kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

মাদকের জালে শেকৃবি

সন্ধ্যা নামতেই ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল, আঠা, মদ...

শাহাদত হোসেন, শেকৃবি    

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ১১:০৪ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সন্ধ্যা নামতেই ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল, আঠা, মদ...

মাদকের জালে জড়িয়ে পড়েছে রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি) ক্যাম্পাস। ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল, আঠা, মদ—হেন মাদকদ্রব্য নেই, যা এখানে পাওয়া যায় না। একই সঙ্গে চলে বিক্রি ও সেবন। প্রতিদিন সন্ধ্যা নামতেই আবাসিক হলসহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে বসে যায় মাদকের আসর। রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা রমরমা হয়ে ওঠে। আর তাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শামিল হয় বহিরাগত মাদকাসক্ত ও সন্ত্রাসীরা।

একাধিক সূত্র জানায়, ক্যাম্পাসে মাদকের জালের বিস্তৃতির পেছনে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় ছাত্রনেতা, কর্মকর্তা, নিরাপত্তা কর্মচারীসহ বিভিন্ন বিভাগের দুই ডজনের বেশি কর্মচারী। তাদের মদদে ক্যাম্পাসে ছাত্রদের পাশাপাশি ছাত্রীদেরও দুটি হলের বিভিন্ন কক্ষ এবং ছাদে প্রতিনিয়ত বসে মাদকের আসর।

বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশ এলাকায় এক শ্রেণির মাদকাসক্ত শিক্ষার্থীর পাশাপাশি বহিরাগতদের আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় ক্যাম্পাসে চুরি-ছিনতাইয়ের হার আগের তুলনায় বেড়ে গেছে। প্রতিনিয়ত খোয়া যাচ্ছে শিক্ষার্থী ও এই এলাকা দিয়ে চলাচলকারীদের মোবাইল, ল্যাপটপ ও টাকা-পয়সা। আর এসব ঘটনায় যে চিহ্নিত মাদকচক্রের যোগসূত্র রয়েছে, তারও প্রমাণ মিলেছে। আর নাকের ডগায় এসব কর্মকাণ্ড চললেও নীরব বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন। বেশ কিছু ক্ষেত্রে মাদকসেবীদের আটক করার পরও কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে প্রশাসনের বিরুদ্ধে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, শেকৃবির আবাসিক হলগুলোর ছাদ, নির্মাণাধীন টিএসসি ভবন, কেন্দ্রীয় গবেষণা মাঠ, খেলার মাঠ, গরুর খামারের আশপাশ ও টিএসসির পেছনে মোবাইল ফোন টাওয়ারের নিচে প্রতি রাতে বসে মাদকের আসর। কবি কাজী নজরুল ইমলাম হলের ‘এ’ ব্লকের দ্বিতীয় তলার তিনটি ও ষষ্ঠ তলার দুটি কক্ষ এবং ‘বি’ ব্লকের তৃতীয় তলার একটি কক্ষে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মাদকাসক্ত আসর জমিয়ে বসে। ওই হলের ছাদে প্রতি রাতেই ২০ থেকে ২৫ জনকে নিয়ে গাঁজা, ফেনসিডিল ও ইয়াবার আসর বসে।

নবনির্মিত নবাব সিরাজউদ্দৌলা হলে মাদকাসক্ত ও ভ্রাম্যমাণ কারবারিদের আনাগোনা অনেকটাই ওপেন সিক্রেট। বলতে গেলে হলটি মাদক কারবারিদের ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। ওই হলের ‘এ’ ব্লকের পঞ্চম ও সপ্তম তলার কয়েকটি কক্ষ এবং ‘বি’ ব্লকের দ্বিতীয় তলার কয়েকটি কক্ষে প্রায় রাতভর দলবদ্ধভাবে ইয়াবা সেবন চলে।

নবাব সিরাজউদ্দৌলা হলের দ্বিতীয় বর্ষের এক আবাসিক শিক্ষার্থী কালের কণ্ঠকে বলেন, “‘বি’ ব্লকের দ্বিতীয়তলার একটি কক্ষ ইয়াবাসেবীদের নিয়মিত আড্ডাস্থল হয়ে উঠেছে। এ নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা অতিষ্ঠ। বিষয়টি গত আগস্ট মাসে প্রক্টর স্যারকে টেলিফোনে জানালেও তিনি বিষয়টি অনেকটা এড়িয়ে যান। ‘মাদক সেবন সামাজিক সমস্যা। এ বিষয়ে কিছু করার নেই।”—এমন দায়সারা কথা বলে তিনি ফোন কেটে দেন। ওই শিক্ষার্থী আরো বলেন, “আরেক রাতে ১৫ থেকে ২০ জনের একটি দল ‘এ’ ব্লকের ছাদে গাঁজার আসর বসায়। ওই খবর তাত্ক্ষণিক এক সহকারী প্রক্টরকে জানালে তিনি দেখবেন বলে জানান। পরে আর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।”

শেরেবাংলা হলের একাধিক শিক্ষার্থী কালের কণ্ঠকে জানান, প্রায়ই বস্তা বোঝাই করে মদের বোতল এনে হলে আসর বসানো হচ্ছে। সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়েও তাদের বক্তব্যে সত্যতা পাওয়া গেছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ নির্বিকার। তারা অভিযোগ পেলেও বিষয়টি আমলে নিতে নারাজ।

ক্যাম্পাসে ছাত্রীদের হলগুলোতে মাদকের বিস্তার ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দুটি হলের বিভিন্ন কক্ষ ও ছাদে প্রতিনিয়ত বসছে গাঁজা, ইয়াবা ও ফেনসিডিলের আসর। ছয় মাস আগে কৃষকরত্ন শেখ হাসিনা হলের সপ্তম তলার একটি কক্ষে গাঁজা পাওয়া যায়। ওই ঘটনায় ১৭তম ব্যাচের তিন ছাত্রী ও ১৩তম ব্যাচের এক ছাত্রী জড়িত থাকার অভিযোগ থাকলেও প্রশাসন তা এড়িয়ে যায়। ওই হলের এক কর্মচারী জানান, প্রায় সময়ই হলের টয়লেটের হাউস পরিষ্কারের সময় ফেনসিডিলের শতাধিক বোতল পাওয়া যায়।

সাধারণ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রশাসনের দায়সারা ভূমিকা ও রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয়ের কারণেই ক্যাম্পাসে ভয়াবহভাবে মাদকের বিস্তার ঘটেছে। কৃষি অনুষদের তৃতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, সম্প্রতি নজরুল হলের দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষে গাঁজার গাছ পাওয়া যায়। প্রক্টরিয়াল বডি বিষয়টি দেখার পরও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। আবার ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গার মাদকের আসর থেকে আটকের পর বহিরাগতদের পুলিশে সোপর্দ করা হলেও শেকৃবির শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।

এসব বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. মো. ফরহাদ হোসাইন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হলে হলে মাদকের আসর বসে এমন অভিযোগ পেয়েছি। তবে হলের মাদকের

আসরের স্পটগুলো সংশ্লিষ্ট প্রভোস্টরা আইডেন্টিফাই করে আমাদের জানালে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর ছাত্রীদের হলে মাদকের আসর বসার বিষয়ে আমি অবগত নই। হলের প্রভোস্টদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা