kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

চট্টগ্রামে ফ্লাইওভার থেকে ৪০ হাজার পিস ইয়াবা ফেলা

গাড়ি ও ‘বাহিনীর সদস্য’দের নিয়ে ধূম্রজাল

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০২:০৮ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



গাড়ি ও ‘বাহিনীর সদস্য’দের নিয়ে ধূম্রজাল

চট্টগ্রামের ফ্লাইওভার দিয়ে যাওয়ার সময় একটি কাভার্ড ভ্যান থেকে নিচের সড়কে ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের একটি ব্যাগ থেকে উদ্ধার হওয়া ৪০ হাজার পিস ইয়াবা নিয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। ফ্লাইওভারের নিচ থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ইয়াবাগুলো উদ্ধারের পর পুলিশ অজ্ঞাতপরিচয় কাভার্ড ভ্যানের চালক ও হেলপারের বিরুদ্ধে মামলা করেছে।

এই মামলার তদন্ত শুরু করেই পুলিশের কপালে চিন্তার রেখা দেখা দিয়েছে। কারণ এমন একটি ভিডিও পাওয়া গেছে, যেটিতে ফ্লাইওভারের দৃশ্য ধরা পড়েছে। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো একটি ইউনিটের সদস্যরা নোয়া গাড়ি (মাইক্রোবাস) নিয়ে একটি কাভার্ড ভ্যানকে থামানোর সিগন্যাল দেয়। এরই মধ্যে চালকের বাঁ পাশের আসনে বসা এক ব্যক্তি একটি ব্যাগ নিচের দিকে নিক্ষেপ করে। পরমুহূর্তে নোয়া গাড়ি থেকে সাদা পোশাকধারী তিন ব্যক্তি নেমে গাড়ির চালক  ও হেলপারের সঙ্গে কথা বলে। আনুমানিক ২০ সেকেন্ড কথোপকথনের পর দুটি গাড়িই অলংকারমুখী সড়কে চলে যায়।

সিসি ক্যামেরার এমন ফুটেজ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নগর পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ মাহাবুবর রহমান। গতকাল রবিবার কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘দেওয়ানহাট ফ্লাইওভার দিয়ে যাওয়া একটি কাভার্ড ভ্যান থেকে একটি ব্যাগ নিচের দিকে ফেলার দৃশ্য দেখা গেছে। এর আগে সেখানে একটি নোয়া গাড়ি থেকে সাদা পোশাকধারী ব্যক্তিরা নেমেছে এবং গাড়ির চালক-হেলপারের সঙ্গে তাদের কথা বলতে দেখা গেছে। কিন্তু ওই দুটি গাড়ি এবং সাদা পোশাকধারী ব্যক্তি ও চালক-হেলপারদের এখনো শনাক্ত করা যায়নি। পুলিশ এ ব্যাপারে কাজ করছে।’ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নোয়া গাড়ি থেকে যারা নেমেছে, তারা যে গোয়েন্দা পুলিশ সদস্য, ভিডিও দেখে সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। তদন্তের পর সঠিক তথ্য পাওয়া যাবে।’ 

একই বিষয়ে নগর পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, নোয়া গাড়ি থেকে নেমে যে তিন ব্যক্তি কাভার্ড ভ্যানের দিকে গেছে, তাদের গায়ে যে জ্যাকেট ছিল, আবছা হলেও এটা বোঝা যাচ্ছে। সেই অর্থে এটা গোয়েন্দা পুলিশের টিম হতে পারে। তবে রাতের অন্ধকারে ধারণকৃত ভিডিও রেজ্যুলেশনের মান ভালো না হওয়ায় সাদা পোশাকধারী তিন ব্যক্তির পরিহিত জ্যাকেটে ‘ডিবি’ শব্দ লেখা আছে কি না, সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। 

আবার পুলিশের অন্য এক কর্মকর্তা বলেন, সাদা পোশাকধারী তিন ব্যক্তি যে পুলিশ সদস্য, এটা বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু তারা ডিবি পুলিশ না কোনো থানা পুলিশের দল, সেটা স্পষ্ট নয়।  তিনি এটাও বলেছেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরও অভিযানের সময় জ্যাকেট ব্যবহার করে। তাই তাদের প্রকৃত পরিচয় শুধু ফুটেজ দেখে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। এ জন্য আরো তদন্ত দরকার। 

ইয়াবা উদ্ধার ঘটনায় ডবলমুরিং থানার উপপরিদর্শক কিশোর মজুমদার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। বাদীর তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার রাত ৯টা ৫০ মিনিটে ডবলমুরিং থানার দেওয়ানহাট ট্রাফিক পুলিশ বক্সের বিপরীতে সড়কের ওপর থেকে একটি ব্যাগ উদ্ধার করেন। সেই ব্যাগে ৪০ হাজার পিস ইয়াবা পাওয়া যায়। ট্রাফিক পুলিশ সার্জেন্ট কুসুম আলীসহ অন্য সাক্ষীদের সম্মুখে ইয়াবাগুলো তিনি জব্দ করেন। এই ঘটনায় তিনি অজ্ঞাতপরিচয় কাভার্ড ভ্যান চালক-হেলপারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছেন উপপরিদর্শক মোস্তাফিজুর রহমান। 

ডবলমুরিং থানা এলাকা নগর গোয়েন্দা পুলিশের বন্দর বিভাগের আওতাধীন। এই বিষয়ে গোয়েন্দা পুলিশের বন্দর বিভাগের উপকমিশনার এস এম মোস্তাইন হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, গোয়েন্দা পুলিশের বন্দর বিভাগ নোয়া গাড়ি নিয়ে অভিযান পরিচালনা করে না। আর বৃহস্পতিবার রাতে গোয়েন্দা পুলিশ ইয়াবা উদ্ধার অভিযান চালায়নি। নগর পুলিশের উত্তর বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার আসিফ মহীউদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, গোয়েন্দা পুলিশ নোয়া গাড়ি নিয়ে অভিযান পরিচালনা করে না। 

নগর গোয়েন্দা পুলিশ নোয়া গাড়ি নিয়ে অভিযান পরিচালনা করে না বলে কর্মকর্তারা দাবি করলেও বাস্তবে সেটা অসত্য তথ্য বলে জানিয়েছেন গোয়েন্দা পুলিশের অন্য একজন সদস্য। তিনি বলেন, গোয়েন্দা পুলিশ নোয়া গাড়ি নিয়ে অভিযান পরিচালনা করে। সাধারণত এসব নোয়া গাড়ি ভাড়া নিয়ে অভিযানে যান পুলিশ সদস্যরা। তবে এই কর্মকর্তা বলেন, থানা পুলিশও নোয়া গাড়ি নিয়ে অভিযান পরিচালনা করে। তাই শুধু ভিডিও দেখে তাদের গোয়েন্দা পুলিশের টিম হিসেবে শনাক্ত করা ঠিক হবে না।

নগর পুলিশের ডবলমুরিং জোনের সহকারী কমিশনার আশিকুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখনো গাড়ি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তবে তদন্ত চলছে। জড়িতদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে বলে আমি আশাবাদী।’

পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নগর গোয়েন্দা পুলিশ কিংবা থানা পুলিশ ইয়াবা উদ্ধারে বেশি উত্সাহ দেখায় মূলত ইয়াবা উদ্ধারের নেপথ্যে ‘আর্থিক বাণিজ্য’ থাকার কারণে। নিরাপদে ইয়াবা গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া, উদ্ধার অভিযানের নামে উদ্ধার না করে ছেড়ে দেওয়া কিংবা উদ্ধারের পর প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে কম উদ্ধার দেখানো, ধরা সব আসামিকে গ্রেপ্তার না দেখানোসহ নানা ‘বাণিজ্য’ থাকে। কিন্তু এই ঘটনা ভিন্ন। কারণ যদি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ইয়াবা উদ্ধার অভিযান চালাত, তাহলে কাভার্ড ভ্যানটিকে থামানোর সিগন্যাল দেওয়ার পরপরই (ইয়াবা ফেলে দেওয়ার বিষয়টি অভিযানকারী দলের দৃষ্টি এড়িয়ে গেলেও) অভিযানকারী দল কাভার্ড ভ্যানটি তল্লাশি করত। কিন্তু মাত্র ২০ সেকেন্ডের মতো কথা বলে দুটি গাড়িই একইমুখী চলে গেল। এটা রহস্যজনক। 

পুলিশ কর্মকর্তারা আরো বলেন, ইয়াবা উদ্ধারের জন্য যদি কোনো বাহিনীর সদস্যরা সত্যিকার অভিযান চালাত, তাহলে ফ্লাইওভারে যানজট এড়াতে সামনের দিকে নিরাপদ কোনো স্থানে নিয়ে কাভার্ড ভ্যান তল্লাশি করতে পারত। সে ক্ষেত্রে কাভার্ড ভ্যানে ইয়াবা না পেলেও পরিত্যক্ত ইয়াবা উদ্ধারের সংবাদ শুনে তারা (ওই টিম) দাবি করতে পারত, ফ্লাইওভারের ওপর ওই টিমই একটি কাভার্ড ভ্যানকে তল্লাশির জন্য থামিয়েছিল। তাই পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধারকৃত ইয়াবাগুলো ওই অভিযানের ফল ছিল।

কিন্তু বাস্তবে চট্টগ্রামের গোয়েন্দা পুলিশ কিংবা কোনো থানার সাদা পোশাকধারী টিম এমন কোনো কথা এখনো বলেনি। তাই স্বাভাবিকভাবেই অভিযানকারী দল খারাপ উদ্দেশ্য নিয়েই কাভার্ড ভ্যানটি থামিয়েছিল এবং পরে ছেড়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন নগর পুলিশের পদস্থ কর্মকর্তারা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা