বাণিজ্য ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অসচ্ছল মেধাবীদের ভর্তি পরীক্ষায় প্রস্তুত করার এই ব্যক্তি-উদ্যোগটি নিয়েছেন হিসাববিজ্ঞান ও তথ্যব্যবস্থা বিভাগের শিক্ষার্থী আরেফিন মেহেদী। এ কাজে তাঁকে সাহায্য করছেন তাঁর দুই বন্ধু ও এক ছোট ভাই।

শিরিন জানালেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন সবারই থাকে। কিন্তু সবাই তো কোচিংয়ে ভর্তি হতে পারে না। তবে এখানে আমার পড়ার সুযোগ হয়েছে, এটাই অনেক।’

উদ্যোগটি সম্পর্কে আরেফিন বললেন, ‘অস্বচ্ছল মেধাবী অনেক শিক্ষার্থী অর্থের অভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি ঠিকমতো নিতে পারে না। তাই অর্থের অভাব যেন ভর্তির প্রস্তুতিতে বাধা হয়ে উঠতে না পারে, সে জন্যই এই উদ্যোগ। যদিও এটি খুবই সীমিত পরিসরে শুরু হয়েছে, আমাদের এখানে শিক্ষার্থীও খুব কম। তবে আশা করছি এভাবে অন্যরাও এগিয়ে আসবে।’

আরেফিনের মাথায় আইডিয়াটি আসে রোজার ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার পর পরই। তাই ক্যাম্পাস খোলার আগেই, ১৭ জুন রাজশাহীতে চলে আসেন যশোরের এই ছেলে। প্রথমে নিজের টাকায় লিফলেট বানিয়ে আঠা দিয়ে শহরের বিনোদপুর, কাজলা, কাদিরগঞ্জ ও সাহেবাজার এলাকায় পোস্টারিং করেন। লিফলেটে লেখা ছিল, ‘যাঁরা আর্থিক অসচ্ছলতার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কোচিং করতে পারছেন না, তাদের ইংরেজি ও বাণিজ্য ইউনিটের বিষয়গুলো ফ্রি-তে পড়ানো হয়।’

এ ছাড়া নিজের ফেসবুক টাইমলাইন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার ও বিভিন্ন ভর্তি সহায়তা গ্রুপে এ বিষয়টি জানিয়ে পোস্ট করেন তিনি। এরপর ২৩ জুন তিনজন ভর্তিচ্ছুকে নিয়ে শুরু হয় পড়ানোর এই কার্যক্রম। এখন বাণিজ্য ইউনিটের তিনজন ও মানবিক ইউনিটের ১০ জন শিক্ষার্থী তাঁদের কাছ থেকে পড়ছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের উত্তর-পশ্চিম দিকে বৃহস্পতিবার বাদে সপ্তাহে ছয় দিনই পড়ানো হয়। হিসাববিজ্ঞান ও তথ্যব্যবস্থা বিভাগের আসাদুজ্জামান নয়ন, রবিউল ইসলাম ও নৃবিজ্ঞান বিভাগের শামীম রেজা—এই দুই বন্ধু ও এক অনুজও কার্যক্রমটিতে আরেফিনের সঙ্গী হয়েছেন।

শামীম রেজা পড়ান বাংলা। জানালেন, ‘বিকেলে তো অবসর সময় পার করি। সে সময়েই যদি ভর্তিচ্ছুদের পড়াই, তাহলে ভালোই হবে—এই ভাবনা থেকেই কার্যক্রমটিতে যুক্ত হয়েছি। নিয়মিত ১৩-১৪ জন পড়তে আসেন। তাঁরা যদি কোনো না কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পান, তার চেয়ে আনন্দের আর কিছুই হবে না!’

আরেক ভর্তিচ্ছু উমাপদ রায়ের বাড়ি পঞ্চগড়। মানবিক শাখার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। জানালেন, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার এক বন্ধু চান্স পেয়েছিল। ওই বন্ধুর কাছ থেকেই আরেফিন ভাইদের এই উদ্যোগটির কথা জানি। তাঁদের সহযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন দেখছি।’

ভবিষ্যতে এই পড়ানোর কার্যক্রম যেন বন্ধ না হয়, সে জন্য একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গড়ে তোলার কাজও করছেন আরেফিন। শিক্ষাবান্ধব, কল্যাণকর ও সচেতনতামূলক—এই তিনটি লক্ষকে সামনে রেখে এটি প্রতিষ্ঠা করতে চান। এই সেবামূলক কাজে যাঁরা যুক্ত হতে আগ্রহী, তাঁদের আহ্বান জানিয়ে নিজের ফেসবুকে টাইমলাইনসহ বিভিন্ন গ্রুপে পোস্ট করেছেন তিনি। আর তাতে ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮২ জন শিক্ষার্থী কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। শিগগিরই একসঙ্গে বসে মতামতের মাধ্যমে একটি নাম ঠিক করে কার্যক্রম পরিচালনায় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আরেফিন জানালেন, তাঁদের এই উদ্যোগকে কেউ কেউ বাঁকা চোখে দেখলেও অনেকেই সাধুবাদ জানাচ্ছে। পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের স্বপ্নময় চোখ তাঁকে প্রেরণা জোগাচ্ছে সবচেয়ে বেশি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা