kalerkantho

কুলাউড়ায় পলাশ হত্যা

ছেলেকে হারিয়ে কান্না থামছে না পলাশের মা-বাবার

কুলাউড়া (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি   

২৫ আগস্ট, ২০১৯ ২১:০৯ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ছেলেকে হারিয়ে কান্না থামছে না পলাশের মা-বাবার

অউ বুঝি আমার পুয়ায় (ছেলে) আইয়া কইবো, মাগো পেটো ভুক (ক্ষিধা) লাগছে। আমারে জলদি (তাড়াতাড়ি) ভাত দেও। খালি (শুধু) পথরবায় (রাস্তাপানে) চাই। কিন্তু আমার কইলজার টুকরা আয়। পলাশরে তুই কইরে বাবা- বলে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন কুলাউড়ার আলোচিত শিশু হত্যার শিকার স্কুলছাত্র পলাশের মা সন্ধ্যা রানী কর। আর বাবা পরিমল শব্দকর পায়ে জড়িয়ে ধরেন ছেলের বর্বর হত্যাকারীদের বিচার চাইতে। আর পলাশের ছোট ভাই বিকাশ মাত্র ৩ বছরের শিশু। বড় ভাইকে শুধু খুঁজে ফেরে। না পেয়ে ভাই ভাই বলে কেঁদে কেটে ঘুমিয়ে পড়ে।

গত ২৬ দিন থেকে এই পরিবারের কান্না যেন থামছে না। সরেজমিন নিহত পলাশদের বাড়িতে গেলে যে কারো নিজেকে সংবরণ করা হবে দুষ্কর। আশপাশ বাড়ির লোকজন জড়ো হয়ে পলাশের স্মৃতিচারণ করে পরিবেশকে আরো বিষাদময় করে তোলেন।

নিহত পলাশের মা সন্ধ্যা রানী কর জানান, খেতে বসলে ছেলেটার কথা মনে পড়ে। ভাত পেটে যায় না। ঘুমাতে গেলে মনে হয়, পলাশ আসেনি এখনও। এভাবেই প্রতিটি মুহুর্ত পলাশের স্মৃতি তাদের কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। নিহত পলাশের মা বাবার একটাই চাওয়া- আর যেন কোনো মা বাবাকে এভাবে সন্তান হারাতে না হয়। পলাশের হত্যাকারিদের ফাঁসি চান তারা।

পলাশের বর্বর হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দেন পাশের বাড়ির মহিলা হাসনা বেগম। নিহত পলাশের হাত বাঁধা, হাঁটুর ওপরে পা বাঁধা, মুখের ভেতরে হা করানো অবস্থায় পেছনে বাঁধা, পেন্ট ছিলো হাঁটু পর্যন্ত নামানো। পায়খানার রাস্তায় চালানো বর্বরতার চিহ্ন স্পষ্ট। বাড়ির পাশের জমিতে ধান রোপনে আরেকজনকে সহায়তা করছিল পলাশ। সেখান থেকে দোকানে যাবার কথা বলে ডেকে নেয় জাহেদ। পলাশ আর জাহেদ এক সাথে গেলেও। বিকেলে একা ফেরে জাহেদ। এ সময় তার চোখে মুখে ছিল ভীতির ছাপ। পলাশের কথা জিজ্ঞেস করতেই সে উল্টো রেগে যায়। রাতে যখন সাবেক চেয়ারম্যান শাহজাহানের উপস্থিতিতে বৈঠক বসে তখনও সে পলাশের কথা অস্বীকার করে। পরদিন পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জাহেদ ঘটনাস্থল গিয়ে পলাশের লাশ দেখিয়ে দেয়।

স্থানীয় লোকজন জানান, রাতে যদি পলাশের সন্ধান দিতো তাহলে হয়তো তাকে জীবিত উদ্ধার করা যেত। পলাশকে বলৎকার করে জাহেদ ও রাহেল বাড়িতে এসে বিষয়টি মির্জান আলীকে জানায়। তখন পলাশ জীবিত ছিল। পরে মির্জান আলীর নির্দেশে ফের ঘটনাস্থলে গিয়ে পলাশের মৃত্যু নিশ্চিত করে।

এদিকে সরেজমিন এলাকায় গিয়ে খুনি চক্রের বিরুদ্ধে পাওয়া যায় ভয়ঙ্কর তথ্য। খুনি রাহেলের চাচা ও জাহেদের বাবা মির্জান আলী একজন ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী। গাছ চোর থেকে একজন বড় মাপের মাদক ব্যবসায়ী এই মির্জান আলী। ফেনসিডিল ও গাজার ব্যবসা থেকে তার হাজার হাজার টাকা আয়। সেই এলাকার দরিদ্র অসহায় মেয়েদের বিদেশ পাঠানোর সেই টাকার কারণে এলাকার জনপ্রতিনিধিদের আয়ের উৎস মির্জান আলী হয়ে উঠে তাদের কাছের মানুষ। আর এলাকাবাসীর জন্য মূর্তিমান আতঙ্ক। তারই পদাঙ্ক অনুসরণ করে দুই ছেলে নাহিদ (পলাতক) ও জাহেদ (জেলহাজতে)।

স্থানীয় লোকজন জানান, মির্জান আলীর দুই ছেলের কাছে স্থানীয় বাসিন্দারা অসহায়। দিনে দুপুরে তারা মানুষের ঘর থেকে মোবাইল, টাকা পয়সা লুট করে নিয়ে যায়। গরিব মানুষ মুখ ফুটে প্রতিবাদ করার সুযোগ নেই। আর যারা বিচার প্রার্থী হয় এলাকার জনপ্রতিনিধিরা তাদের কোনো বিচার করেন না।

একাধিকবার হাতে নাতে ধরার পরও মেম্বার চেয়ারম্যানদের কারণে তাদের বিরুদ্ধে কোনো সঠিক বিচার না করার কারণে এরা এলাকায় বেপরোয়া হয়ে উঠে। এর আগেও মির্জান আলীর ছেলে একই এলাকার অপর এক শিশুকে বলৎকার করে। আর পলাশকে হত্যার আগে যে বলৎকার করা হয়েছে, যারা পলাশের লাশ দেখেছে, তারা সবাই বলতে পারবে। এদিকে ঘটনার পর থেকে মির্জান আলীর স্ত্রী কমলা বেগম ও বড় ছেলে নাহিদ আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে।

কুলাউড়া থানার অফিসার ইনচার্জ মো. ইয়ারদৌস হাসান রবিবার বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, আসামিরা পুলিশের কাছে, বিজ্ঞ আদালতের কাছে এবং সর্বোপরি রিমান্ডে ঘটনার সাথে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছে। নিহত পলাশকে বলাৎকার করার উদ্দেশ্যে তারা চা-বাগানে নিয়ে গিয়েছিলো, কিন্তু বলাৎকার করেনি বলে তারা জানায়। মূল আসামি জাহেদকে জাতীয় শিশু সংশোধানাগার গাজীপুরে পাঠানো হয়েছে। বাকিরা মৌলভীবাজার জেলহাজতে রয়েছে।

উল্লেখ্য, কুলাউড়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের বালিশ্রী গ্রামের পলাশ শব্দকর (৮) নামক প্রথম শ্রেণির এক শিশু শিক্ষার্থীর নিখোঁজের একদিন পর ১ আগস্ট বৃহস্পতিবার দুপুরে লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনার সাথে জড়িত জাহেদ আলী (১৫) ও তার বাবা মির্জান আলী (৪৫) ও রাহেল আহমদ (২৬) ৩ জনকে আটক করেছে পুলিশ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা